হোয়াইট হাউসের গত একশো বছরের ইতিহাসে এই প্রথম একটি 'বাইবেল অধ্যয়ন চক্র' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কারা এই চক্রের সদস্য? সেখানে তারা কী করেন? এই চক্রের কাজকর্ম সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মনোভাব কি?
 হোয়াইট হাউসের গোপন বাইবেল স্টাডি গ্রুপ: কে এর নেপথ্যে?
 
 

হোয়াইট হাউসের গত একশো বছরের ইতিহাসে এই প্রথম একটি 'বাইবেল অধ্যয়ন চক্র' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কারা এই চক্রের সদস্য? সেখানে তারা কী করেন? এই চক্রের কাজকর্ম সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মনোভাব কি?


ওয়াশিংটন ডিসিতে একটি সম্মেলন কক্ষে প্রতি বুধবার বসে এই বাইবেল অধ্যয়ন চক্রের গোপন বৈঠক। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী কিছু মানুষ এর সদস্য। সেখানে তারা ঈশ্বর সম্পর্কে আলোচনা করেন।

এই বৈঠকটি কোথায় হয়, সেটি প্রকাশ করা নিষেধ। মার্কিন গোয়েন্দা দফতর চায় না এটি প্রকাশ পাক। তবে সদস্যরা জানেন, তাদের কোথায় যেতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এর সদস্য। শিক্ষা মন্ত্রী বেটসি ডেভস, জ্বালানি মন্ত্রী রিক পেরি, এটর্নি জেনারেল জেফ সেশন্স- এরাও আছেন এই অধ্যয়ন চক্রে। তালিকায় আরও অনেকের নাম আছে। সব মিলিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কেবিনেটের অন্তত দশ জন ক্ষমতাধর ব্যক্তি এর সদস্য।

এদের সবাই যে সব বৈঠকে থাকেন তা নয়। কারণ তারা সবাই ব্যস্ত মানুষ। কিন্তু যার যখন সময় হয় তখন হাজির হন সাপ্তাহিক বৈঠকে। প্রতিটি বৈঠক চলে এক থেকে দেড় ঘন্টা ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী এই গ্রুপটির নেতৃত্বে রয়েছেন র‍্যালফ ড্রলিংগার। সাত ফুট দীর্ঘ এই ব্যক্তি আগে ছিলেন পেশাদার বাস্কেটবল খেলোয়াড়, এখন তিনি ধর্মযাজক।

র‍্যালফ ড্রলিংগার বেড়ে উঠেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগোতে। ছোটবেলায় তিনি মোটেই ধর্মপ্রাণ ছিলেন না। তার নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মাত্র এক ডজন বার হয়তো চার্চে গেছেন ছোটবেলায়। বাইবেলও খুব বেশিদূর পড়া হয়নি।

তিনি বলেন, "আমি সবসময় প্রতিজ্ঞা করতাম যে আমি এটি পড়বো, কিন্তু পড়ে কিছু বুঝতে পারতাম না।"

তবে স্কুলের শেষ ক্লাসে একদিন কেউ একজন তাকে বাইবেল ক্লাসে আমন্ত্রণ জানালেন। সেখানে গিয়ে জীবন পাল্টে গেল র‍্যালফ ড্রলিংগারের। বাড়ি গিয়ে তিনি ভালো করে বাইবেল পড়া শুরু করলেন। বাস্কেটবল ছেড়ে ধর্ম-কর্মে মন দিলেন। বাস্কেটবল খেলোয়াড় থেকে তিনি হয়ে গেলেন ধর্মযাজক।

এরপর ১৯৯৬ সালে তিনি যোগ দিলেন রাজনীতিতে। হোয়াইট হাউসে পৌঁছানোর যাত্রা শুরু তখন থেকে। র‍্যালফ ড্রলিংগার যে বাইবেলের ক্লাস চালান, তা বেশ কঠিন। বাইবেলের প্রতিটি লাইন ধরে তার এই স্টাডি গ্রুপে আলোচনা হয়। তার এই বাইবেল অধ্যয়ন কর্মসূচী এতটাই সফল যে এখন ৪৩ টি অঙ্গরাজ্যে এর কার্যক্রম চলে।

প্রতিটি বাইবেল স্টাডি সার্কেলের প্রধান হচ্ছেন একজন স্থানীয় যাজক। এর কোনটিরই নেতৃত্বে নেই কোন নারী। কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে র‍্যালফ ড্রলিংগার দাবি করছেন, রাষ্ট্র, ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্যান্য ক্ষেত্রে নারীদের নেতৃত্বে কোন বাধা দেয়ার কথা নেই বাইবেলে। তবে বিয়ে এবং চার্চে নারী নেতৃত্ব নিষিদ্ধ। এক্ষেত্রে বাইবেলের বিধান খুব স্পষ্ট। এর মানে এই নয় যে নারী কম গুরুত্বপূর্ণ।

র‍্যালফ ড্রলিংগারের বাইবেল অধ্যয়ন চক্র ২০১০ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে তাদের কার্যক্রম শুরু করলো। তাদের কার্যক্রম এখন বেশ বিস্তৃত। কেবল প্রতিনিধি পরিষদেরই ৫০ জন সদস্য তাদের স্টাডি গ্রুপের সঙ্গে জড়িত। সিনেটে আছে তাদের চার সদস্য। আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্ত্রিপরিষদে ঠাঁই পেয়েছেন দুজন।

র‍্যালফ ড্রলিংগার বেশ গর্বভরেই বলেন, আমাদের সিনেট এবং হাউস বাইবেল স্টাডি গ্রুপের লোকজন থেকেই ট্রাম্প তার কেবিনেটে লোক নিতে শুরু করেন। এজন্যে তিনি অবশ্য কৃতিত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে। "তিনি জানেন কারা দৃঢ়ভাবে ঈশ্বর বিশ্বাসী।"

সেকুলার মিডিয়া তাদেরকে যেভাবেই দেখুক, র‍্যালফ ড্রলিংগার হোয়াইট হাউসের এই বাইবেল স্টাডি গ্রুপ নিয়ে বেশ উৎসাহী। "জেফ সেশন্স, টম প্রাইস- এরাই বললো, একটা কেবিনেট বাইবেল স্টাডি গ্রুপ শুরু করা যাক। গত একশো বছরের মধ্যে হোয়াইট হাউসে এটাই প্রথম কোন বাইবেল স্টাডি গ্রুপ বলে আমার বিশ্বাস।"

প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশের আমলেও একটি বাইবেল স্টাডি গ্রুপ ছিল। কিন্তু সেটি ছিল তার প্রশাসনের নীচের স্তরের কর্মকর্তাদের জন্য। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো এই বাইবেল স্টাডি গ্রুপের সদস্য নন। কিন্তু তিনি নিয়মিত র‍্যালফ ড্রলিংগারের কাছ থেকে আট পৃষ্ঠার পাঠ পান।

"প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাকে ঐ প্রিন্ট করা বাইবেল স্টাডিজ নোটের মধ্যেই চিঠি লিখে পাঠান। তিনি আমাকে আরও অনেক দূর যেতে হবে বলে উৎসাহ দেন।"

র‍্যালফ ড্রলিংগার এবং তার বাইবেল স্টাডি গ্রুপের সদস্যদের মতে, সমকামিতা এবং একই লিঙ্গের মানুষের মধ্যে বিয়ে ঈশ্বরের দৃষ্টিতে অবৈধ। তারা পুঁজিবাদের পক্ষে, ধর্মগ্রন্থে এর পক্ষেই বলা হয়েছে। কমিউনিজমের বিপক্ষে তারা। বাইবেল থেকেই যদি রাজনীতিকদের শিক্ষা নিতে হয়, তাহলে সমকামীদের কি মৃত্যুদন্ড দেয়া উচিৎ? র‍্যালফ ড্রলিংগার বললেন, ওল্ড টেস্টামেন্টের সব কিছু যে মানতে হবে তা নয়, এটা করা হয়েছিল প্রাচীন ইসরায়েলের জন্য। এটা এখনকার চার্চের জন্য নয়।

র‍্যালফ ড্রলিং নিজেকে তুলনা করলেন রেস্টুরেন্টের একজন ওয়েটারের সঙ্গে। 'আমি কেবল ঈশ্বরের কথা পরিবেশন করছি, যা তিনি বাইবেলে প্রকাশ করেছেন।"

র‍্যালফ ড্রলিংকার অবশ্য বিশ্বাস করেন, চার্চ এবং রাষ্ট্র আলাদা থাকা উচিৎ। নিউইয়র্ক টাইমস তাদের এক লেখায় র‍্যালফ ড্রলিংগার এবং তার অনুসারীদের 'খ্রীষ্টান জাতীয়তাবাদী' বলে বর্ণনা করেছিল। এর তীব্র প্রতিবাদ জানান তারা। কেন তাদের এ নিয়ে আপত্তি?

"এর মানেটা দাঁড়ায় এমন, আমি যেন গোপনে মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছি। আমরা যেন ধর্মরাষ্ট্র কায়েমের চেষ্টায় রত।"

কিন্তু মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য বাইবেল স্টাডি গ্রুপ তো আসলে তাই, রাষ্ট্র আর ধর্মকে কি এখান এক করে ফেলা হচ্ছে না? র‍্যালফ ড্রলিংগারের যুক্তি হচ্ছে, তিনি রাষ্ট্র আর ধর্মকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আলাদা রাখার পক্ষে, কিন্তু এর প্রভাব আলাদা করার পক্ষে নন।

"পরিবার, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা—যে প্রতিষ্ঠানের কথাই বলুন, এগুলো সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য ঈশ্বরের বাণীর দরকার আছে।"

র‍্যালফ ড্রলিং দাবি করছেন, তিনি কখনো তার সদস্যদের বলেন না কিভাবে ভোট দিতে হবে, সরকারের কোন নীতি অবলম্বন করতে হবে।

র‍্যালফ ড্রলিং নিজেকে 'রক্ষণশীল রিপাবলিকান' বলে বর্ণনা করেন। তিনি পরিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে। গত নির্বাচনে তিনি ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক।

তার বাইবেল স্টাডি গ্রুপ থেকে তিনি যেসব নীতির কথা বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি তার সব বাস্তবায়ন করছেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার 'নীলনকশা' অনুযায়ী চলছেন, সেটা মনে করেন না তিনি।

প্রতি সপ্তাহে যখন তিনি ওয়াশিংটনে এসে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষগুলিকে বাইবেল পড়ান, তখন তার কেমন অনুভূতি হয়?

"একটা আবেগ আমার মধ্যে কাজ করে। সেটি হচ্ছে, বুঝতেই পারছেন, নিজেকে মোজেসের মতো মনে হয়। আমি ছিলাম ভাঙ্গা হাঁটুওয়ালা একজন অ্যাথলীট মাত্র। কিন্তু আজ আমি এই অবস্থানে এসেছি, একমাত্র ঈশ্বরই এটা করতে পারেন।"

"আমার আবার এই কথাটাও মনে হয়, গত ২১ বছর ধরে ঈশ্বরের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার অভিজ্ঞতা আমার আছে। আমার মনে হয় এই বিশ্বে আমিই সবচেয়ে যোগ্য মানুষ।

Post A Comment: