নব্বইয়ের দশকে পরীক্ষায় নকলপ্রবণতা মহামারী আকার ধারণ করেছিল। নকল নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষক-পরীক্ষার্থীদের মারামারির ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। পত্রিকার পাতায় আমরা সে খবর দেখতাম আর আঁতকে উঠতাম। অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ অঞ্চল ও শিক্ষায়তনগুলোতে এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি ছিল। অনেক ক্ষেত্রে সন্তান যেন নির্বিঘ্নে নকল করে পরীক্ষায় পাস করতে পারে, সেজন্য অভিভাবককেই সবচেয়ে বেশি তৎপর দেখা যেত। তারা খোঁজ নিত কোন এলাকার স্কুল-কলেজ এবং কেন্দ্রগুলো নকল করার জন্য সবচেয়ে অনুকূল। সে যুগ এখন পাল্টেছে। তবে এখন নতুন মহামারী হিসেবে দেখা দিয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। এটা আরও ভয়াবহ ব্যাপার।
শিক্ষায় সামাজিক দুর্নীতি: কোণঠাসা মূল্যবোধ  

নব্বইয়ের দশকে পরীক্ষায় নকলপ্রবণতা মহামারী আকার ধারণ করেছিল। নকল নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষক-পরীক্ষার্থীদের মারামারির ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। পত্রিকার পাতায় আমরা সে খবর দেখতাম আর আঁতকে উঠতাম। অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ অঞ্চল ও শিক্ষায়তনগুলোতে এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি ছিল। অনেক ক্ষেত্রে সন্তান যেন নির্বিঘ্নে নকল করে পরীক্ষায় পাস করতে পারে, সেজন্য অভিভাবককেই সবচেয়ে বেশি তৎপর দেখা যেত। তারা খোঁজ নিত কোন এলাকার স্কুল-কলেজ এবং কেন্দ্রগুলো নকল করার জন্য সবচেয়ে অনুকূল। সে যুগ এখন পাল্টেছে। তবে এখন নতুন মহামারী হিসেবে দেখা দিয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। এটা আরও ভয়াবহ ব্যাপার।


কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর চামেলিবাগের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাঈদুর রহমান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক স্কুলে পড়াতেন তিনি। তার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানাচ্ছিলেন, আমাদের সমাজের অধঃপতনটা শুরু কীভাবে হয়েছিল।

তিনি বলেন, একসময় কোচিং বলতে কিছু ছিল না। বড়জোর হাউস টিউটর থাকত। একটা হাউস টিউটরই সব সাবজেক্ট পড়াতেন। পরে একেক সাবজেক্টের জন্য একেকজন শিক্ষক রাখা হতো। এক শিক্ষার্থীর জন্য বাসায় কয়জন শিক্ষক আসবেন? এ নিয়ে অভিভাবকদের বেশ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তাই তারা বেছে নিলেন কোচিং সেন্টারকে। ওটাই হয়ে উঠেছে বিকল্প বিদ্যালয়। অথচ এটা হওয়ার কথা ছিল না। কোচিং সেন্টারে প্রতিটি সাবজেক্টে আলাদা আলাদা শিক্ষক ব্যাচ করে পড়াচ্ছেন শিক্ষার্থীদের। প্রয়োজনীয় নোট ও সাজেশন দিচ্ছেন তারা। পরে ওই নোট ও সাজেশনটাই হয়ে গেল মুখ্য। যে কোচিং সেন্টার যত সংক্ষিপ্ত নোট ও সাজেশন দিতে পারে, সে কোচিং সেন্টারই হয় সবচেয়ে জনপ্রিয়। যত কম পড়ে যত দ্রুত পাস করা যায়, তার প্রবণতা তৈরি হয়ে গেল। কোচিং সেন্টারগুলোও বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য শট নোট, শট সাজেশন সরবরাহ করতে লাগল। এ প্রবণতার কারণে কোচিংয়ের শিক্ষার্থীদের ১০০ পার্সেন্ট পাসের নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রতিযোগিতা তৈরি হলো। এ থেকেই তো শুরু প্রশ্নপত্র ফাঁসের ভয়াবহ আয়োজন। শিক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র দিতে না পারলে ১০০ পার্সেন্ট পাস কীভাবে করাবে? এ কোচিং সেন্টারগুলো বিশাল সিন্ডিকেট। কোটি কোটি টাকার ব্যবসা এখানে। সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে কোথায় হাত নেই এদের! এ কারণে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া একটা মামুলি ব্যাপার হয়ে গেল। এভাবেই আমাদের অধঃপতনের এক অধ্যায় শেষ হলো। অথচ আমাদের সময় নকলবাজ শিক্ষার্থীদের প্রচণ্ড ‘অচ্ছুত’ ও ‘ঘৃণার’ চোখে দেখা হতো। এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে অভিভাবকরাই হন্যে হয়ে পড়েন সন্তানের হাতে প্রশ্নপত্র তুলে দিতে।

তিনি বলেন, আগে তো শুনতাম, বিসিএস, মেডিকেল পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হতো। এখন তো ক্লাস ওয়ানের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার! সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের টিকিটিও ধরতে পারে না।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় ফাঁসকৃত পদার্থ বিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রসহ সবুজ (৩৫) নামে এক অভিভাবককে আটক করে পুলিশ। একই দিন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় একটি পরীক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগ করে দিতে গিয়ে ১০ শিক্ষককে আজীবন বহিষ্কার করা হয়।

রাজধানীর বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র, পুলিশ লাইন ইনস্টিটিউশন ও ফটিকছড়ির হেঁয়াকো বনানী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে এক শিক্ষকসহ ১৮ পরীক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ। পরীক্ষার আগেই তাদের মোবাইল অ্যাপসে প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে দেয় ওই শিক্ষক। পরে এর সঙ্গে জড়িত থাকায় ৩৩ পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয় বলে গণমাধ্যম থেকে জানা যায়।

১৭ ফেব্রুয়ারিও জামালপুরের বকশীগঞ্জের এনএম উচ্চ বিদ্যালয় এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রসহ সাইফুর রহমান নামে এক শিক্ষককে আটক করা হয়।

দেখা গেছে, যে কোনো পাবলিক পরীক্ষার আগে পরীক্ষার্থীদের পাঠে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে প্রশ্ন পাওয়ার জন্য ইন্টারনেট ও মোবাইল অ্যাপসেই বেশি মনোযোগী হতে দেখা গেছে। এর পেছনে শিক্ষক, অভিভাবক, কোচিং সেন্টারের কর্মকর্তাদের যোগসাজশ একাধিকবার ধরা পড়েছে।

সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, বিদ্যালয়ের এমপিওভুক্তিকরণ থেকে শুরু করে শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক নানা দুর্নীতি যেমন ঘটছে তেমনি দুর্নীতির সর্বগ্রাসী বিস্তার ঘটছে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মধ্যেও। এর বাইরে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের মতো বড় দাগের দুর্নীতি ছিল অনেকটা ওপেন সিক্রেট। যা এখন তেমন একটা দৃশ্যমান নয়। 

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এ যুগে তো জিপিএ ফাইভটাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। শিক্ষা গৌণ হয়ে গেছে। ফলে সন্তানের জিপিএ ফাইভ নিশ্চিত করার জন্য বাবা-মায়েরা মরিয়া হয়ে গেছেন। এটা এখন সামাজিক সম্মানের প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে- সন্তান জিপিএ ফাইভ পেল কি না। এজন্য তারা সততা, নৈতিকতার বিসর্জন দিচ্ছেন।’


তিনি বলেন, ‘শিশু ভালো ফলাফল করছে কি-না সেদিকে অবশ্যই নজর দিতে হবে অভিভাবকদের। তার চাইতে বেশি নজর দিতে হবে- সে সুশিক্ষা পাচ্ছে কি না সেদিকে। সন্তান সামাজিক মূল্যবোধ, সততা, নৈতিকতা, মানবিক গুণাবলি অর্জন করছে কিনা, যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠছে কি না- সেদিকেই বেশি নজর দিতে হবে তাদের।’

এ প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘কল্পনাই করা যায় না একজন অভিভাবক তার সন্তানকে কীভাবে অনৈতিকতার দিকে ঠেলে দেন। তারাই সন্তানের জন্য ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র জোগাড় করছেন। এটা আমাদের সমাজের নৈতিক অধঃপতনের একটা ভয়াবহ চিত্র।’

এসব ব্যাপারে খোলা কাগজের সঙ্গে কথা হয় শিক্ষাবার্তা সম্পাদক ও শিক্ষাবিদ এএন রাশেদার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এ দেশে দুর্নীতি বাড়ছে কেবল রাষ্ট্র ব্যবস্থার কারণে। রাষ্ট্রই সর্বস্তরে দুর্নীতির দরজা খুলে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এ দেশে তো শিক্ষাই নেই। যে শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে, সুন্দর, সুমানুষ তৈরি করে সে শিক্ষাব্যবস্থাই তো তৈরি করতে পারেনি রাষ্ট্র। হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লুটপাট করে নিচ্ছে অথচ সরকার শিক্ষকদের বেতন দেয় না। কোচিং ব্যবসাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, শিক্ষক নিয়োগে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নেন আমলারা, ফলে শিক্ষকরাও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। শিক্ষকরা তো আকাশ থেকে আসেননি। তারা তো এ নগ্ন-পচা-গলা পরিবেশেই জীবনযাপন করছেন। তাদের ওপর দোষ দিয়ে তো সরকার পার পাবে না। সরকার শিক্ষকদের চাহিদা পূরণ করুক, সর্বত্র শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ গড়ে তুলুক। লুটপাটের অর্থনীতি বন্ধ করে দিক, তাতেই দুর্নীতি আর থাকবে না।’

বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কেবল করপোরেট পুঁজির দাস বানানোর শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘দাস হতে তো শিক্ষা লাগে না। সার্টিফিকেট হলেই চলে। ফলে যে কোনোভাবে পয়সাকড়ি খরচ করে একটা সার্টিফিকেট পেলেই তো দাসত্বের যোগ্যতা অর্জন করা যায়।’

তিনি বলেন, ‘পুরো চক্রটাই একটা দুর্নীতির। এখানে সবাই দুর্নীতি করবে ফ্রি স্টাইলে। সত্য কথা বলে কোথাও চাকরি হয় এখন? সেজন্য ১০০টা মিথ্যা বলতে হয়। এ মিথ্যাই তো দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে।’

এএন রাশেদা বলেন, ‘সমাজের গোড়াতেই পচনটা ধরেছে। সাংস্কৃতিক জাগরণ বা আন্দোলন তো আছেই পাশাপাশি রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়। একটা শুভ শক্তির হাতে যতদিন রাষ্ট্রব্যবস্থা করায়ত্ত না হবে ততদিন দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমি আপনি যতই বলি, কোনো কাজ হবে না।’

Post A Comment: