আপনি যদি জায়নবাদী (ইহুদিবাদী) মনস্তাত্ত্বিক চিন্তার গোঁড়াতে যেতে চান তাহলে তাদের ছলনাময় অন্তরে প্রবেশ করতে হবে আপনাকে। যেমন- একজন বিশ্লেষক হয়ে আপনি নিজেকে মানসিকভাবে অসুস্থ হিসেবে কল্পনা করেন। তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন কী রকম উপনিবেশিক বিকারগ্রস্ততায় আক্রান্ত হলে একটা পত্রিকা শিরোনাম করতে পারে, ‘অবশ্য জেরুজালেম ইসরাইলের রাজধানী।’
জেরুজালেম কখনোই ইহুদিদের রাজধানী হবে না

আপনি যদি জায়নবাদী (ইহুদিবাদী) মনস্তাত্ত্বিক চিন্তার গোঁড়াতে যেতে চান তাহলে তাদের ছলনাময় অন্তরে প্রবেশ করতে হবে আপনাকে। যেমন- একজন বিশ্লেষক হয়ে আপনি নিজেকে মানসিকভাবে অসুস্থ হিসেবে কল্পনা করেন। তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন কী রকম উপনিবেশিক বিকারগ্রস্ততায় আক্রান্ত হলে একটা পত্রিকা শিরোনাম করতে পারে, ‘অবশ্য জেরুজালেম ইসরাইলের রাজধানী।’


সেটা? নিউ ইয়র্ক টাইমসে। তাও ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, তার আগস্ট মাসের এ ধরনের একটি বিবৃতির ওপর ভিত্তি করে। 

এ দাবির ভিত্তি হিসেবে কট্টরপন্থী জায়নবাদীদের বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য হচ্ছে, রোমান ধ্বংসযজ্ঞের এক হাজার বছর পূর্বে এখানে একটি মন্দির ছিল। তার মানে এটি প্রায় তিন হাজার বছর আগের কথা, জেরুজালেম ইহুদিদের মূলকেন্দ্র ছিল। এটা হলো ইহুদিদের পুরনো চাল ও নির্বুদ্ধিতার আচরণ। আমি বলব, সম্পূর্ণ সত্য ঘেটে দেখুন। আপনারা খণ্ডিত সত্য তুলে ধরে নিজেদের স্বার্থটা হাসিল করে নিবেন, তা তো এত সহজ না জনাব!

মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে জায়নবাদীরা ইচ্ছাকৃতভাবে ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক ও নৃতত্ত্বাত্তিক যে বয়ান তৈরি করেছে তা নিছক মুর্খতারই নামান্তর। খ্রিস্টান ও মুসলমানরাও ফিলিস্তিনে নিজেদের হাজার বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস অনুসন্ধান করে। তাই বলে এটা তো তাদের ফিলিস্তিনে একটি ইসলামি বা খ্রিস্টীয় প্রজাতন্ত্র ঘোষণার অধিকার দেয় না। ফিলিস্তিনে একটি ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ ধারণা একইভাবে সেখানে একটি খ্রিস্টীয় সাম্রাজ্য বা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রস্তাবের মতোই প্রতারণামূলক। ফিলিস্তিন পার্সি ও রোমান সাম্রাজ্যের দ্বারা শাসিত হয়েছিল, তাই বলে ইরান বা ইতালির ফিলিস্তিনকে নিজেদের বলে দাবি করার সুযোগ নেই। আমরা তাহলে ফিলিস্তিনকে নিজের করে নিতে বার্লুসকোনি ও আহমাদিনেজাদকে একটি রিংয়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারি এ লড়াই করতে। তাহলে তাদের মধ্যে যে বিজয়ী হবে তাকে নেতানিয়াহুকে মেনে নিতে হবে। ইহুদিরা কীভাবে নিজেদের মুর্খতার এ দাবিকে, এ রকম কিছু থেকে আলাদাভাবে ভাবতে চায়।

এই মিথ্যা প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে ধোকাবাজ জ্ঞানপাপীরা আরও বেশি প্রচারণা চালায় যে, ‘ইহুদিরা ফিরে আস’। এরপর তারা একটা মারাত্মক মনগড়া বক্তব্য দিলো যে, ১৯ শতক থেকে ইহুদিরা জেরুজালেমের পুরনো শহরের দেয়ালের বাইরে এবং আশপাশে স্থাপনা নির্মাণ করা শুরু করে। ইহুদিরা ফিলিস্তিনে যাওয়া শুরু করলো এমনকি সেখানে বসবাস করাও শুরু করলো, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যতিরেকেই শুধু খ্রীস্টান ও মুসলমানদের সাথেই একটি যৌথ মাতৃভূমি হিসেবে কল্পনা করে। শতাব্দীজুড়ে ফিলিস্তিনে ইহুদি উপনিবেশায়নে 'এডভেঞ্চারিয়াস ইউরোপিয়ান জায়নিস্ট প্রজেক্ট’ নিয়ে যেন ভাবনারই দরকার ছিল না তখন। এখানে মোটাদাগের দুটা ভিন্ন ব্যাপার আছে, জায়নবাদী 'সশস্ত্র ডাকাত'রা জোচ্চুরি করে ফিলিস্তিন দখল করে নেয়ার সাথে 'ইহুদি ইতিহাসের' মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্বহীনতার লেজিটিমেসিকেও যোগ করে দিয়েছে।

ইসরাইলের এই চূড়ান্ত ভণ্ডামি যে সুস্পষ্টভাবে ইহুদি ও জায়নবাদীদের বালখিল্য চাতুরি তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। কিন্তু স্থির হয়ে বুঝলে বলা যায়, সব ইহুদিরাই জায়নবাদী নয়। আবার সব জায়নবাদীও ইহুদি নয়। খ্রিস্টান জায়নবাদীরা হচ্ছে জায়নবাদীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চরমপন্থী। মুসলিম জায়নবাদীরা এখন মুসলমানদের পবিত্র ভূমি সৌদি আরবের যুবরাজ এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে নিযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূতের কথায় চলছে। এর মধ্যে এন্টিসেমিটিকবাদের বিরুদ্ধে উদ্ভট অভিযোগ ত্যাগ করতে হবে, যারা ইসরাইলি উপনিবেশের সমালোচনা করেছিল। আবার বলছি, প্রত্যেক ইহুদিই জায়নবাদী না আবার প্রত্যেক জায়নবাদীই ইহুদি নয়।  তারা বরং এন্টি-সেমিটিকদের এন্টিসেমিটিক হিসেবে বলতে ভীত।

ফিলিস্তিনে ইহুদিদের একটি আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের যে বেলফোর ঘোষণা, সেটিকেই মূলত এগিয়ে নিয়ে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প। তবে তার আগেই জায়নবাদী প্রোপাগান্ডা ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে যে, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্টের কোন বিবৃতিই জেরুজালেম অধিকারের ইসরাইলের দাবি পরিবর্তিত হবে না। এটা আমাদের রাজধানী, এটা আমাদেরই থাকবে। এটা ইহুদি জনগণ থেকেই জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। তাই শক্তির জেরে এটাও আবার জোরদখল করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে, জোরপূর্বক একে ইসরাইলি আইনি ব্যবস্থার অধীনেই রাখা হবে।’

একজন জায়নবাদী জোচ্চরের মতোই হাসবারার কর্মকর্তার বলল, ‘এটা আমাদের রাজধানী’। (উল্লেখ্য, হাসবারা হচ্ছে পশ্চিমাদের কাছে ইসরাইলের একটি প্রোপাকান্ডামূলক প্রচারণা কার্যক্রম, যা ইহুদিদের অস্তিত্ব সংকটের দোহাই দিয়ে ইসরাইলের ভিত্তির যুক্তিকে দৃঢ় করে এবং ফিলিস্তিনিরা যে তাদেরকে উৎখাতের চেষ্টা করে যাচ্ছে সেটা বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা)  সে যখন বলল, ‘এইটা (জেরুজালেম) ইহুদি জনগণ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে’। এর মাধ্যমে সে অতীতের মিথ্যাচারিতার কার্ড ছুঁড়ে দিলো নিজের নোংরা আস্তিন থেকে।

জেরুজালেম বা ফিলিস্তিনকে ইহুদিদের থেকে কেউ ছিনিয়ে নেয়নি যে সেটা তাদের কাছে জায়নবাদীদেরকে ফেরত দিতে হবে। ফিলিস্তিনে জায়নবাদীদের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীতার বিরুদ্ধে ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই সার্বভৌম বিজয় নিয়ে আসবে। এই ঐতিহাসিক সরল বিষয়টি মতাদর্শিকভাবে বিকারগ্রস্ত জায়নবাদীদের কাছে উপস্থাপন করা হলে তারা সেটা খিস্তিখিউর করে উড়িয়ে দেয়।

বর্ণবাদী আদর্শ থেকে একজন দুর্ধর্ষ ব্রিটিশ অফিসারের মাধ্যমে ইউরোপের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে ইসরাইলের সৃষ্টি। এখন সেটা আরও ভয়াবহভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। ব্যাবিলীয় থেকে পার্সিয়ান, রোমান আমল পর্যন্ত, ক্রুসেডারদের শেষ সময়ের দিকে, অটোমান ও ব্রিটিশ সময় পর্যন্ত ফিলিস্তিন অনেক সাম্রাজ্য দ্বারা শাসিত হয়েছে। সে হিসেবে ফিলিস্তিনের ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম কোন অধিবাসীই আলাদাভাবে এর বৈধ অধিকারের দাবি করতে পারে না।

এখানে ইহুদিদের নামে যে ঐতিহাসিক লেজিটিমিসি তার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে এ মুহুর্তে পৃথিবীর মোড়ল হয়ে উঠা জায়নবাদী ঔপনিবেশিকরা সহিংস উপায়ে ফিলিস্তিনকে করলগত করে নিতে চায়। জায়নবাদ নিপাতের মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলিমদের আজীবন বসবাসের নিশ্চিয়তা পাবে, সেইসাথে ফিলিস্তিনে অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব অবসান পাবে, ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে স্থান পাবে তা।

জায়নবাদীরা হচ্ছে স্বল্পশিক্ষিত প্রোপাকান্ডাকারী। তাদের চিন্তা সীমিত, তারা যে ইতিহাস উপস্থাপন করে বা তাদের যে প্রজেক্ট সেটা বিভ্রান্তিমূলক এক ফ্যান্টাসি এবং একটি ফ্যানাটিক চিন্তা, তারা মার্কিন ও ইউরোপীয়দের কাছে বিক্রি করেছে এবং বুঝাতে সক্ষম হয়েছে। তাদের সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে, তারা ভয়ংকর এই ভ্রান্তি বিক্রি করতে পেরেছে। যার কারণে তারা ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে এবং ফিলিস্তিনকে দখল করে নিতে ছলচাতুরী করে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আদায় করেছে।  

ফিলিস্তিন ফিলিস্তিনিদেরই। জেরুজালেম সর্বদা সেখানেই ছিল এবং সর্বদা ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবেই থাকবে। জেরুজালেম  সব সময় ফিলিস্তিনি রাজধানী থাকবে। জেরুজালেম কখনোই সৈন্যবেষ্টিত ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র বর্ণবাদী ইসরাইলের রাজধানী ছিল না, কখনো হবেও না।

অধ্যাপক হামিদ দাবাসি কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও সাহিত্যের একজন তাত্ত্বিক ও গবেষক। তিনি পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজতত্ত্ব ও ইসলামিক স্টাডিজে দুটি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত লেকচার প্রদান করেন। ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, আধুনিক ইসলাম, সাহিত্য, চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন তাত্ত্বিক বিষয়ে তার ২৫টি বই বের হয়েছে। লিখেছেন একশরও বেশি গবেষণামূলক প্রবন্ধ। তার লেখা ও বই ইতিমধ্যে জাপান, জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ, ড্যানিশ, রাশিয়ান, হিব্রু, ইতালি, আরবি, কোরিয়ান, ফার্সি, পর্তুগিজ, পোলিশ, তুর্কি, উর্দু এবং কাতালানসহ অনেক ভাষায় অনুদিত হয়েছে।

Post A Comment: