শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এই আপ্তবাক্যটি পৃথিবীব্যাপী পরিচিত হলেও চরের মানুষের কাছে অজানা। কষ্ট, দুঃখ, দুর্ভোগের সাথে বসবাস চরের মানুষের। জীবনযাত্রার মান নিম্নপর্যায়ে ঠেকে আছে। নদীর সাথে, পানির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে চরের মানুষ। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত উপেক্ষা করেই যুগের পর যুগ চরের বালিতেই বসবাস করে আসছেন এখানকার বাসিন্দারা।
প্রাথমিকেই ঝরে পড়ছে চরের শিশুরা 

শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এই আপ্তবাক্যটি পৃথিবীব্যাপী পরিচিত হলেও চরের মানুষের কাছে অজানা। কষ্ট, দুঃখ, দুর্ভোগের সাথে বসবাস চরের মানুষের। জীবনযাত্রার মান নিম্নপর্যায়ে ঠেকে আছে। নদীর সাথে, পানির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে চরের মানুষ। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত উপেক্ষা করেই যুগের পর যুগ চরের বালিতেই বসবাস করে আসছেন এখানকার বাসিন্দারা।


যমুনা সেতুর পশ্চিম পাশ থেকে উত্তরের শেষ জেলা পর্যন্ত অসংখ্য নদনদী প্রবাহিত হয়ে গেছে। এসব নদী অববাহিকায় জেগে আছে হাজার দুয়েক ছোট বড় চর। এসব চরের প্রায় প্রত্যেকটিতেই কম বেশি মানুষের বসবাস আছে। এসব চরের মানুষের নাগরিক সুবিধার অর্ধেকও পৌঁছে না তাদের ঘর পর্যন্ত। বিশেষ করে শিক্ষার আলো এখন দেশের আনাচে কানাচের গ্রামগুলোতে পৌঁছলেও চরের শিশুদের কাছে এখনো পৌঁছেনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব, শিক্ষকের অভাবের পাশাপাশি চরের মানুষের মধ্যে শিক্ষা সচেতনতা এখনো চাড়া দিয়ে ওঠেনি। শিক্ষার গুরুত্ব এখনো অনেক অভিভাবক বোঝে না। তাদের বোঝানোও হচ্ছে না। কিছু এনজি শিক্ষার নামে কিছু স্কুল চালু করলেও সেগুলো কেবল প্রকল্প দেখানোর জন্যই করা হয়েছে। বিশেষ কিছু দিনে চরের শিশুদের খাবারের লোভ দেখিয়ে হাজির করা হলেও ভিজিট শেষ হলে সেই শিশুদের তেমন কোনো খোঁজ রাখে না এনজিওগুলো।

বগুড়ার সোনাতলা, সারিয়াকান্দি এবং ধুনট উপজেলায় ছোট বড় পাঁচ শতাধিক চর আছে। এসব চরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংখ্যা ১৫০ এর নিচে। ৩-৪টি চরের জন্য গড়ে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। সেগুলোতে বছরজুড়ে শিক্ষক স্বল্পতা লেগেই থাকে। দুর্গম এলাকা হওয়ায় এসব স্কুলে মাসে একবার গিয়ে হাজিরা খাতায় সই করে আসেন শিক্ষকরা এমন অভিযোগ অহরহ আছে চরের মানুষের কাছ থেকে।

শিক্ষা উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় চরের শত শত শিশু প্রাথমিক শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। হাতে গোণা কিছু চরে প্রাথমিক শিক্ষার স্বল্প পরিসরে থাকলেও বেশির ভাগ চরেই নেই। মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই বললেই চলে। পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় চরের শিশু কিশোররা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে শ্রমের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মেয়েদের কিশোরীকালেই বিবাহ দিয়ে দিচ্ছেন পরিবারের পক্ষ থেকে। এই আধুনিক বাংলাদেশে এই অঞ্চলগুলোতে এখনো বাল্যবিবাহ প্রতিনিয়তই হচ্ছে। তাদের সেইভাবে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য কেউ এগিয়ে আসছে না। প্রথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পা রাখেনি এমন শিশুর সংখ্যাও কম নয়।

বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে যমুনার বুকে জেগে ওঠা দুর্গম চরের শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যমুনার বুকে জেগে ওঠা কর্নিবাড়ি ইউনিয়নের মানুষের বসবাস শুরু হয় অনেক আগে। পর্যাক্রমে গড়ে ওঠে আরও বেশ কিছু গ্রাম। মানুষও বাড়তে থাকে দিন দিন। এই ইউনিয়নে হাজারখানেক শিশুরবাস হলেও আজও সেখানে শিক্ষার আলো সেখানে বিকশিত হয়নি। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক লোকজন খোঁজখবর না রাখায় শিক্ষাবঞ্চিত চরের বেশির ভাগ শিশু। জনসংখ্যার তুলনায় এখানে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। চরের সামান্য কিছু লোক লিখতে-পড়তে পারলেও বাকিরা সবাই অশিক্ষিত রয়ে গেছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, এসব চরের  কয়েক হাজার শিশু প্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দুর্গম চরে যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুক থাকার কারণে দূরের স্কুলে যেতে পারছে শিশুরা। ফলে বরাবরেই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে চরের শিশুরা।

কিছু চরের মসজিদের ইমাম শিশুদের কায়দা, ছিপারা ও কোরআন শরিফ শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেছেন ব্যক্তি উদ্যোগে।

স্থানীয় সাংবাদিক ইমরান হোসেন রুবেল  জানান, দরিদ্রতা, অসচেতনতার এবং শিক্ষার ভালো পরিবেশ না থাকায় চরের শিশুরা বরাবরেই শিক্ষা বঞ্চিত হচ্ছে। স্কুলে না গিয়ে এখানকার শিশুরা বাবার সাথে কৃষি কাজ, মাছ ধরার কাজে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। চরের শিশুদের অবসার কাটে খেলাধুলা, নদীতে সাঁতার কেটে।

কুতুবপুর ইউনিয়র পরিষদের চেয়ারম্যান রনি  জানান, যে বয়সে এসব শিশুর হাতে খাতা, কলম, বই শোভা পাওয়ার কথা ছিল চরের সেসব শিশুদের সিংহভাগ এখনো স্কুলে যায় না।

এসব বিষয় নিয়ে শিশুদের অভিভাবকদের সাথে কথা বলেলে তারা জানান, তাদের অনেকের ভিটে মাটি যমুনা নদীর গর্ভে চলে গেছে।  তারা কোনো রকম মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়েছে নদী তীরের বাঁধে। তাদের বেশির ভাগ মানুষ দিনমজুর। জীবনজীবিকা চালে কষ্টের ভেতর দিয়ে।

ফলে এসব মানুষের কাছে শিক্ষার গুরুত্ব নেই বললেই চলে। এছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দূরে হওয়ায় শিশুদের স্কুল না যাওয়ার বড় একটি কারণ। মাইলের পর মাইল ধূ ধূ বালুচর পাড়ি দিয়ে এসব শিশুদের স্কুলে যেতে হয়।

প্রথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে লেখাপড়ার সুযোগ করেছে সরকার সেই ম্যাসেজটিও অনেকের কাছে অজানা। সব মিলে চরের এসব শিশুদের নিয়ে সরকারে পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে এগিয়ে আসার তাগিদ দিয়েছেন চরবাসী।

Post A Comment: