টাঙ্গাইলের সখীপুরে বাড়ি বিল্লাল হোসেনের (৫০)। পরিবারের ৬ সদস্যকে নিয়ে কোনোমতে সংসার চলে তার। অভাব যত না কষ্ট দেয়, তার চেয়েও বেশি যন্ত্রণা দেয় বাবা ও ছেলের মুখমণ্ডলের মাংসপিণ্ড।
Fathers-and-children-have-spent-the-day-thinking-of-destiny 

টাঙ্গাইলের সখীপুরে বাড়ি বিল্লাল হোসেনের (৫০)। পরিবারের ৬ সদস্যকে নিয়ে কোনোমতে সংসার চলে তার। অভাব যত না কষ্ট দেয়, তার চেয়েও বেশি যন্ত্রণা দেয় বাবা ও ছেলের মুখমণ্ডলের মাংসপিণ্ড।


বিল্লাল হোসেন ও তার ছেলে মাসুদ রানা (১৮) জন্মের পর থেকে অজ্ঞাত রোগে ভুগছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন বাড়ছে ভ্রু’র উপরে টিউমারের মতো মাংসপিণ্ড। অভাবের সংসারে এ রোগকে নিয়তি ভেবেই কেটে যাচ্ছে তাদের জীবন।

উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের শ্রীপুর গ্রামে বিল্লাল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার ডান চোখের ভ্রু থেকে মুখমণ্ডল ও গালজুড়ে পুরো অংশ ছেপে গেছে টিউমারের মত বড় আকারের মাংসপিণ্ড। বাম চোখেও এ রকম সমস্যার উপক্রম। কপাল, মুখ, গলদেশসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে অসংখ্য টিউমার জাতীয় গুটি রয়েছে। কোনো মতে চোখে দেখতে পান তিনি।

জানা যায়, বিল্লাল হোসেন পেশায় একজন কৃষক। মা, স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক কন্যাসন্তান নিয়ে তার পরিবার। বড় ছেলে মাসুদ রানারও জন্ম থেকেই বাবার রোগ পেয়েছে। বাম চোখের ওপরে টিউমার জাতীয় তার এ রোগটিও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় হচ্ছে।

কয়েক বছর আগে নিজে ময়মনসিংহে আর ছেলেকে ঢাকায় ডাক্তার দেখালেও কি রোগ বা এর চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে কিছুই জানাতে পারেননি বিল্লাল হোসেন। নিয়তি ভেবেই দিনাতিপাত চলছে তাদের।

বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘জন্ম থেকেই আমার এ রোগ। তখন ছোট ছোট মসুর দানার মতো লক্ষণ দেখা যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় হতে থাকে। আগুন বা রোদের তাপ বাপ-বেটা কেউ সহ্য করতে পারি না। মাথা ও মুখ ভারি ভারি লাগে। এতে আমি খুব অসুস্থ বোধ করি।’

তিনি বলেন, চিন্তা করি আমার হয়েছে এমন রোগ, কিন্তু আমার ছেলেকে কেন এমন কঠিন রোগে ভুগতে হচ্ছে; ওর ভবিষ্যত নষ্ট হয়ে গেল। এ রোগের কারণে লেখাপড়া করতে পারল না। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে আর সে স্কুলে গেল না। স্কুলে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে পারে না; মুখ দেখতে বিশ্রী এসব কিছুতে মাসুদকে ভাবিয়ে তুলতো। আর এসব কারণে তার পড়ালেখা ভালো লাগেনি।’

বিল্লাল হোসেন আরও বলেন, টুকটাক কৃষি কাজ করে অভাবের সংসার চলছে। বেশি বাইরে যাওয়া হয় না আমাদের। এদিক-ওদিক গেলে বাচ্চারা যখন দেখে তারা ভয় পায়। শুধু ভূত বা দৈত্য বলে দৌড়ে পালিয়ে যায়।’

অজ্ঞাত বা বিরল রোগে মুখ বিকৃত হওয়ায় আমরা ঠিকমতো খেতে পারি না। চোখে দেখতেও অসুবিধা। খুব কষ্টে দিন চলে, যোগ করেন তিনি।

বিল্লালের স্ত্রী মাহফুজা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী ও ছেলের চোখে-মুখের রোগটি বাড়ছেই। কিন্তু, অভাবের কারণে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছি না।’

বিল্লালের মা সুরুত জান বেগম বলেন, ছেলে বিল্লাল ও নাতি মাসুদকে নিয়ে তিনি নিজেও গভীর চিন্তা করেন।

এ রোগের শুরুর বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, তাদের পূর্ব পুরুষের বংশে এ ধরনের রোগের লক্ষণ ছিল না। তার ছেলে বিল্লালের জন্মের সময় চোখের ভ্রু’র ওপরে একটু ফোলা ও একটি কালো জনম দাগ দেখা যায়। নাতিরও একই অবস্থা দেখা যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছেলে ও নাতির এ রোগটি টিউমারের মতো হয়ে বড় হতে থাকে। এখন দুজনেরই জীবন বিপন্ন হতে চলেছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মেযবাহ উদ্দিন বলেন, ‘একেতো অভাবের সংসার বিল্লালের। তার ওপর যে ধরনের রোগে ভুগছেন বাবা-ছেলে; এটি দেখলে বুঝা যায় কষ্টের জীবন কেমন। নিজেদের দেহটা আর অভাবের সংসার যেন কিছুতেই টানতে পারছেন না তারা। বাপ-বেটা সুস্থ থাকলে খেটে খেতে পারতো; সে অবস্থা এখন আর তাদের নেই। সরকারের সহায়তা ছাড়া তাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব নয়।

Post A Comment: