আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের মাইন স্থাপনের ঘটনায় বিজিবি কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জনালেও এখনো মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কোন উত্তর দেয়নি। বরং নতুন নতুন এলাকায় শত শত স্থলমাইন পুতছে দেশটির সেনাবাহিনী। এর মধ্যেই মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বান্দরবান সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে এখনো ঢুকছে শত শত রোহিঙ্গা।
 

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের মাইন স্থাপনের ঘটনায় বিজিবি কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জনালেও এখনো মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কোন উত্তর দেয়নি। বরং নতুন নতুন এলাকায় শত শত স্থলমাইন পুতছে দেশটির সেনাবাহিনী। এর মধ্যেই মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বান্দরবান সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে এখনো ঢুকছে শত শত রোহিঙ্গা।


প্রতিদিনই সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে ঘটছে হতাহতের ঘটনা। আর এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পরেছে সীমান্তবাসীদের মাঝে। গত এক সাপ্তাহে বান্দরবান সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে এক নারীসহ পাঁচজন নিহত ও অপর চারজন আহত হয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, রোহিঙ্গাদের ঠেকাতে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুনধুম সীমান্ত থেকে আলীকদম সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার অংশে সহস্রাধিক স্থলমাইন ও উচ্চ ক্ষমতার বিস্ফোরক পুতে রেখেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এসব মাইন বিস্ফোরণে প্রতিদিনই ঘটছে হতাহতের ঘটনা।

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা জানান, ওপারে নিবর্বিচারে গুলি ও রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে ঘরবাড়ি জালিয়ে দেয়ার পাশাপাশি সীমান্তে মাইন পুতে নতুন কৌশলে রোহিঙ্গা দমনের চেষ্টা চালাচ্ছে সেদেশের নিরাপত্তা বাহিনী। নির্যাতন সইতে না পেরে এপাড়ে পালিয়ে আসেও রক্ষা পাচ্ছেনা রোহিঙ্গারা। তার কাটা বেড়ার পাশে শত শত স্থলমাইন ও বিস্ফোরক থাকা সত্ত্বেও জীবন বাঁচাতে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে রোহিঙ্গারা পাড়ি জমাচ্ছে বাংলাদেশে। অন্যদিকে প্রতিনিয়িত মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন রোহিঙ্গা ও সীমান্তের বাসিন্দারা।

নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালা সীমান্তে বড় ছনখেঅলা শিবিরে অশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা নুর মুহাম্মদ জানান, সীমান্তে শুধু কাটা তারের বেড়া নয়, যেসব জায়গা দিয়ে মানুষ চলাচল করে এবং রোহিঙ্গারা যেসব রাস্তা ধরে বাংলাদেশে আসছে সেসব জায়গাগুলোতে মাইন ও বিস্ফোরক পুতে রাখা হয়েছে।

নাইক্ষ্যংছড়ির রেজু এলাকায় অন্যান্য রোহিঙ্গার মতই আশ্রয় নিয়েছেন সেখানকার লেনসি এলাকার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নুর হোসেন। তিনি জানালেন স্থলমাইনের চাইতে বিস্ফোরকের সংখ্যাই বেশি। কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তারা স্থলমাইন পুতে রাখছে। স্থলমাইন দামে বেশি হওয়ায় স্থানীয় ভাবে তৈরী বিস্ফোরকের সংখ্যাই বেশি।

তুমব্রু সীমান্তে আশ্রয় নেয়া মাইন বিস্ফোরণে আহত ফকিরা বাজার এলাকার রোহিঙ্গা আক্তার আহম্মদ জানান, মাইন বিস্ফোরনে যারা আহত হচ্ছে তাদের শরীরের বেশির ভাগই উড়ে যায়। তবে স্থানীয় ভাবে তৈরী বিস্ফোরকে আহতরা মারা না গেলেও পঙ্গু হয়ে যায়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী শুধু এখন নয় এর আগেও জিরো লাইনের কাছে তারা অসংখ্য মাইন পুতেছে। রাতের আধারে এমনকি টহলের সময়ে তারা দল বেঁধে মাইন পুতছে। দূর থেকে মাইন পুতার দৃশ্য দেখা গেলেও ভয়ে কাছে কেউ যায় না।

ঢেকুবনিয়া এলাকার জনপ্রতিনিধি নুর মোহাম্মদ জানান, আগে নাসাকা ক্যাম্পগুলোতে স্থানীয়ভাবে তৈরী বিস্ফোরক বানানো হত। এগুলোতে বিস্ফোরক তার ব্যাটারি এসব ব্যবহার করা হতো। এখন এসব আরো উন্নত করা হয়েছে। এ কারণে হতাহতের ঘটনাও বেশি ঘটছে।

ঘুনধুম ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ জানান, জিরো লাইনের কাছে বিপুল সংখ্যক মাইন থাকা সত্বেও রোহিঙ্গারা উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিবারসহ এপাড়ে আসছে। আশ্রয় শিবিরগুলোতে থাকা রোহিঙ্গা সুযোগ বুঝে তাদের বাসা বাড়িতে ফিরতে গিয়ে মাইনে আহত হচ্ছে। এছাড়া গরু-ছাগল ও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িতরা লোভে পড়ে জিরো লাইনে কাটা তারের বেড়া অতিক্রম করতে গিয়ে বিস্ফোরণে আহত হচ্ছে।

নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তরা বলছেন স্থানীয় ভাবে তৈরী বিস্ফোরকে ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি বলা হয়ে থাকে। এগুলো বাঁশ বা লোহার নলের ভেতর বিস্ফোরক ঢুকিয়ে তার জোড়া দিয়ে বানানো হয়। অনেকটা মাইনের আদলে। এতে পা পড়লে বা আঘাত লাগলে তা বিস্ফোরিত হয়। অপর দিকে চীন ও রাশিয়ার তৈরী কিছু এন্টি পারসোনাল মাইন বা স্থলমাইনও মাটিতে পুতে রাখা হয়।

নাইক্ষ্যংছড়ির বিজিবির ৩১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আনুয়ারুল আজিম জানান, যেহেতু ঘটনাগুলো সীমান্তের ওপারে ঘটছে সে জন্য স্পষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না সেগুলো মাইন না বিস্ফোরক। তবে লোকজন আহত ও নিহত হওয়ায় এগুলো যে উচ্চ ক্ষমতার বিস্ফোরক তা বুঝা যাচ্ছে। এনিয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সঠিক প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেও প্রতিবাদ জানানো হবে।

এদিকে সীমান্তে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ৯০ এর দশকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদি গ্রুপ সীমান্তে স্থলমাইন বসায়। পরে রোহিঙ্গা সমস্যা বাড়লে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহযোগিতায় সেদেশের সেনাবাহিনী স্থলমাইন বসায়। এসব মাইন অপসারণে দুদেশের বাহিনী বেশ কিছু অভিযানও পরিচালনা করেছে। তবে সীমান্ত সমস্যার কারণে মাইন অপসারণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

এ বিষয়ে বিজিবির কক্সবাজার রিজিয়নের ভারপ্রাপ্ত রিজিয়ন কমান্ডার কর্নেল আনিস জানান, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘণ করে বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের স্থলমাইন ও বিস্ফোরক স্থাপনের ঘটনায় বিজিবি এ পর্যন্ত ৪ বার প্রতিবাদ জানালেও এখনো পর্যন্ত কোন উত্তর দেয়নি মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। বরং নতুন নতুন এলাকায় স্থলমাইন ও বিস্ফোরক স্থাপন করে চলেছে সেদেশের নিরাপত্তা বাহিনী। বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে।

Post A Comment: