ঘরে যে চাল ছিল সেগুলো দুপুরে রান্না হয়েছে। বিকালে রান্নার জন্য চাল নেই। ছেলে যদি আয় করে চাউল কিনে আনে তাহলে বিকালে রান্না হবে। না হলে না খেয়ে থাকতে হবে। কথাটি লংগদুতে অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত নিগিরি সোনা চাকমার।
Hunger-hungry-day-is-spent-in-the-langadu 

ঘরে যে চাল ছিল সেগুলো দুপুরে রান্না হয়েছে। বিকালে রান্নার জন্য চাল নেই। ছেলে যদি আয় করে চাউল কিনে আনে তাহলে বিকালে রান্না হবে। না হলে না খেয়ে থাকতে হবে। কথাটি লংগদুতে অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত নিগিরি সোনা চাকমার।


মঙ্গলবার লংগদু-নানিয়াচর সড়কের পাশে বাট্ট্যা ঝুপড়ি ঘরে বসে এ কথাগুলো বলছিলেন নিগিরি সোনা।

তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ কি হবে চোখে অন্ধকার দেখছি। পরের ঘরে কাজ করে যে কিছু আয় করব তার পরিবেশও নেই। সবার ঘর পুড়েছে। কোথাও কাজ নেই। বলেন, স্বামী কয়েক বছর আগে মারা গেছে।

ঝুপড়ি ঘরে ছেলেকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। বলেন, যেখানে আছি এটি আমার জমি নয়। নিরাপত্তা না থাকায় পোড়া ভিটায় ফিরতে পারছি না। আমার পোড়া ঘরের চারদিকে বাঙালিদের বসবাস। সেখানে আমার বাগান আছে। ভয়ে যাচ্ছি না।

সরেজমিনে তিন টিলা পাড়া, বাইট্ট্যা পাড়া ঘুরে দেখা গেছে, বাইট্ট্যা পাড়া কয়েকটি পরিবার পোড়া ভিটার পাশে ঝুপড়ি ঘর বানিয়ে বসবাস করছেন।  অন্যদিকে তিন টিলা পাড়ায় ঝুপড়ি ঘর চোখে পড়েছে দুটি। একটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়।

অন্য ঝুপড়ি ঘরে বাঁশের বেড়া খুটছেন মিনাকি চাকমা (৩৫)। বলেন, চার মাস গেল ঘর বাড়ি নেই। কিভাবে দিন পার করছি তা শুধু ভগবান জানেন।

তিন টিলা পাড়ার দয়াল চন্দ্র কার্বারী বলেন, গত ১২ জুলাই ডিসির ত্রাণ গ্রহণ যেন আমাদের জন্য অভিশাপ হয়েছে। ২ বান ঢেউটিন, ৬ হাজার টাকা, ২টি কম্বল এবং ৩০ কেজি চাল গ্রহণ করে প্রচার করা হয়েছে সরকার আমাদের ত্রাণ দিচ্ছে। পুনর্বাসন শুরু করেছে। এ খবরে বেসরকারি ত্রাণ বন্ধ হয়ে যায়। সবার ঘরে খাবার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

তিনটিলা গ্রামের মিনু চাকমা, ননিবালা চাকমা বলেন, তারা কেউ দূরের আত্মীয়, কেউ বিদ্যালয়ে, কেউ ঝুপড়ি ঘরে দিন কাটাচ্ছেন।

লংগদু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও লংগদু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মোট ১১ পরিবার সেখানে অবস্থান করছে। তারা বলেন, তাদের যা আছে তা খেয়ে দিন পার করছেন।  সরকারের পক্ষ থেকে কোন ত্রাণ সহায়তা দেয়া হচ্ছে না বিদ্যালয়ে।

এ ব্যপারে ইউএনও বলেন, যারা বিদ্যালয়ে অবস্থান করছে তারা নিজেদের উদ্যোগে খায়।

বাট্ট্যা পাড়ার গ্রাম প্রধান শান্তি ময় চাকমা বলেন, ডিসির ত্রাণ আমরা নিতে চায়নি। ডিসি এসে আমাদের অনুরোধ করেছিলেন এগুলো নেন। এরপর ধাপে ধাপে সব আসবে। কিন্তু কই? ডিসি যে চলে গেল এরপর আমরা কিভাবে আছি, কি খাচ্ছি, কোন খবর নেয়া হয়নি। বাট্ট্যা পাড়ার দেব চাকমা বলেন, আগুনে সব ধান পুড়ে যায়। ত্রাণ পাওয়া চাল শেষ হয়ে গেছে। বুড়ো মা বাপ, স্ত্রী, ছেলে মেয়ে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করছি। পরিস্থিতি যখন ভাল ছিল তখন দৈনিক শ্রম বিক্রি করে আয় করার ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমানে তা নেই। সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অঞ্জনা চাকমা বলেন, আমাদের খাবার শেষ হয়ে গেছে। চাল নেই। টাকা নেই। কাপড় নেই। কিভাবে চলব তা ভেবে পাচ্ছি না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোসাদ্দেক মেহ্দী ইমাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার প্রতি ৩০ কেজি চাল দেয়ার পর তাদের কোন খাদ্য দেয়া হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ন প্রকল্প থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর নির্মাণের জন্য প্রতিটি ঘরে ৪ লক্ষ ৭২ হাজার দিয়ে ঘর নির্মাণ করে দেয়া হবে। এগুলো চলমান। এছাড়া সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যাংক থেকে টাকাগুলো উত্তোলন করা গেলে ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করা যাবে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা  ইউএনডিপি থেকেও সহায়তা দেয়া হবে শুনেছি।

ইউএনও আরো বলেন, আমরা সরেজমিনে ১৭৬ ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের মালিক পেয়েছি। তাদের ঘর নির্মাণ করে দেয়া হবে। এটি চূড়ান্ত।  যারা ভাড়া ঘরে ছিলেন তাদের সব জিনিসপত্র পুড়ে গেছে। অন্যদিকে ঘরের মালিকের শুধু ঘর পুড়েছে। ভাড়াটিয়াদের ক্ষতিপূরণের ব্যপারে সুনিদির্ষ্ট কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

লংগদু উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দ্রুত ঘর নির্মাণ করা হলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও তারা খুব কষ্টে আছেন।

প্রসঙ্গত, ১ মে খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা-খাগড়াছড়ি সড়কের ৪ মাইল এলাকায় রাঙামাটির লংগদু ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা নয়নের লাশ পাওয়া যায়। পরদিন লাশ নিয়ে মিছিল থেকে বের হয়। এসময় তিন টিলা, বাট্ট্যা পাড়া এবং মানিকজোর ছড়া তিন পাহাড়ি গ্রামের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। পুড়ে যায় ২১৪টি বাড়ি।  মারা যান গুণমালা চাকমা।

Post A Comment: