জন্মের দেড় বছর বয়স পর্যন্ত সুস্থ স্বাভাবিক মুক্তামনির ডান হাতে প্রথমে দেখা দেয় ছোট ছোট গুটি। পরে তা টিউমারের আকার নেয়। বাড়তে থাকে রোগ। সাতক্ষীরার কামারবায়সা গ্রামের ছোট মুদি ব্যবসায়ী বাবা চালাতে থাকেন ঝাঁড়-ফুক আর কবিরাজি চিকিৎসা। আর এখন ১২ বছর বয়সী মেয়েটির শরীরের চেয়ে ভারী হয়ে যাওয়া ডান হাতে এখন ঘুরে বেড়ায় শত শত পোকা। চিকিৎসকেরা বলছেন আরও আগে চিকিৎসা শুরু করা গেলে হয়ত এখন সুস্থ থাকতে পারত সে। যদিও কয়েক দফা অস্ত্রোপচার হয়েছে মুক্তামনির হাতে।


জন্মের দেড় বছর বয়স পর্যন্ত সুস্থ স্বাভাবিক মুক্তামনির ডান হাতে প্রথমে দেখা দেয় ছোট ছোট গুটি। পরে তা টিউমারের আকার নেয়। বাড়তে থাকে রোগ। সাতক্ষীরার কামারবায়সা গ্রামের ছোট মুদি ব্যবসায়ী বাবা চালাতে থাকেন ঝাঁড়-ফুক আর কবিরাজি চিকিৎসা। আর এখন ১২ বছর বয়সী মেয়েটির শরীরের চেয়ে ভারী হয়ে যাওয়া ডান হাতে এখন ঘুরে বেড়ায় শত শত পোকা। চিকিৎসকেরা বলছেন আরও আগে চিকিৎসা শুরু করা গেলে হয়ত এখন সুস্থ থাকতে পারত সে। যদিও কয়েক দফা অস্ত্রোপচার হয়েছে মুক্তামনির হাতে।


পাশের জেলা খুলনার পাইকগাছার আরেক রোগী আবুল বাজানদার। বারো বছর বয়সে ছোট শিকড়ের মত অংশ দেখা দেয় হাতে ও পায়ে। ২৭ বছর বয়স পর্যন্ত কবিরাজি আর ঝাঁড়-ফুকে বিশ্বাস রেখে চলার ক্ষমতা হারিয়ে গণমাধ্যমে খবর হয়ে আসেন চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে। বৃক্ষমানব পরিচিতি পাওয়া আবুলের ভাগ্য ভালো। এক বছরের বেশি সময় ধরে অন্তত ২৪ বার চিকিৎসকদের ছুরির নিচে গিয়ে সুস্থ হওয়ার পথে রয়েছেন তিনি।


সম্প্রতি গণমাধ্যমের খবরে এ দুজন ছাড়াও বেশ কয়েকজন ‘বিরল রোগে’ আক্রান্ত মানুষের খবর পাওয়া যায়। মোটা দাগে দেখা যায়, তাদের বেশিরভাগের পরিবারই দরিদ্র। প্রত্যেকেই রোগ লক্ষণ দেখা দেওয়ার দীর্ঘ সময় পরে এসেছেন চিকিৎসকদের কাছে। ফলে রোগের সংক্রমণ যেমন বেড়েছে তেমনই বেড়েছে চিকিৎসা সংক্রান্ত জটিলতা।


চিকিৎসকদের কাছে দেরিতে যাওয়া প্রসঙ্গে ভিন্ন খবর.কম কথা বলে বৃক্ষমানব পরিচিতি পাওয়া আবুল বাজানদারের সঙ্গে। প্রত্যন্ত গ্রামের প্রায় নিরক্ষর একটি পরিবারে জন্ম নেওয়া আবুল বলছিলেন, ১৫-১৬ বছর বয়সে যখন তার হাতে পায়ে ছোট ছোট আাঁচিলের মতো দেখা দেয় তখন তিনি শরণাপন্ন হয়েছিলেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের। পরিবারের সদস্যদের ধারণা ছিল চিকিৎসকদের কাছে গেলে অতিরিক্ত খরচ হবে। তাই বেছে নেন ওই চিকিৎসা। পরে রোগ যখন আরও বাড়ে তখন নিরুপায় হয়ে বেশ কয়েকবার স্থানীয় চিকিৎসকদের কাছেও যান। নিজের কষ্টের দিনের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে আবুল বলতে থাকেন, একসময় অনেক কষ্টে টাকা যোগাড় করে ভারতেও গিয়েছিলেন তিনি। তবে ফল না পেয়ে হতাশ হতে হয় তাকে। এক পর্যায়ে চিকিৎসা নেওয়াও বন্ধ করে দেন। এর প্রায় ১২ বছর পর গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হলে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা শুরু হয় তার। ২৪ টি অস্ত্রোপচারের পর এখন দুই হাতে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ফিরে পেয়েছেন তিনি। অপেক্ষায় আছেন বাড়িতে ফেরার।


প্রায় একই ধরনের গল্প সাতক্ষীরার মুক্তামনির। জমজ বোন হীরামনি সুস্থ থাকলেও মুক্তামনির হাতে পাঁচ বছল বয়স থেকে দেখা দেয় ছোট ছোট মার্বেলের মতো দেখতে গোটা। একসময় বাড়তে থাকে তা। বাবা ইব্রাহীম হোসেন বেশ কয়েকবার তাকে নিয়ে চিকিৎসকদের কাছে গেছেন। কিন্তু ফল পাননি তারা। ইব্রাহীম দাবি করেন, খুলনার এক চিকিৎসক তাকে বলেছিলেন ‘মেয়ের আয়ু’ বেশিদিন নেই। পরে একসময় চিকিৎসা বন্ধ করে দেন তিনি। পরবর্তীতে মেয়ের হাতের ক্ষতস্থানে দেখা দেয় ছোট ছোট সাদা সাদা পোকা।


খতিয়ে দেখলে এ রকম গল্প আরও পাওয়া যাবে। গণমাধ্যমের খবরে এদের সব কয়জনকে ‘বিরল রোগে’ আক্রান্ত বলে দাবি করা হয়েছে। বাংলাদেশে বিরল রোগের আনুষ্ঠানিক কোনো বিবরণ না থাকলেও এর বৈশ্বিক একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ১০ লক্ষ মানুষের মধ্যে একজন আক্রান্ত হলে ওই রোগকে বিরল রোগ বলে অভিহিত করা হয়। সাধারণত এসব বিরল রোগীদের মধ্যে জন্মগত জীনজনিত ত্রুটি দেখা যায়।


তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় আসা রোগীদের ক্ষেত্রে এমন ত্রুটি সবক্ষেত্রে দেখা যায়নি। বরং চিকিৎসায় অবহেলা বা দেরিতে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে আসায় জটিলতা বাড়ার ঘটনা বেশি দেখা গেছে। আবুল বাজানদেরের রোগটিকে ‘পিডার্মোডিসপ্লাসিয়া ভেরাসিফরমিস’ বা বৃক্ষমানব সিনড্রোম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন চিকিৎসকেরা। আর মুক্তামনির রোগটিকে 'লিমফেটিক ম্যালফরমেশন' নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি রক্তনালীর একধরণের টিউমার জনিতে রোগ।


আবুল বাজানদার আর মুক্তামনি ছাড়াও এ রকম জটিল রোগে আক্রান্ত বেশ কয়েকজন রোগীর এখন চিকিৎসা চলছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে। রোগীরা কেন দেরিতে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে আসছে? এমন প্রশ্নের জবাবে বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের জাতীয় সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন ভিন্ন খবর.কমকে বলেন, এজন্য দায়ী মূলত অসেচতনতা ও শিক্ষার অভাব। রোগ লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর দীর্ঘদিন অবহেলা করার পর তারা চিকিৎসকদের কাছে আসছেন। এটি রোগের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।


তবে তিনি বলেন, ‘এখন পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে। গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত খবর গুরুত্ব পাওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি বার্তা যাচ্ছে। এর সুফল পাওয়া যাবে।’


এ ছাড়া এই ধরনের রোগীদের চিকিৎসার আওতায় আনতে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের তৎপরতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। বাংলাদেশ প্লাস্টিক সার্জারি চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রবাদপ্রতীম এই চিকিৎসক বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে প্রতিটা উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতি মাসে একটা করে সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ করা মাঠকর্মীদের পাশাপাশি চিকিৎসকেরাও থাকেন। তারা যদি আলোচনা করেন এবং গ্রামে মানুষকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝান এবং মনিটরিং করেন, তাহলে এক ধরনের সচেতনতা তৈরি হবে। এতে হয়তো এ ধরনের রোগী একটু আগেই সঠিক চিকিৎসার জন্য আসবে।’

Post A Comment: