নব্য জেএমবির কথিত আমির আইয়ুব বাচ্চুর হাত ধরেই জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন রাজধানীর পান্থপথের ওলিও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে আত্মঘাতী জঙ্গি সাইফুল ইসলাম।
 

নব্য জেএমবির কথিত আমির আইয়ুব বাচ্চুর হাত ধরেই জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন রাজধানীর পান্থপথের ওলিও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে আত্মঘাতী জঙ্গি সাইফুল ইসলাম।


১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শোক মিছিলে হামলার নির্দেশনা পেয়ে ঢাকায় এসেছিলেন এই জঙ্গি। তার সঙ্গে দুই- তিনজন সহযোগীও ছিল, যারা কয়েকদিন আগে ধানমন্ডির আশপাশের এলাকা রেকি করেছিলেন।

অনুসন্ধানে এমন তথ্যই পেয়েছেন কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) সদস্যরা। সাইফুলের সহযোগীদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে ওলিও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে ‘অপারেশন আগস্ট বাইট’ নামে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের ঘটনায় কলাবাগান থানায় একটি মামলা করা হয়েছে।

কলাবাগান থানার ডিউটি অফিসার এসআই আব্দুস সালাম বৃহস্পতিবার জানান, বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে হোটেল ওলিওতে অভিযানের ঘটনায় মামলাটি (মামলা নম্বর ১৫) দায়ের করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, আইয়ুব বাচ্চুর নির্দেশনা পেয়েই বাড়িতে চাকরির ইন্টারভিউয়ের কথা বলে খুলনা থেকে ঢাকায় আসেন সাইফুল। ঢাকায় এসে প্রথমে তিনি মিরপুর এলাকায় অবস্থান করেন। সেখান থেকে পরবর্তীতে হোটেল ওলিওতে গিয়ে রুম ভাড়া নেন। হামলার পরিকল্পনা সফল করতে সহযোগীদের নিয়ে ধানমন্ডির আশপাশের এলাকা রেকি করেন।

সূত্র আরো জানায়, পান্থপথের ওলিও হোটেল থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের দূরত্ব মাত্র ৩০০ মিটার। সেখানে আসা শোক মিছিলে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা সফল করতেই সাইফুল ও তার সহযোগীদের পাঠানো হয়েছিল। যদিও আগেই গোয়েন্দা তথ্য থাকায় হামলাকারীদের চিহ্নিত করতে মাঠে নামে একাধিক টিম।

ধানমন্ডি ও আশপাশের এলাকায় ব্লক রেইডের এক পর্যায়ে জঙ্গি সাইফুলের খোঁজ পান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

কে এই আত্মঘাতী সাইফুল?

ওলিও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শেষে হোটেলটির রেজিস্টারে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আত্মঘাতী যুবকের নাম সাইফুল ইসলাম। তিনি খুলনার ডুমুরিয়ার আবুল খায়ের মোল্লার ছেলে। বিএল কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী গত সোমবার রাতে হোটেলের চতুর্থ তলার ৩০১ নম্বর কক্ষটি ভাড়া নিয়েছিলেন।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, মৃত্যুর আগে নব্য জেএমবির দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডারের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন সাইফুল। ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এই যুবক। তার বাবা আবুল খায়ের মোল্লাও খুলনা জামায়াত নেতা।

নব্য জেএমবির বর্তমান প্রধান হাবিবুর রহমান ওরফে আইয়ুব বাচ্চুর হাত ধরে সংগঠনে আসা সাইফুল ইত্তেহাদী গ্রুপের সদস্য ছিলেন। এ গ্রুপের সদস্যরা একাই আত্মঘাতী হয়ে জনসমাগমে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করেন। সংগঠনের সিদ্ধান্তেই তিনি ‘হিজরত’ না করে পরিবার ও সমাজে মিশে চলাফেরা করতেন।

সাইফুলের সহযোগীদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে

শোক মিছিলে হামলার পরিকল্পনা সফল করতে জঙ্গি সাইফুল ইসলামের সঙ্গে আরও কয়েকজন সহযোগী ছিল। তারা হোটেল ওলিও’র আশপাশেই অবস্থান করছিল বলে দাবি করেছে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) আছাদুজ্জামান মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, জঙ্গি সাইফুলের সঙ্গে আরও কয়েকজন সহযোগী ছিল। ঘটনাস্থলের আশপাশেই এদের অবস্থান ছিল। প্রাথমিকভাবে জঙ্গি সাইফুলের সহযোগীদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। তার সহযোগীদের ধরতে গোয়েন্দারা কাজ করছেন।

তিনি বলেন, সাইফুল মাত্র কিছুদিন আগেই জেএমবিতে যোগ দিয়েছিলেন। তাকে ইত্তেহাদী হামলার জন্য নিয়োজিত করা হয়েছিল। হোটেল ওলিওর ব্যবস্থাপকের কাছ থেকে সাইফুলের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়। তাই কম সময়ের মধ্যেই তার পরিচয় জানা গেছে।

যেভাবে সাইফুলের সন্ধান ও অপারেশন আগস্ট বাইট

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম  বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে নাশকতার পরিকল্পনা করছিল নব্য জেএমবির একটি সেল। মিছিলে ঢুকে আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নাশকতার মাধ্যমে তারা সংগঠনের অস্তিত্ব জানান দিতে চেয়েছিল।

তিনি বলেন, আমরা এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের আশপাশের তিনটি এলাকায় ব্লক রেড চালাই। পরে নিশ্চিত হই পান্থপথের ওলিও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের চারতলার ৩০১ নম্বর রুমে একজন অবস্থান করছে। তখন ওই রুমে বাইরে থেকে তালা দিয়ে দেয়া হয়।

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, সকালে সোয়াট সদস্যরা তাকে আত্মসমর্পণের অনুরোধ করেন। সাড়া না দিলে অভিযান শুরু হয়। সোয়াট সদস্যরা গুলি করতে করতে ভেতরে ঢুকে গ্যাস ছোড়ে। তখন একটি বিস্ফোরণে দরজা ভেঙে যায় আর বোমাসহ সে বেরিয়ে আসে। সোয়াট গুলি চালালে সে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটায়। তার কাছে তিনটি শক্তিশালী বোমা ছিলো যার একটি অবিস্ফোরিত ছিল, সেটি পরে নিষ্ক্রিয় করা হয়।

হোটেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

হোটেল ওলিও কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে সাইফুলকে সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তারাই বাইরে থেকে রুমে তালা দিয়ে পুলিশে খবর দিয়েছিল। ওলিও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের মালিক নুরুল ইসলাম  বলেন, সোমবার মধ্যরাতে সাইফুল ইসলামকে তার কক্ষে তালাবদ্ধ করে আটকে ফেলা হয়। কক্ষে তালা লাগিয়ে কলাবাগান থানা পুলিশে খবর দেয় হোটেলের ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম। তার আগের রাত থেকেই পুলিশ ওই এলাকায় ব্লক রেইড চালাচ্ছিল।

নুরুল ইসলাম জানান, রোববার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় শেরে-বাংলা নগর থানার ওসি প্রথম তার পাশের হোটেল ওলিও হ্যাভেনে আর নতুন কোনও অতিথি তুলতে নিষেধ করেন। সে সময় তিনিও তার হোটেলে নতুন অতিথি তোলা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার হোটেলটি কলাবাগান থানা এলাকায় পড়ায় তিনি কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।

তিনি আরো জানান, সোমবার দিন গিয়ে রাত তিনটার দিকে তাকে ম্যানেজার সাইফুল ফোন করেন। সাইফুল জানান যে হোটেলের এক অতিথির চলাচল সন্দেহজনক এবং ওই অতিথির কক্ষে উঁকি দিয়ে বৈদ্যুতিক তার দেখা গেছে। তাই কক্ষটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে পুলিশে খবর দেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল ও ওলিও হ্যাভেন নামের দুইটি হোটেলেরই মূল মালিক বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা হোটেল এরাম ইন্টারন্যাশনালের মালিক ফিরোজ চৌধুরী। হোটেল ওলিও গত মার্চ মাস থেকে লিজে চালাচ্ছেন নুরুল ইসলাম।

Post A Comment: