এবারের বন্যা কৃষকের সঙ্গে সঙ্গে কোমর ভেঙে দিয়েছে মৎস চাষিদের। রংপুর অঞ্চলে ৬৫ হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখন সহায় সম্বলহীন। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তারা। যদিও মৎস বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের পরামর্শ দেয়ার পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে রিহ্যাবিলেট করা হবে। অন্যদিকে বন্যায় উৎসাহ উদ্দীপনা যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত মাছ চাষি, উদ্যোক্তাদের উৎসাহ জোগাতে জরুরি ভিত্তিতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
65-thousand-fish-farmers-in-Rangpur-hand-on-the-head 

এবারের বন্যা কৃষকের সঙ্গে সঙ্গে কোমর ভেঙে দিয়েছে মৎস চাষিদের। রংপুর অঞ্চলে ৬৫ হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখন সহায় সম্বলহীন। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তারা। যদিও মৎস বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের পরামর্শ দেয়ার পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে রিহ্যাবিলেট করা হবে। অন্যদিকে বন্যায়  উৎসাহ উদ্দীপনা যাওয়া  ক্ষতিগ্রস্ত মাছ চাষি, উদ্যোক্তাদের উৎসাহ জোগাতে জরুরি ভিত্তিতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।


রংপুর কৃষি বিভাগ বলছে, বন্যায় এই বিভাগের প্রায় এক লাখ পুকুর, দিঘী, খামারের পোনা ও মাছ ভেসে গেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বন্যায় তছনছ হয়ে গেছে পুকুর, দীঘি খামারের অবকাঠামো, তীর, নেট। সাথে সাথে সব পুঁজি-পাট্রা-স্বপ্ন ভেসে গেছে প্রায় ৬৫ হাজার মৎসচাষি ও খামারীর। মৎস বিভাগের হিসাবে টাকার অংকে যার পরিমাণ ৩৩২ কোটি টাকার ওপরে। যদিও প্রকৃতপক্ষে এই ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার অপেক্ষায় আছেন মৎস চাষি ও উদ্যোক্তারা।

মৎস অধিদপ্তর রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক অদ্বৈত চন্দ্র দাস  রংপুর বিভাগের আট জেলায় প্রায় দুই লাখ ৬৫ হাজার পুকুর, দীঘি ও খামার আছে। এরমধ্যে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত করা তালিকা অনুযায়ী ১২ হাজার ২৮১ হেক্টর আয়তনের ৯৯ হাজার ৮১৭টি পুকুর, দীঘি, খামারের মাছ ও পোনা মাছ বন্যায় ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৫ হাজার ৪৩৫ জন চাষি। এরমধ্যে সবেচেয়ে বেশি ভেসে গেছে দিনাজপুরে চার হাজার ৫১৮ দশমিক ৬ হেক্টর আয়তনের ৩৬ হাজার ৮৩টি পুকুর, দীঘি ও খামারের মাছ। এরপরই আছে নীলফামারীতে দুই হাজার ২৩০ হেক্টর আয়তনের ২৪ হাজার ৯৭০ টিসহ রংপুরে ৯১০ দশমিক ৬৯ হেক্টরের পাঁচ হাজার ৪৮২টি, গাইবান্ধায় ১০৬ হেক্টর আয়তনের এক হাজার ৫০টি, কুড়িগ্রামে এক হাজার ৬০৭ দশমিক ৮ হেক্টর আয়তনের ১১ হাজার ৮৫৬টি, লালমনিরহাটে এক হাজার ১৭৪ দশমিক ৬৮ হেক্টর আয়তনের ছয় হাজার ৩৬৫টি, ঠাকুরগাঁওয়ে ৭৫ দশমিক ৯ হেক্টর আয়তনের ৭৫০টি এবং পঞ্চগড়ে ৩০৩ দশমিক ৬ হেক্টর আয়তনের তিন হাজারটি পুকুর, দীঘি ও খামারের মাছ বানের পানিতে ভেসে গেছে।

মৎস্য কর্মকর্তা জানান, এই পরিমাণ পুকুর থেকে আমাদের তথ্য উৎস অনুযায়ী  ৩৩১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে।

তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে মৎস চাষি খামারি, মৎসজীবী, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে প্রকৃত পক্ষে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তিনগুণেরও বেশি।

একাধিক মৎস চাষি জানান, এক একর জমিতে বিভিন্ন পদ্ধতি ও জাতের মাছ চাষ করতে অবকাঠামো নির্মাণ সংস্কারসহ গড়ে আড়াই লাখ খরচ হয়। সে হিসেবে রংপুর বিভাগে এবারের বন্যায় ১২ হাজার ২৮১ হেক্টর অর্থাৎ ৩০ হাজার ৩৩৪ একর আয়তনের পুকুর, দীঘি, খামারের মাছ ভেসে গেছে। তিনি জানান, অবকাঠামো নির্মাণ (তীর তৈরি) এক একর জমিতে পদ্ধতি ও জাত অনুযায়ী মাছ চাষ করতে গড়ে তিন লাখ টাকা খরচা পড়ে। সে হিসেবে এই বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৯১০ কোটি টাকার ওপরে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চরাঞ্চল, নিম্নাঞ্চল ও উঁচু জায়গা যেখানেই ঢুকেছে বানের পানি, সেখানেই ভেসে সয়লাব হয়ে গেছে পুকুর, দীঘি, খামার। চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। দ্বিতীয় প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে মাছ চাষ এই অঞ্চলে গত পাঁচ বছর থেকে বেশ চাষিপ্রিয় উঠেছিল। মৎস বিভাগে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম রেখেছিল মাঠে।  কিন্তু বানের পানি সব সয়লাব করে নিয়ে গেছে। পুকুর, দীঘি, খামারের চিহ্ন নেই বেশির ভাগ কবলিত স্থানে। জাল দিয়ে রক্ষার চেষ্টাও হালে টেকেনি।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ফরহাদ হোসেন  বলেন, ‘ছোটভাইকে নিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে আড়াই একর জমির ওপর মাছের খামার গড়ে তুলেছিলাম। দুই ভাইয়ের অতীত জীবনের সমস্ত আয় দিয়ে তিলে তিলে আমরা গড়ে তুলেছিলাম শিং, মাগুর, টেংরা, গুলশা, বোয়ালসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছের বিশাল এই অভয়াশ্রম। কিন্তু কিছু বুঝে না উঠার আগেই দ্বিতীয় দফার বন্যায় আমার প্রজেক্টের ওপর দিয়ে একহাঁটু পানির স্রোত চলে গেছে।’

রংপুরের নোহালীর আজিজুল ইসলাম নামের এক উদ্যোক্তা  বলেন, ‘আমি কী করবো ভেবে পাচ্ছি না। এতগুলো মানুষকে কী দিয়ে বোঝাবো। এখানে প্রায় সাড়ে ৭০০ মানুষ নিজের ঘাম শ্রম দিয়ে এই প্রকল্পের তীর তৈরি করেছিল। তারা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে, গরু ছাগল বিক্রি করে, কেউ বউয়ের গয়না বিক্রি করে প্রকল্পে ইনভেস্ট করেছিল। তাদের তো করার আর কিছুই থাকলো না। এখর তারা ঋণের কিস্তি শোধ করবে কী দিয়ে।’

বাংলাদেশ আওয়ামী কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বদরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কৃষিবিদ বিশ্বনাথ সরকার বিটু  জানান, রংপুর বিভাগের হঠাৎ করে বন্যা হওয়ায় মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই, যাদের পুকুরের মাছ ও পোনা ভেসে গেছে তাদেরকে বিনামূল্যে সরকারিভাবে মাছের পোনা দিয়ে, নষ্ট হয়ে যাওয়া পুকুরের অবকাঠামো নির্মাণে এককালীন আর্থিক সহযোগিতা করে তাদের ঘুরে দাঁড় করে দেয়া হোক।

মৎস অধিদপ্তর, রংপুর বিভাগের উপ-পরিচালক রকিব উদ্দিন বিশ্বাস  জানান, বন্যায় এখন পর্যন্ত যে হিসাব করেছি তাতে ক্ষতির পরিমাণ ৩৩১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, যেসব পুকুর থেকে মাছ ভেসে গেছে সেসব আমরা এসেসমেন্ট অব্যাহত রেখেছি। কার কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়ে এসেসমেন্ট করে কাকে কীভাবে রিহেবিলেট করা যাবে সেটা নিয়ে আমরা কাজ করছি।

Post A Comment: