রাজধানীর পরীবাগে গৃহকর্মীকে ৭তলা ফেলে দিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার সালেহ আহমেদ ওরফ কার্লোসের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন, ইয়াবা ও হুন্ডি ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার ও বেপরোয়া জীবনযাপনসহ নানা অপকর্মের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। অস্ট্রেলিয়া ফেরত এই যুবক প্রযোজক পরিচয়ে প্রতি শুক্রবারই তার বাসায় মদ ও নারীর জলসা বসাতেন। সেখানে যোগ দিতেন শোবিজ জগতের নামিদামি মডেল ও অভিনেত্রীরা।
কার্লোসের বাড়িতে জলসায় মাততেন শোবিজ তারকারা

  

  রাজধানীর পরীবাগে গৃহকর্মীকে ৭তলা ফেলে দিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার সালেহ আহমেদ ওরফ কার্লোসের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন, ইয়াবা ও হুন্ডি ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার ও বেপরোয়া জীবনযাপনসহ নানা অপকর্মের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। অস্ট্রেলিয়া ফেরত এই যুবক প্রযোজক পরিচয়ে প্রতি শুক্রবারই তার বাসায় মদ ও নারীর জলসা বসাতেন। সেখানে যোগ দিতেন শোবিজ জগতের নামিদামি মডেল ও অভিনেত্রীরা।


বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতার আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ ও তার সাবেক স্ত্রী মডেল পিয়াসার সঙ্গেও সখ্য ছিল কার্লোসের। গুলশানের মিরেজ শিশা বারে নিয়মিত যাতায়াত ছিল এই প্রযোজকের। সিনেমা বানানোর নামে উঠতি মডেল ও অভিনেত্রীদের একান্ত সান্নিধ্য উপভোগ করতেন তিনি।

গৃহকর্মীকে ৭তলা থেকে ফেলা দেয়ার অভিযোগে গত শুক্রবার কার্লোসকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর তদন্ত করতে গিয়ে তার বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের তথ্য পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

জানা গেছে, সামুদ্রিক পণ্য ও কোমল পানীয়ের ব্যবসার আড়ালে ইয়াবা ব্যবসা চালাতেন কার্লোস। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে নিজের নাম লেখান। বর্তমানে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককজুড়ে তার ইয়াবা নেটওয়ার্ক রয়েছে।

শুধু তাই নয়, বেপরোয়া জীবনযাপন করা এই তরুণের সঙ্গে সব সময় একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র থাকতো। তার বাসায় আরো অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। কারো সঙ্গে কথা কাটাকাটি হলেই এগুলো দিয়ে ভয় দেখাতেন কার্লোস।

বিকৃত যৌনাচারেরও একাধিক অভিযোগ মিলেছে এই যুবকের বিরুদ্ধে। তিনি কিছুদিন পরপরই স্ত্রী বদল করতেন। বেশি বেতনে সুন্দরি গৃহকর্মীও নিয়মিত বিরতিতে সরবরাহ করা হতো তার বাসায়। বিকৃত যৌনাচার ছিল তার নেশা। কথিত স্ত্রীর সামনেই কাজের গৃহকর্মীর ওপর চলতো অকথ্য অত্যাচার। যৌন উত্তেজক ইনজেকশন নিয়ে মাঝে-মধ্যে বেসামাল হয়ে পড়তেন তিনি।

গৃহকর্মীকে ৭তলা থেকে ফেলে দেয়ার পর কার্লোসের বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে, ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার ওসি (তদন্ত) জাফর আলী বিশ্বাস। তিনি  বলেন, কার্লোস দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত এবং সে বিকৃত মানসিকতার যুবক। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপকর্মের তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ৭তলা থেকে মেয়েটিকে ফেলে দেয়ার কথা স্বীকার করলেও ধর্ষণের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তবে আমরা তার বিরুদ্ধে পাওয়া সকল অভিযোগেরই তদন্ত করছি। তদন্ত শেষেই বিস্তারিত জানানো যাবে।’

এদিকে কার্লোস আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে খুব সহজেই নানা অপকর্ম করতে নিজের গাড়িতে জাতীয় সংসদের মনোগ্রামও ব্যবহার করতেন বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের গোয়েন্দারা। তাদের মতে, এর আগে এসব অপরাধে ২০১৪ সালে কার্লোসকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

শুক্রবার রাতে গৃহকর্মীকে ধর্ষণের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ৭তলা থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনার পরই কার্লোসের ব্যাপারে আবারো অনুসন্ধান শুরু করে র‌্যাব।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে জানা গেছে, কার্লোস এখনো তার একটি বিলাসবহুল গাড়িতে সংসদের মনোগ্রাম ব্যবহার করে বিভিন্ন অবৈধ এবং অসামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার সহকারী পরিচালক সিনিয়র এএসপি মিজানুর রহমান ভূঁইয়া  জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে শাহবাগ থানা এলাকার ৩/৩এ, পরীবাগের (দিগন্ত টাওয়ার) পার্কিং-২ থেকে সালেহ আহমেদের (HYUNDAI-H1) মডেলের একটি নতুন গাড়ি উদ্ধার করা হয়। গাড়িতে জাতীয় সংসদের মনোগ্রাম লাগানো ছিল।

তিনি জানান, এর আগে ২০১৪ সালে অবৈধ মুদ্রা ও হুন্ডি ব্যবসা, মাদক ব্যবসা এবং নিজ গাড়িতে জাতীয় সংসদের মনোগ্রাম ব্যবহার করার অপরাধে তাকে গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব। এখনো তিনি একই ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত।

শুক্রবার রাতে পরীবাগ এলাকার একটি বহুতল আবাসিক ভবনের ৭তলা থেকে গৃহকর্মীকে ফেলে দিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ওঠে কার্লোসের বিরুদ্ধে। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া ওই গৃহকর্মী বর্তমানে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই গৃহকর্মী সাংবাদিকদের জানান, বাসায় কাজে যোগদানের পর থেকেই কার্লোস তাকে বিকৃত যৌনাচারে বাধ্য করেন। তিনি সব সময় মদ এবং ইয়াবার নেশায় টালমাটাল থাকতেন। তার স্ত্রীও ইয়াবায় আসক্ত।

তিনি আরো জানান, কার্লোস কথিত স্ত্রীর চোখের সামনেই তার সঙ্গে যৌনাচারে লিপ্ত হতেন। শুক্রবার রাতে তিনি নিজের শরীরে একাধিক বিদেশি যৌন উত্তেজক ইনজেকশন পুশ করেন। এতে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। এ সময় তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালান। বাধা দেওয়ায় মারধর করে ৭তলার বারান্দা দিয়ে তাকে নিচে ফেলে দেন। একই সঙ্গে তার কথিত স্ত্রীকেও মারধর করেন।

ভুক্তভোগীর মা বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। ওর আগে বিয়ে হয়েছিল, স্বামী তালাক দিয়েছে। দুই ছেলেকে নিয়ে মানুষের বাসায় কাজ করে সংসার চালাতো। মোটা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে ওই বাসায় নেয়া হয়। আমি এই অত্যাচারের বিচার চাই।’

তিনি বলেন, কাজ শুরু করার দুদিন যেতে না যেতেই মেয়ের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। বাইরে বের হওয়ারও সুযোগ ছিল না। সারাক্ষণ রুমের মেইন দরজায় তালা দিয়ে চাবি নিজের কাছে রেখে দিতেন গৃহকর্তা। ওই বাসার কোনো কাজের মেয়েই তার নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পেত না।

ভুক্তভোগীর ছোট ভাই জানান, পরীবাগের ১৬তলা দিগন্ত অ্যাপার্টমেন্টের ৭তলায় কার্লোসের বাসায় তার বোন ১৫/১৬ দিন ধরে কাজ করছিলেন। তার বোনের দুটি সন্তান রয়েছে।

তিনি আরো জানান, বাড়ির গৃহকর্তা কার্লোস তার বোনকে মারধর করে ৭তলার পেছনের বারান্দা দিয়ে নিচে ফেলে দেন। হত্যার উদ্দেশ্যেই তাকে ফেলে দেওয়া হয়। ওই বাসায় কাজ নেওয়ার পর থেকেই বোনের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ ছিল। গৃহকর্তা চাইতেন না তার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করুক। যে দিন তার বোন কাজে যোগ দেন, সেদিন থেকেই তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ ছিল।

Post A Comment: