বগুড়া টিএমএসএস মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (ম্যাটস) ছাত্রী ইসমত আরা পারভীন মুনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। তবে মুনের বাবা বিজিবি সদস্য গাজিউল ইসলাম। তিনি দাবি করেন, যৌতুক লোভী স্বামী এসএম সায়েম রাহাত তাকে ভবনের দশম তলা থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করে।
বগুড়ায় ম্যাটস্ ছাত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু

    বগুড়া টিএমএসএস মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (ম্যাটস) ছাত্রী ইসমত আরা পারভীন মুনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। তবে মুনের বাবা বিজিবি সদস্য গাজিউল ইসলাম। তিনি দাবি করেন, যৌতুক লোভী স্বামী এসএম সায়েম রাহাত তাকে ভবনের দশম তলা থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করে।


অন্যদিকে রাহাতের বাবার রফিকুল ইসলাম দাবি, টিএমএসএস প্রতিষ্ঠানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ একাধিক ব্যক্তির সাথে মুনের অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। মুন সম্পর্কে ওই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগও দেয়া হয়েছিল। তখন বিচার করা হলে আজ এ দুঃখজনক ঘটনা ঘটতো না।

তিনি আরো বলেন, টিএমএসএস মেডিকেল ভবনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও মুনের দুটি মোবাইল ফোনের কললিস্ট যাচাই করলেই পুলিশ এ ব্যাপারে স্বচ্ছ ধারণা পাবে। সোমবার গভীর রাতে সদর থানা পুলিশ শহরতলির ঠেঙ্গামারা এলাকায় টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ভবনের লিফটের নিচ থেকে মুনের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে। বুধবার বিকেলে এ খবর পাঠানো পর্যন্ত মামলা হয়নি; পুলিশ কাউকে গ্রেফতারও করেনি।

মুনের বাবা গাজিউল ইসলাম জানান, তার মেয়ে ইসমত আরা পারভীন মুন গত ২০১৪ সালে এসএসসি পাশ করার পর টিএমএসএস ম্যাটসে ভর্তি হয়। সম্প্রতি চুড়ান্ত পরীক্ষা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের কাছে জনৈক মন্টুর বাড়িতে ভাড়া বাসায় থাকতো। সোনাতলার মধুপুর গ্রামের ওষুধ ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের ছেলে এসএম সায়েম রাহাত তার মেয়েকে গত বছরের ২৪ অক্টোবর জোড়পূর্বক বিয়ে করেন। যৌতুক না পেয়ে তার মেয়েকে মারপিট করে তাড়িয়ে দেয়। এ ব্যাপারে মুন আদালতে রাহাতের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করেন। ওই মামলায় রাহাত গ্রেফতার হন। রাহাত প্রতিশোধ নিতে তার মেয়ে মুনকে ভবন থেকে ফেলে হত্যা করেছে। তিনি সদর থানায় এ ব্যাপারে হত্যা মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এদিকে রফিকুল ইসলাম জানান, অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জে মুনের বিয়ে হয়েছিল। স্বামীর বন্ধুর সাথে পরকিয়া প্রেমের সম্পর্ক সৃষ্টি হলে তাকে তালাক দেয়া হয়। মুন মহরানার সাড়ে ৩ লাখ টাকা আদায় করে। এছাড়া যৌন হয়রানির মামলার ভয় দেখিয়ে এক ব্যক্তির কাছে ৫০ হাজার টাকা আদায় করেছিল। এসএসসি পাশ করার পর মুন টিএমএসএস ম্যাটসে ভর্তি হয়। তার ছেলে এসএম সায়েম রাহাত ২০১১ সালে একই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিলেন। একই উপজেলার মানুষ হিসেবে মুনের সাথে রাহাতের পরিচয় হয়। মুন তাকে বড় ভাই হিসেবে সম্বোধন করতো। পরবর্তীতে মুন তার ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।

গত বছরের ২৪ অক্টোবর মুন মোবাইল ফোনে রাহাতকে জানায়, তার বিয়ে হয়েছে। বিয়ের মিষ্টি খেতে বগুড়া শহরের ইয়াকুবিয়া স্কুল মোড়ে আকবরিয়া মিস্টি মেলায় যেতে অনুরোধ করে। তখন ফোনে মুনের মা রওশন আরা পারভিন একই কথা বলেন। তাদের কথায় বিশ্বাস করে রাহাত সেখানে গেলে বেশ কয়েকজন অজ্ঞাত যুবক তাকে জিম্মি করে এবং কাজী অফিসে নিয়ে আড়াই লাখ টাকা মোহরানায় মুনকে বিয়ে করতে কাবিননামায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন। তিনি বিষয়টি জানতে পেরে টিএমএসএস ম্যাটসের অধ্যক্ষের কাছে লিখিত নালিশ করেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ মুনের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি এবং চিঠি গোপন রাখেন।

ছেলেকে বিয়ে করতে বাধ্য করায় রফিকুল ইসলাম ৩ নভেম্বর সদর আদালতে মুন ও তার মায়ের বিরুদ্ধে এবং ওই কাবিননামা বাতিলে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি জজ আদালতে মামলা করেন। দুটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। অপরদিকে ৯ ডিসেম্বর মুন সদর আদালতে রাহাতের বিরুদ্ধে যৌতুক দাবি, নির্যাতন ও ৩ লাখ টাকা ধার আদায়ের মামলা করেন। ১৭ জানুয়ারি আদালতে আত্মসমর্পণ করলে রাহাতকে জেল হাজতে পাঠানো হয়। প্রভাবশালী মহলের তদবির হওয়ায় এখানে জামিন হয়নি। ১৬ মে হাইকোর্ট জামিন দেন। পরদিন রাহাতকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।

রফিকুল ইসলাম আরো জানান, মুনের সাথে টিএমএসএস প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও হাসপাতালের দালাল মিজানসহ একাধিক ব্যক্তির অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। ওইসব ব্যক্তির সাথেই মুন আদালতে আসতো। তার বিশ্বাস তারাই তাদের অপরাধ গোপন করতে মুনকে ভবন থেকে ফেলে হত্যা করেছে। মুনের দুটি মোবাইল ফোন, ওড়না এবং গহনা পাওয়া যায়নি। মেসে থাকা মুন কীভাবে রাত ১১টার দিকে হাসপাতাল ভবনের দশম তলায় এলেন এবং তার সাথে কারা ছিলেন সিসি ক্যামেরার ফুটের দেখলেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

বগুড়া শহরের কয়েকটি ক্লিনিকের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানায়, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট রাহাত খুব ভালো ছেলে। ১৬ মে জামিন লাভের পর থেকে ঢাকায় অবস্থান করছে। তার পক্ষে টিএমএসএস হাসপাতাল ভবনে গিয়ে মুনকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা সম্ভব নয়। তারা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মুন হত্যার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন। মুনের লাশের সুরতহাল তৈরি ও ময়নাতদন্তের দায়িত্বে থাকা সদর থানার এসআই আবদুল গফুর জানান, নিহতের দুই হাত, পা ও কোমড় ভাঙা ছিল। এছাড়া মাথায় আঘাত ও রক্তাক্ত ছিল।

বগুড়া সদর থানার ওসি (অপারেশন) আবুল কালাম আজাদ জানান, বুধবার বিকেল পর্যন্ত নিহত মুনের পরিবার থানায় কোন মামলা দেয়নি। মামলা পেলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Post A Comment: