অ, আ, ক, খ এইসব বর্ণমালা শিক্ষা দিয়ে থাকেন শিক্ষকরা। সেটা স্কুলে বা নিজ বাড়িতেও দেন। আর এই শিক্ষা গ্রহণ করেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশ সেবায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করে থাকে। কিন্ত যে বাড়ি থেকে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ার কথা সেই বাড়িটি রূপ নিয়েছে জঙ্গি আস্তানায়। জঙ্গি তৎপরতার ক্ষেত্রে এ এক নতুন অধ্যায়। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জঙ্গি সংগঠনগুলোর কৌশল পরিবর্তনের এটাও আরেকটি দিক বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দাবি করা হচ্ছে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের মাঝে জঙ্গি কার্যক্রম ছড়িয়ে দেবার অপচেষ্টা।
শিক্ষক বাড়ি থেকে 'জঙ্গি আস্তানা

অ, আ, ক, খ এইসব বর্ণমালা শিক্ষা দিয়ে থাকেন শিক্ষকরা। সেটা স্কুলে বা নিজ বাড়িতেও দেন। আর এই শিক্ষা গ্রহণ করেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশ সেবায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করে থাকে। কিন্ত যে বাড়ি থেকে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ার কথা সেই বাড়িটি রূপ নিয়েছে জঙ্গি আস্তানায়। জঙ্গি তৎপরতার ক্ষেত্রে এ এক নতুন অধ্যায়। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জঙ্গি সংগঠনগুলোর কৌশল পরিবর্তনের এটাও আরেকটি দিক বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দাবি করা হচ্ছে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের মাঝে জঙ্গি কার্যক্রম ছড়িয়ে দেবার অপচেষ্টা।


জেএমবি প্রধান শায়ক আব্দুর রহমান, সেকেন্ড ইন কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইসহ বেশ কয়েকজনের ফাঁসি হবার পর তাদের তৎপরতা অনেকটাই থেমে যায়। কিন্ত গেলো দু’বছর থেকে শুরু হয় ফের অপতৎপরতা। ঢাকা গুলশানের ঘটনার পর থেকেই আবারো নজরে আসে জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম। সকল সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গি দমনে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও গুলশান অটিজান রেষ্টেুরেন্টের ঘটনার পর জোর কার্যক্রম শুরু হয়। বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চলাকালিন জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায় পুলিশ ও র্যাব। ইতিমধ্যে ডজনাধিক আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ ও র্যাব। উদ্ধার করে অস্ত্রসস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের নাশকতা কাজে ব্যবহারের জন্য বিস্ফোরক দ্রব্য। সাথে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জিহাদি বই, মোবাইল, ল্যাপটপ, সিডিসহ বিভিন্ন সামগ্রী।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০০৪ সালের দিকে যখন জঙ্গি কার্যক্রম শুরু হয়, তখন প্রত্যান্ত অঞ্চলেই এর অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সেই সময় অতি উৎসাহী কারো বাড়ি থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা হত। এমনকি ভাড়া বাড়ি থেকেও এমন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এখনও তেমন রয়েছে। তবে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে জঙ্গি সদস্যরা এখন নিজেদের বাড়ি ব্যবহার করছে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। সাথে পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি স্বজনদেরও সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে। যাতে করে দ্রুত সর্বমহলে সাংগঠনিক কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে পারে। রাজশাহীতেও এমন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ফলে রাজশাহীতে শিক্ষক বাড়ি হয়ে উঠে জঙ্গি আস্তানা।

রাজশাহীর তানোরে ডাঙ্গাপাড়া এলাকায় স্কুলশিক্ষক রমজান আলীর বাড়ি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রোববার রাতে তানোরের গৌরাঙ্গপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রমজান আলীর বাড়িটি নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে জঙ্গিরা এমন তথ্য পায় বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। রোববার রাত সাড়ে ১২টার দিকে তারা তানোর থানা পুলিশকে নিয়ে ওই বাড়িটি ঘিরে ফেলেন। শুরু করে অপারেশন রিবার্থ। এ সময় জঙ্গি সন্দেহে তার দুই ছেলে ইব্রাহিম ও ইসরাফিল এবং মেয়ের জামাই রবিউলকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে পিস্তলসহ পাঁচ রাউন্ড গুলি পায় পুলিশ। পরে তাদের দেওয়া তথ্যে পুলিশ জানতে পারে, ওই বাড়িতেই বোমাসহ সুইসাইডাল ভেস্ট মজুদ আছে।

দ্বিতীয় দফায় অভিযান পরিচালনার আগে বাড়ির অন্য সদস্যদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায় পুলিশ। সোমবার ভোর ৬টার দিকে শিক্ষক রমজান আলীসহ ওই পরিবারের স্ত্রী আয়েশা, মেয়ে হাওয়া বিবি, দুই ছেলের বউ ও চার শিশুসন্তানসহ মোট নয়জন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। পরে তাদেরকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। ওই বাড়িতে বিপুল পরিমাণ জিহাদি বই, কিছু সিডি, নগদ প্রায় দুই লাখ টাকা, পাঁচটি মোবাইল ফোন, একটি ল্যাপটপ ও দুটি মোটরসাইকেল পাওয়া গেছে। এগুলো জব্দ করা করেছে পুলিশ।


স্থানীয়রা সাংবাদিকদের জানান, মেয়ে জামাই রবিউলের বাড়ি উপজেলার বনকেশর গ্রামে। সে কাঠমিস্ত্রি। এদের মধ্যে ইসরাফিল হোমিও চিকিৎসক। মুন্ডুমালা কামিল মাদ্রাসা থেকে তিনি ফাজিল পাস করেছেন।

উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মুঞ্জুরুল ইসলাম মুঞ্জু সাংবাদিকদের বলেন, প্রায় ১০-১২ বছর ধরে রমজান আলীর পরিবারের সদস্যরা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও ঈদের নামাজ পড়তেন। চলতি রমজান মাসেও তারা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে একদিন আগে থেকে রোজা রাখা শুরু করেন। বাইর থেকে ২০-২৫ জন লোক এনে প্রতি বছরে ঈদের নামাজ পড়েন তারা সৌদীর সাথে মিল রেখে। গত বছর ইব্রাহিম ও ইসরাফিলের বাবা রমজান আলী এবং তাদের মা আয়শা বেগম হজ্ব করেছেন। ইব্রাহিম ও ইসরাফিল মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছে। বর্তমানে ইব্রাহিমের বাড়ির পাশে সার ও কীটনাশকের দোকান আছে। সেই সঙ্গে তিনি ব্যাটারি চালিত অটোগাড়ি চালান। ইসরাফিল বাড়ির পাশে হোমিও দোকান দিয়ে ব্যবসা করেন। তাদের ভগ্নীপতি রবিউলের বাড়ি একই ইউনিয়নের বনকেশর চকপাড়া গ্রামে। রবিউল কাঠ মিস্ত্রির কাজ করে। স্ত্রীর সন্তান হওয়ার পর থেকে রবিউল শ্বশুর বাড়িতে ছিল।

প্রতিবেশী জামিলুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, বিগত ৫-৭ বছর ধরে ইসরাফিলের চলাফেরা আলাদা হয়ে গেছে। ওই পরিবারের লোকজন প্রয়োজন ছাড়া কারো সঙ্গে মিশতেন না। মৌলবাদী ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী তারা।

ইসরাফিলের চাচাতো ভাই আবদুল জলিল সাংবাদিকদের জানান, ইসরাফিলের চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক ভাইরা ভাইয়ের জঙ্গি কানেকশন আছে। এ সুবাদে ইসরাফিলও জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে।

তানোরের এই জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের বিষয়ে মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি খুরশীদ হোসেন সাংবাদিকদের সামনে বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ওই বাড়ি থেকে গ্রেফতার হওয়া ইব্রাহীম, ইসরাফিল ও রবিউল নব্য জেএমবির সাথে জড়িত। তারা হাতকাটা মাহফুজের অনুসারী।

অভিযানকে সফল উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৌশল অবলম্বন করে সকলকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। তারা বাড়ির দ্বোতলায় উঠে যেতে পারলে সুইসাইডাল ভেস্ট পরে ফেলতে পারতো। এতে হতাহতের ঘটনার আশঙ্কা থাকতো।

তিনি বলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরে জঙ্গিরা তাদের প্রবেশ ঘটনানোর চেষ্টা করছে। যেমন রমজান আরী একজন স্কুল শিক্ষক। এর পরেও তাঁর জামাই ও দুই ছেলে জঙ্গি সংগঠনের সাথে জড়িত। ফলে সকলে যখন জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছেন তখন সেই বাড়িটিকে আস্তানা হিসেবে গড়ে তুলছে। এমনটিও হতে পারে এই শিক্ষক বাড়িটির ক্ষেত্রে। কারণ বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রশস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য প্রাপ্তি সেটাই পরিষ্কার করে। তবে এখন আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে তা পরিষ্কার হওয়া যাবে।

Post A Comment: