উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে অবশেষে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মোড় পরিবর্তনকারী অবস্থান নিতে যাচ্ছে, যা পশ্চিমাদের কাছে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বহুল প্রতীক্ষীত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের এ অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে সম্ভবত ট্রাম্পের ভূমিকা আছে এবং এজন্য তিনি ধন্যবাদও পেতে পারেন।

  
উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে অবশেষে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মোড় পরিবর্তনকারী অবস্থান নিতে যাচ্ছে, যা পশ্চিমাদের কাছে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বহুল প্রতীক্ষীত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের এ অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে সম্ভবত ট্রাম্পের ভূমিকা আছে এবং এজন্য তিনি ধন্যবাদও পেতে পারেন। 

চীনের গ্লোবাল টাইমস  পত্রিকায় ১২ এপ্রিল প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রতি সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, দেশটি যদি আর কোনো আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র ও পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা চালায়, তাহলে তারা চীনের পক্ষ থেকে ‘অকল্পনীয় জবাব’ পাবে। সম্পাদকীয়তে পিয়ংইয়ংকে তার পরমাণু অস্ত্রের উচ্চাভিলাসে লাগাম টানতে বলা হয়েছে। নতুবা উত্তর কোরিয়ায় চীনের তেল রপ্তানি ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে’ বলেও হুঁশিয়ার করা হয়েছে।

গ্লোবাল টাইমস পত্রিকাটি চীনের ‘পিপলস ডেইলি’র মালিকানাধীন, যেটি ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র হিসেবে বিবেচিত। এজন্য গ্লোবাল টাইমসের মন্তব্যকে সরকারের মন্তব্য বলে মনে করা হয়। 

চীনের পক্ষ থেকে উত্তর কোরিয়ার প্রতি এমন হুমকিকে ‘গেম চেঞ্জার’ বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, উত্তর কোরিয়াকে ঠেকানোর অন্যতম উপায় হচ্ছে চীন। কারণ উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির ৮০ ভাগই চীনের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি গত এক দশক ধরে জাতিসংঘ চীনকে উত্তর কোরিয়ায় তেল রপ্তানি বন্ধ করতে বারবার আহবান জানালেও চীন সেটি উপেক্ষা করে এসেছে।  উত্তর কোরিয়ার যে কোনো কিছুতেই সমর্থন দেওয়াটা আগে বেইজিংয়ের কৌশল ছিল। তবে এখন মনে হচ্ছে বেইজিং তাদের সেই কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করছে।

৫ এপ্রিল গ্লোবাল টাইমস’র আরও একটি সম্পাদকীয়কেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। ওই সম্পাদকীয়তে কোরীয় উপদ্বীপে চলমান উত্তেজনা বিষয়ে চীন তাদের অবস্থানও স্পষ্ট করেছে বলেও জানানো হয়েছে। 

ওই সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘চীনের উত্তর-পূর্বাংশের নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে’। এর শেষ দিকে বলা হয়েছে, ‘এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে উত্তর কোরিয়াকে তাদের কোনো পরমাণু অস্ত্রের প্রদর্শন করতে দেওয়া হবে না’।

উত্তর কোরিয়াকে সতর্ক করে দিয়ে ওই সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়, ‘উত্তর কোরিয়াকে এমন কোনো কাজ করতে দেওয়া হবে না, যা শরণার্থী সমস্যাকে উসকে দিতে পারে। এমনকি উত্তর কোরিয়ার কোনো যুদ্ধপ্রিয় সরকারকেও সমর্থন দেবে না চীন।’ 

তবে সম্পাদকীয়টির শেষে বলা হয়, উত্তর কোরিয়া ও চীনের সীমান্তবর্তী ইয়ালু নদীতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চীন সহ্য করবে না।

উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে চীনকে এতটা স্পষ্ট অবস্থান নিতে আগে কখনও দেখা যায়নি। কিন্তু চীনের এ অবস্থান পরিবর্তনে ট্রাম্পের ভূমিকা কী?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে শেষ সাক্ষাতে উত্তর কোরিয়ার প্রতি বিশেষ নজর দিতে ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন ওবামা। কারণ কিম জং উন তার পরমাণু অস্ত্র ও আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র বাড়িয়েই যাচ্ছিল। ট্রাম্প নিজেই তখন এটি গণমাধ্যমে বলেছেন।

দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প বেশ কয়েকবার টুইট করে বলেছেন, উত্তর কোরিয়াকে থামাতে চীনকে আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে। 

এসবের মধ্যেই মার্কিন সেনাবাহিনী দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ক্ষেপনাস্ত্র বিধ্বংসী প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা মোতায়েন করার পরিকল্পনা করছে, যদিও চীন এতে বাধা দিচ্ছে। 

মার্চে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন যখন এশিয়া সফর করছিলেন, তখন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বলেছিলেন, উত্তর কোরিয়া যদি তাদের পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ না করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে হামলার বিষয়টি বিবেচনা করবে। তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কৌশলগত নীরব’ থাকার দিন শেষ। 

দক্ষিণ কোরিয়া সফরে এসে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ১৭ এপ্রিল সোমবারও ঠিক একই কথা বলেছেন। উত্তর কোরিয়াকে হুঁশিয়ার করে তিনি বলেছেন, ‘কৌশলের অংশ হিসেবে চুপ থাকার দিন শেষ।’

৬ ও ৭ এপ্রিল চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। ট্রাম্প ও শি’র বৈঠকেও উত্তর কোরিয়া ছিল প্রধান আলোচ্য বিষয়। 

শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের পর চীনের মনোভাবের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সফরের পর চীনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, কোরীয় উপদ্বীপের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার শান্তিপূর্ণ সমাধান চান তিনি। 

চীনের প্রেসিডেন্টের এ মন্তব্যের একদিন পরই গ্লোবাল টাইমস  তাদের এক সম্পাদকীয়তে লিখেছে, সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপনাস্ত্র হামলার পর একথা অবিশ্বাস করার উপায় নেই যে, ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ায়ও হামলা চালাতে পারে। ওই সম্পাদকীয়তে পত্রিকাটি লিখেছে, ‘ট্রাম্প প্রসাশন উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র সমস্যার সমাধান করতে বদ্ধপরিকর’।

উত্তর কোরিয়া নিয়ে চীনের সঙ্গে সমঝোতার ইঙ্গিতও দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। বলেছেন, চীন যদি উত্তর কোরিয়াকে দমাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য চুক্তি বর্তমানের চেয়ে অনেকগুণ ভালো হতে পারে। 

নিশ্চিতভাবেই এসবের বাইরে আরও কিছু বিষয় বেইজিংকে তাদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য করছে। চীনের জনগণও বেইজিংয়ের নীতি নিয়ে খুশি নয় এবং নীতি পরিবর্তনের জন্য জনগণের পক্ষ থেকে বেইজিংয়ের ওপর চাপ বাড়ছে।

রাজনৈতিক ভাষ্যকার জন পমফ্রেট নিউ ইয়র্ক পোস্ট- এ তার কলামে লিখেছেন, কিমের ওপর চীন ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে গেছে, এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। 

Post A Comment: