চোখের জলে শেষ বিদায় নিলেন কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী লাকী আখন্দ। শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় তাকে শেষ বিদায় জানান সর্বস্তরের মানুষ। রাজধানীর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিননিদ্রায় শায়িত হলেন তিনি।
 চিরনিদ্রায় শায়িত লাকী আখন্দ


চোখের জলে শেষ বিদায় নিলেন কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী লাকী আখন্দ। শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় তাকে শেষ বিদায় জানান সর্বস্তরের মানুষ। রাজধানীর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিননিদ্রায় শায়িত হলেন তিনি।


শনিবার সকাল ১০টার দিকে লাকী আখন্দের জন্মস্থান আরমানিটোলার জামে মসজিদ মাঠে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে শিল্পীর মরদেহ নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পরিচালনায় সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাকী আখন্দের কফিনে ফুল দিয়ে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সর্বস্তরের মানুষ। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

এরপর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে হয় তৃতীয় জানাজা। বেলা পৌনে তিনটার দিকে শিল্পীর দাফন সম্পন্ন হয়।

'আগে যদি জানতাম', 'এই নীল মনিহার', 'আমায় ডেকো না', 'আবার এলো যে সন্ধ্যা', 'কে বাঁশি বাজায়রে', 'কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে', 'যেখানে সীমান্ত তোমার', 'লিখতে পারি না কোনো গান', 'কী করে বললে তুমি' এমন অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা লাকী আখন্দ শুক্রবার মারা যান। তিনি স্ত্রী মরিয়ম বেগম, মেয়ে মাম্মিন্তি নূর আখন্দ, ছেলে সভ্যতারা আখন্দসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

মাম্মিন্তি  জানান, শুক্রবার দুপুরে তার বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় দ্রুত তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মিটফোর্ড হাসপাতালে। সেখানে সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬১ বছর।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) টানা আড়াই মাস চিকিৎসার পর গত সপ্তাহে আরমানিটোলার নিজ বাসায় ফিরেছিলেন কিংবদন্তি এই শিল্পী। তিনি বাসায় থাকাকালীন 'শিল্পীর পাশে ফাউন্ডেশন' সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবী এরশাদুল হক টিংকু দেখভাল করছিলেন। তিনি জানান, লাকী আখন্দ হাসপাতাল থেকে ফিরে ক'দিন বেশ ভালোই ছিলেন। তবে গতকাল দুপুর নাগাদ তার শারীরিক অবস্থা ক্রমেই খারাপ হওয়ায় তাকে আবারও হাসপাতালে নেওয়া হয়। সব বাঁধন ছিন্ন করে আমাদের কাঁদিয়ে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান।

লাকী আখন্দ সুরকার হিসেবে কাজ করেছেন ভারতের এইচএমভি এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। স্বাধীনতার পর পর নতুন উদ্যমে বাংলা গান নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। তার নিজের সুর করা গানের সংখ্যা দেড় হাজারেরও বেশি। শিল্পীর সহোদর হ্যাপী আখন্দের মৃত্যুর পর দীর্ঘকাল তিনি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন। দু'জনের যৌথ প্রয়াসে সূচিত হয়েছিল বাংলা গানের এক নতুন ধারা। একাত্তরের রণাঙ্গনে যুদ্ধও করেছিলেন তিনি।

দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেছেন লাকী আখন্দ। ২০১৫ সালের শেষ দিকে চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখানে কেমোথেরাপি নেওয়ার পর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। ছয় মাসের চিকিৎসা শেষে ২০১৬ সালের ২৫ মার্চ ব্যাংকক থেকে দেশে ফেরেন তিনি। একই বছরের জুনে আবারও কেমোথেরাপির জন্য ব্যাংকক যাওয়ার কথা ছিল। আর্থিক সংকটে পড়ে আর সেখানে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। দেশের শীর্ষ শিল্পীদের উদ্যোগে সহযোগিতা করতে চাইলেও বিনয়ের সঙ্গে লাকী আখন্দ তা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তবে ব্যাংককে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তার চিকিৎসার জন্য পাঁচ লাখ টাকা সহায়তা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

লাকী আখন্দের জন্ম ১৯৫৬ সালের ১৮ জুন। শৈশব পেরোতেই তিনি সুযোগ পেয়ে যান প্রতিষ্ঠান এইচএমভিতে। তারপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। ছন্দ-লয়ের টানে তিনি ভেসে চললেন সুরদরিয়ায়। ১৯৮৪ সালে সারগামের ব্যানারে লাকী আখন্দের প্রথম একক অ্যালবাম প্রকাশ পায়। তিনি ব্যান্ড দল 'হ্যাপি টাচ'-এর সদস্য ছিলেন।

Post A Comment: