বাংলাদেশ, যেই নামটির সাথে মিশে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা। মুক্তিযুদ্ধের গল্পের ওপর নির্ভর করে ইতিমধ্যেই অনেক তথ্যচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, নাটক, সিনেমা এমনকি ভিডিও গেমও বানানো হয়েছে। বাদ যায়নি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনও। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি হওয়া এসব গেম বানিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানই সফলতা পেয়েছে।


  বাংলাদেশ, যেই নামটির সাথে মিশে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা। মুক্তিযুদ্ধের গল্পের ওপর নির্ভর করে ইতিমধ্যেই অনেক তথ্যচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, নাটক, সিনেমা এমনকি ভিডিও গেমও বানানো হয়েছে। বাদ যায়নি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনও। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি হওয়া এসব গেম বানিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানই সফলতা পেয়েছে।

তবে ব্যক্তি উদ্যোগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় অংশ গেরিলা যুদ্ধকে ফোকাস করে দেশের প্রথম থার্ড পারসন কো-অপ মাল্টিপ্লেয়ার শ্যুটার গেম ‘গেরিলা ব্রাদার্স’ নামে একটি মোবাইল গেম নির্মাণ করেছেন তরুণ গেম নির্মাতা বনি ইউসুফ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এতো গেম থাকতে কেন এই নতুন গেম তৈরি করেছেন তাই জানাতে বুধবার প্রিয়.কমের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি।

ভিন্ন খবর: বিশেষ কী আছে আপনার এই গেরিলা ব্রাদার্সে?
বনি ইউসুফ: ছোটবেলা থেকেই ভিডিও গেমের প্রতি দুর্বলতা থাকায় আমার ইচ্ছে ছিল আমি গেম নির্মাণ করবো। তাছাড়া সবসময় ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিছু করার মন মানসিকতা নিয়ে বড় হয়েছি। সেই জায়গা থেকেই সবার যুদ্ধভিত্তিক গেমগুলো থেকে আলাদাভাবে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছি এই গেরিলা ব্রাদার্স গেমটিতে। গেমটিতে বিশেষ সুবিধাগুলো হচ্ছে, এতে থার্ড পারসন কো-অপ মাল্টিপ্লেয়ার সুবিধা রাখার ফলে গেমটি লোকাল ওয়াইফাই ব্যবহার করে একসাথে দুজনও খেলতে পারবেন। আরও আছে ডায়নামিক কাভার সিস্টেম যার মাধ্যমে গেমার তার সামনে থাকা যেকোনো কিছুর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারবে এবং সেখান থেকে গুলি করতে পারবে।

একইসাথে গেমটিতে আমি জেরোস্কোপ বেইজড নিশানা পদ্ধতি ব্যবহার করেছি যার মাধ্যমে গেমার তার স্মার্টফোনটিকে নাড়াচাড়া করেই নিশানা নির্ধারণপূর্বক গুলি করে শত্রুকে শেষ করতে সক্ষম হবে। এছাড়াও এই গেমে সম্পূর্ণ বাংলায় ২৫ টিরও বেশি পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কথোপকথন থাকছে। এই সবগুলো ফিচারই বাংলাদেশে নির্মাণ করা কোনো গেমে প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয়েছে, যা নিয়মিত মোবাইলে গেম প্লেয়ারদের বাংলাদেশি গেম খেলার অভিজ্ঞতা বদলে দিবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আরও একটি বিষয় হচ্ছে এই গেমটি এতো সূক্ষ্মভাবে অপটিমাইজড করা হয়েছে যে চার বছর আগের পুরাতন প্রযুক্তির স্মার্টফোনেও কোনো প্রকার ল্যাগ ছাড়া খেলা সম্ভব।


ভিন্ন খবর: গেরিলা ব্রাদার্সের শুরুটা কীভাবে?
বনি ইউসুফ: যেহেতু আগেই বলেছি গেম বানানোর ইচ্ছেটা আমার খুব পুরনো। কয়েকবছর আগে আমি মুক্তিযুদ্ধের ওপর বেশ কয়েকটা বই পড়ি। একইসাথে বর্তমান প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা করছিলাম। তখন খেলতাম অ্যাকশন, অ্যাডভেঞ্চারাস গেমগুলো। বইগুলোর গল্প ধীরে ধীরে আমার মাথায় গাঁথা শুরু করলো, বিশেষ করে গেরিলা অংশগুলো। তখনই আমার মাথায় আসে যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমি একটি গেম বানাবো। এরপর সবকিছু মিলিয়ে নিজেই একটি গল্প তৈরি করলাম, তৈরি করলাম দুটি চরিত্র আর বেশ কিছু পরিবেশ। ব্যস, এরপর শুরু হয় আমার মিশন ‘গেরিলা ব্রাদার্স’। ২০১৬ সালের অক্টোবরের দিকে আমি গেমটি ডেভেলপ করা শুরু করি যা চলতি বছরের জানুয়ারিতে সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়। উন্মোচন করি ফেব্রুয়ারি মাসের ১৯ তারিখ। গেমটি তৈরি করে ইতিমধ্যেই আমি একটা অ্যাপ ডেভেলপ প্রতিযোগিতায় সাবমিট করেছি। 


ভিন্ন খবর: নামটা ‘গেরিলা ব্রাদার্স’ কেন?
বনি ইউসুফ: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের কাছে অনেক বড় একটি বিষয়। আমাদের স্মৃতি, শোক, গর্ব এবং আত্মবিশ্বাস সবকিছু ঘিরেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। আমার এই গেমের গল্পটা তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ কাল্পনিকভাবে। গেমটির প্রধান চরিত্র হচ্ছে কামাল ও তমাল দুই ভাইকে নিয়ে। আর যেহেতু যুদ্ধের প্রেক্ষাপটটা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। তাই এই গেমটির নাম দেওয়া হয়েছে গেরিলা ব্রাদার্স।

ভিন্ন খবর: গেমটির গল্প সম্পর্কে জানতে চাই...
বনি ইউসুফ: গল্পটা প্রধান দুই চরিত্র বড়ভাই কামাল ও ছোটভাই তমালকে নিয়ে। ছোট ভাইকে খুব ভালোবাসে কামাল। তাই তাকে নিয়ে তার অনেক চিন্তা। এর অন্য একটি কারণ তমাল বাক-প্রতিবন্ধি। কথা বলতে পারে না। যুদ্ধের সময় কামাল আহমেদ পাকিস্তানি মিলিটারিতে চাকরি করেন। ভাবতেন মিলিটারি হয়েই বুঝি পরিবারের পাশাপাশি দেশের জন্য কিছু করা সম্ভব। এরপর শুরু হয় একাত্তর সাল, সব কিছু উত্তাল, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সাত মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন বঙ্গবন্ধু। এরপর ২৫ শে মার্চের কালোরাত আসে। শুধুমাত্র সিভিল বাঙ্গালিদের না মিলিটারি ব্যারাকে বাঙ্গালি সৈন্যদের নির্বিচারে হত্যা করে হানাদররা। সেখান থেকে জীবন নিয়ে পালাতে পেরেছিল কামাল। এরপর এপ্রিলে যখন বাংলাদেশ সরকার গঠন হলো, কামাল তখন যোগ দিলেঅ মুক্তিবাহিনীতে। তবে এর মাঝে তমালকে সে ভুলে যায়নি কখনো। কামাল যেখানেই যেত, সময় পেলেই খুঁজে বেড়াত আদরের ছোটভাই তমালকে।
যুদ্ধের একটা সময় কামাল মুক্তিবাহিনী ক্যাম্পে তাঁর নিজ গ্রামের কিছু ছেলেকে দেখতে পায়। তাদের কাছে জানতে পারে তমালও যুদ্ধ করতে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। যুদ্ধ কীভাবে করতে হয় সেটি জানতো না তমাল। তবে কথা বলতে না পারার অক্ষমতা সত্ত্বেও সে যে দেশকে কতটা ভালবাসে তারই প্রমাণ দিয়েছে। জীবন যেতে পারে জেনেও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে চেয়ে সে প্রমাণ করেছে দেশের প্রতি তার ভালবাসা। এই ভালোবাসা প্রকাশের জন্য মুখের বুলির প্রয়োজন নেই। এর জন্য শুধু সময়ের প্রয়োজনে সবাইকে এক কাতারে নেমে আসতে হয়, তমাল সেটিই করেছে। এক দুপুরে কামাল তাঁর ছোট ভাইকে গেরিলা যুদ্ধ শেখানো শুরু করে। এভাবেই শুরু হয় এই ‘গেরিলা ব্রাদার্স’।
গেমটিতে দুই ভাই একসাথে ২টা লেভেলের কয়েকটা স্টেজ খেলতে পারবে চারটি মোডে। ইজি, নরমাল, হার্দ ও ইনসেন এই চারটি মোডে তৈরি হবে সহজ থেকে কষ্টসাধ্য বাধা। এতে করে প্রতিটি লেভেলেই গেমার পাবেন অন্যরকম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।

ভিন্ন খবর: তমালকে বাক প্রতিবন্ধী রাখা হলো কেন?
বনি ইউসুফ: এটা একটা মজার প্রশ্ন। (একটু হেসে) এক অর্থে বলা চলে, গেমটি যেহেতু আমি একা নির্মাণ করেছি তাই আমার গলা দিয়ে একজনের বেশি আওয়াজ বের হয় না। তাই এখানে আমি শুধু কামালের গলার স্বর দিতে পেরেছি। সেই জন্যেই তমালকে বাকপ্রতিবন্ধি রাখা হয়েছে। আরেক অর্থে, বড় ভাইরা তাদের ছোট ভাইদের কতটা খেয়াল রাখে, কতটা ভালোবাসে সেই মনের ভাবটুকুও প্রকাশ করা হয়েছে।

ভিন্ন খবর: গেমটি তৈরি করতে গিয়ে আপনি কী কী বাধা পেয়েছেন?
বনি ইউসুফ: আমি যেহেতু প্রোগ্রামার, সেই জায়গা থেকে আমার জন্য অ্যাপস বা সফট্ওয়্যার ডেভেলপ করা সহজ গ্রাফিক্স ডিজাইন বা অডিও ভিজ্যুয়াল করা না। এই গেরিলা ব্রাদার্স তৈরি করতে গিয়ে আমাকে গ্রাফিক্স ডিজাইন, থ্রিডি মডেলিং করা, এনিমেশন করা, সাউন্ড ইনপুট, ট্যাপআপসহ অনেক কিছু শিখতে হয়েছে। এরপর সেগুলো নিয়ে কাজ করেছি। এটা আমার জন্য বড় ধরনের একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। আরেকটা চ্যালেঞ্জ ছিল সহ-খেলোয়াড় বা কো-অপ মাল্টিপ্লেয়ারের পার্টটা তৈরি করা। একটা মোবাইলে যা দেখা যাচ্ছে ঠিক একই সময়ে অন্য মোবাইলে ওই এক জিনিসি দেখানোটা একটু কষ্টসাধ্য ছিল আমার জন্য। বলতে পারেন যেহেতু পুরো গেমটা একাই তৈরি করেছি তাই এই গেরিলা ব্রাদার্স নির্মাণ করাটাই আমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

ভিন্ন খবর: একা কেন....
বনি ইউসুফ: আমি একটি গেম নির্মাণ করতে প্রত্যেকটা বিভাগে কাজ করে নিজেকে দক্ষ করতে চাই। এর ফলে আমি যখন গেরিলা ব্রাদার্সের মতো আরো চমৎকার সব গেমগুলো নির্মাণ করবো তখন আমার একটা ফার্ম দরকার হবে, দরকার হবে আরো কিছু কর্মীর। তাদের কাজের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও ভুল ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করতে আগে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ কারণেই আপাতত একা কাজ করছি।

ভিন্ন খবর: এই গেম ছাড়া আর কী কাজ করেছেন?
বনি ইউসুফ: এই গেইমের আগে আমি ২০১৬ হ্যাকাথন নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আয়োজন ‘নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জের‘ বৈশ্বিক প্লাটফর্ম ‘প্ল্যানেট আর্থ’ ক্যাটাগরিতে ‘মোবিলিটি ফর মার্স’ নামের একটি প্রকল্প সাবমিট করেছিলাম। যা সারা বিশ্ব হতে চূড়ান্ত পর্বে জায়গা পাওয়া ৭৫টি প্রকল্পের মধ্যে তালিকার শীর্ষে উঠে যায়। ‘প্ল্যানেট আর্থ’ ক্যাটাগরিতে আমাদের প্রকল্পটি চূড়ান্ত পর্বে প্রথম অবস্থানে ছিল। এছাড়াও আমি পপশিল্পী ম্যাডোনা ও রিয়ান্নার ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটের বিভিন্ন প্লাগ-ইনস নির্মাণেও যুক্ত ছিলাম। আর বর্তমানে আমি আরও কিছু প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছি, তবে সেগুলো প্রকাশ করেই সবাইকে জানাবো।

Post A Comment: