অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান বলেছেন, ‘নতুন ভ্যাট আইনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর বিশেষ করে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও ওষুধধপাতির ওপর কোনো ভ্যাট থাকবে না।’

অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান বলেছেন, ‘নতুন ভ্যাট আইনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর বিশেষ করে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও ওষুধধপাতির ওপর কোনো ভ্যাট থাকবে না।’


শেরপুরের নাকুগাঁও শুল্ক স্টেশন প্রাঙ্গণে শনিবার সকালে অংশীজনদের মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন তিনি।

নজিবুর রহমানের সভাপতিত্ব সভায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কাছাকাছি ও সীমান্তবর্তী জেলা শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও শুল্ক স্টেশন আমদানি-রফতানি ও রাজস্ব সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে।

ভারতের মেঘালয়সহ কয়েকটি রাজ্য থেকে কয়লা, পাথর, গবাদিপশু, ফলমূল, রাসায়নিক সার, চায়না ক্লে, টিম্বার, চুনাপাথর, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, আদা, বল ক্লেসহ ১৭টি পণ্য এ বন্দর দিয়ে আমদানি হয়।

এর মধ্যে বেশি পরিমাণে আমদানি হয় কয়লা ও পাথর। এ ছাড়া সিমেন্ট, শাড়ি, গার্মেন্টস পণ্য, মশারিসহ বেশ কয়েকটি পণ্য রফতানি হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় দিন দিন রাজস্ব আহরণ বাড়ছে।

নাকুগাঁও শুল্ক স্টেশনের ভারতীয় ডলুর অংশে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, শুল্ক স্টেশন স্থাপন ও আমদানি-রফতানিযোগ্য পণ্যের পরিমাণ বাড়ালে রাজস্ব আহরণও অনেক বেড়ে যাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সভায় কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট (ঢাকা উত্তর)-এর কমিশনার মাসুদ সাদিক বলেন, ‘১৯৯৭ সালে নাকুগাঁও শুল্ক স্টেশন হিসেবে কাজ শুরু করে। কৌশলগত কারণে এ স্টেশনের সম্ভাবনা খুবই বেশি। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ ২০১০ সালে অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে এ স্টেশনে ৩০০ ট্রাক পার্কিং সুবিধা, ১০০ টন ক্ষমতার একটি ওয়েয়িং স্কেল স্থাপন করা হয়েছে। ১৭টি পণ্যের আমদানি ও সব পণ্যের রফতানি সুবিধা থাকলেও বেশ কয়েক বছর ধরে কয়লা ও পাথর আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। সিমেন্ট, তাঁতের শাড়ি ও প্লাস্টিক পণ্য রফতানি হচ্ছে। আমদানি-রফতানিতে এ স্টেশনের অমৃত সম্ভাবনা থাকলেও তা পরিপূর্ণ ব্যবহার করা হচ্ছে না। দু’দেশের সড়ক যোগাযোগসহ আরো কিছু উন্নয়ন হলে এ স্টেশনের পুরো সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে। রাজস্ব আহরণ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে।’

 


তিনি বলেন, ‘এ স্টেশন থেকে গত অর্থবছর ২ কোটি ৫৮ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ৮ মাসে ১ কোটি ৬১ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। সরকারের নেওয়া উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ও আমদানি-রফতানি বৃদ্ধি পেলে রাজস্ব কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।’

আমদানিকারকের প্রতিনিধি মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘১৭টি পণ্য আমদানির সুযোগ থাকলেও মাত্র দুটি পণ্য আমদানি হয়। ১৭ এপ্রিলের পর ভারতের নিষেধাজ্ঞার ফলে তাও নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। বৈধভাবে সকল পণ্য এ স্টেশন দিয়ে আমদানি করা হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, বাড়বে রাজস্ব।’ পাথর অগ্রিম কর দিয়ে আমদানির পরও লোড-আনলোডিং চার্জ যেন দিতে না হয় তা বিবেচনার দাবি জানান তিনি।

শেরপুর জেলা প্রশাসক ড. মল্লিক আনোয়ার বলেন, ‘ট্রানজিট হলে ভুটান থেকে এ স্টেশন দিয়ে পণ্য আমদানি করা যাবে। এ ছাড়া শেরপুর-জামালপুর রেল সংযোগ হলেও এ স্টেশনে আমদানি-রফতানি বেড়ে যাবে। এ স্টেশনের ফলে এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। শেরপুরে আরো বেশি শিল্প স্থাপন হলে এখান থেকে পণ্য এ স্টেশন দিয়ে রফতানি হবে, রাজস্ব বাড়বে।’

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (হিসাব) গাজী মো. আলী আকবর বলেন, ‘ভারতের মেঘালয়সহ কয়েকটি রাজ্য থেকে কয়লা, পাথর, গবাদিপশু, ফলমূল, রাসায়নিক সার, চায়না ক্লে, টিম্বার, চুনাপাথর, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, আদা, বল ক্লেসহ ১৭টি পণ্য এ বন্দর দিয়ে আমদানি হয়। এর মধ্যে কয়লা ও পাথর বেশি পরিমাণে আমদানি হয়। এ ছাড়া সিমেন্ট, শাড়ি, গার্মেন্টস পণ্য, মশারিসহ বেশ কয়েকটি পণ্য রফতানি হয়।’

তিনি বলেন, ‘নাকুগাঁও শুল্ক স্টেশনকে স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণার পর ১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ১৩.৪৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ৪০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার একটি ওয়্যার হাউস, ১০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার একটি ওয়িং ব্রিজ, ১০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার একটি ওপেন ইয়ার্ড, পার্কিং ইয়ার্ড, বাউন্ডারি ওয়াল, বিদ্যুৎ, অফিসসহ উন্নয়ন করা হয়। এ অঞ্চলের ব্যবসার সম্প্রসারণে এ স্টেশন ভূমিকা রাখছে। অবকাঠামোসহ ভবিষ্যতে আরো সুবিধা বৃদ্ধির ফলে এ স্টেশনের রাজস্ব আহরণ বেড়ে যাবে। নাকুগাঁও স্থলবন্দর পুরোপুরি কার্যকর হলে ভারতের আসাম ও মেঘালয় রাজ্য এবং নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।’

এনবিআর সদস্য ফরিদ উদ্দিন (শুল্কনীতি) বলেন, ‘এ স্টেশনে ১৭টি পণ্য আমদানির অনুমতি রয়েছে। যদি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা প্রস্তাব দেন তাহলে সরকার বিবেচনা করবে যাতে সেসব পণ্য এ স্টেশন দিয়ে আমদানি করা যায়। এ স্টেশনের ভারতীয় অংশে শুল্ক স্টেশনসহ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাবে। ফলে আমদানি-রপ্তানি বাড়বে, বাড়বে রাজস্ব। এ স্টেশনকে আরো গতিশীল করার জন্য অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডসহ অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে।’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এ স্টেশন দিয়ে আমদানি-রফতানি বাড়াতে ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসলে সরকার সব ধরনের সুবিধা দেবে। এ স্টেশনের মাধ্যমে রফতানির অপার সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এতেও ব্যবসায়ীদের ভূমিকা রাখতে হবে।’

                   

তিনি বলেন, ‘কর না দিলে কীভাবে উন্নয়ন হবে। সরকার তো বিদেশ থেকে টাকা এনে উন্নয়ন করবে না। বিদেশ থেকে টাকা আনতে হলে নাকে খর দিয়ে আনতে হয়। যত বেশি আমদানি-রফতানি হবে, রাজস্ব বাড়বে তত বেশি উন্নয়ন হবে। সোনার বাংলা গড়তে কর দিতে হবে।’

শেরপুরের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনে সরকার শেরপুরে ইকোনমিক জোন করে দেবে। এতে ইন্ডাস্ট্রি করতে যে কাঁচামাল এ স্টেশন দিয়ে নিয়ে আসলে সরকার ইন্ডাস্ট্রি করতে সহায়তা করবে।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, নতুন ভ্যাট আইনে জনসাধারণের সুবিধার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কোনো ভ্যাট আরোপ করা হবে না। এ ছাড়া ছোট ব্যবসায়ীরাও ৩০ লাখ টাকা পর্ন্ত ভ্যাট অব্যাহতি পাবেন।

মো. নজিবুর রহমান বলেন, ‘নাকুগাঁও স্টেশনের রাজস্ব সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এনবিআর কাজ করবে। ব্যবসায়ীদের মতামত ও সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে, তা নিয়ে কাজ করবে। আগামী মাসে ভারত থেকে কাস্টমসের উচ্চ পর্যায়ে একটি প্রতিনিধিদল আসবে। নাকুগাঁওয়ের সঙ্গে ডালু স্টেশনের সম্পর্ক কীভাবে ঘনিষ্ঠ করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘সারাদেশে একটি রাজস্ববান্ধব সংস্কৃতি চালু হয়েছে। রাজস্ব আহরণকে আরো গণমুখী, করদাতাবান্ধব ও অধিকতর ব্যবসা ও শিল্পবান্ধব করছে এনবিআর। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে এ স্টেশনে আমদানি-রফতানি বাড়বে, রাজস্ব বাড়বে।’

এর আগে সকাল সাড়ে ৮টায় সারাদেশে ‘রাজস্ব যাত্রার’ অংশ হিসেবে মুখ্য সমন্বয়ক ও এনবিআর চেয়ারম্যান নাকুগাঁও শুল্ক স্টেশন পরিদর্শন ও বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা প্রদান করেন।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ ২০১০ সালের ২৭ অক্টোবর নাকুগাঁও শুল্ক স্টেশনকে স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা করে ৩০ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করে।

Post A Comment: