আরো একটি নতুন পাখির খোঁজ পেল বাংলাদেশ। সম্ভব হলো সেই পাখিটি আলোকচিত্র ধারণ করার। পাখিটির ইংরেজি নাম ‘সুলতান টিট’ এবং বৈজ্ঞানিক নাম মেলানোক্লোরা সুলতানিয়া।

আরো একটি নতুন পাখির খোঁজ পেল বাংলাদেশ। সম্ভব হলো সেই পাখিটি আলোকচিত্র ধারণ করার। পাখিটির ইংরেজি নাম ‘সুলতান টিট’ এবং বৈজ্ঞানিক নাম মেলানোক্লোরা সুলতানিয়া।


ইতোপূর্বে অবশ্য ১৯৬৭, ১৯৮০ ও ১৯৯০ সালে বার্ড ওয়াচাররা (পাখি পর্যবেক্ষক) এ পাখিটি বাংলাদেশের পাখির তালিকায় যোগ করেছিলেন। কিন্তু তখন পাখিটির কোনো আলোকচিত্র ধারণ করা সম্ভব হয়নি। এবারই প্রথম ক্যামেরাবন্দি হলো এ পাখি।

জানা গেছে, সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চিম্বুক রেঞ্জের গহীন জঙ্গলে এই পাখিটির ছবি তোলেন সৌখিন পাখিপর্যবেক্ষক ও আলোকচিত্রী ডা. মো. রিজওয়ানুল করিম শামীম। এ সময়ে আরও ছিলেন সৌখিন পাখিপর্যবেক্ষক শফিকুল হক ইমন, আবদুল ফাত্তাহ, নাহিদ হাসান আর পরিবেশকর্মী আল মারুফ রাসেল।

প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এবারই প্রথম সুলতান তিত পাখিটিকে দেখা গেল। হয়তো আরো পঞ্চাশ বছর এ পাখিটিকে দেখা যাবে না। আমাদের দেশে বড় তিত (Great Tit) এবং সবুজ-পিঠ তিত (Green-backed Tit) আরো দু’টি তিত রয়েছে।

নামকরণ সম্পর্কে ইনাম আল হক আরো বলেন, এ পাখিটিরনামকরণ খুবই সহজ। সুলতান যেহেতু ইন্ডিয়ান নাম, তাই ওই নামানুসারেই হবে সুলতান তিত।

পাখিটির প্রথম ছবি ধারনের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে ডা. মো. রিজওয়ানুল করিম শামীম বলেন, এক পাহাড়ের ন্যাড়া চূড়া থেকে প্রায় আড়াইশ ফুট উঁচু এক গর্জন গাছে ক্যামেরা তাক করে দেখি গাছের বাম দিকে কালো মতো কি যেন বসলো। পাশেই একটা হলুদ পাখির নড়াচড়া দেখলাম ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে- পোকা খাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ক্লিক করলাম গোটা চারেক।

তিনি আরো বলেন, শফিকুল হক ইমন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভাল পাখি চেনে, তাই তাকে দেখাতেই সে প্রায় চিৎকার করে উঠল, ভাই, এটা তুলেন, এটা সুলতান টিট। আবারো বেশ কিছু ছবি তোলা হল। অন্য সবাইও খুঁজে পেতে চারপাশে ক্যামেরার শাটারে চাপ পড়তে থাকল সমানে।

প্রায় ১৭ সেন্টিমিটার আকৃতির সুলতান তিত পাখির পুরুষের মাথায় সোনালি হলুদ রঙের ঝুটি দেখা যায়। ঠোঁটের উপর থেকে শুরু করে ঘাড় পর্যন্ত এই সোনালি হলুদ পালকের সমারোহ দেখা যায়। মাথা, বুক, পিঠ ও লেজ সবুজাভ কালো। বুকের নিচ থেকে লেজের নিচের দিক পর্যন্ত আবার হলুদ পালকে ঢাকা।

কোনো বিপদের সম্ভাবনা দেখলেই এই পাখির ঝুটি দাঁড়িয়ে যায়। এরা পাহাড়ি এলাকার উঁচু গাছের মাঝারি ও উঁচু শাখায় একাকি বা ছোট দলে চলাফেরা করে। এরা মূলত পোকামাকড় খায়, তবে মাঝে-মধ্যে পাহাড়ি ডুমুরের মতো ছোট ফলও খেতে দেখা যায়। নেপাল, ভুটান, উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি প্রদেশগুলো ছাড়াও মায়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুরেও সুলতান তিত পাখির দেখা মেলে।

পরিবেশকর্মী আল মারুফ রাসেল জানান, এই পাখির বৈশ্বিক বিস্তৃতির মানচিত্র আমাদের দেশ ছুঁয়ে গেছে। পঞ্চগড়ের ওপারেই দার্জিলিং জেলায়, ময়মনসিংহ-সিলেটের উপরে আসাম, মেঘালয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের লাগোয়া মিজোরাম ও মায়ানমারের পার্বত্য জঙ্গলগুলোয় এ পাখির বিস্তৃতি রয়েছে। তাই বাংলাদেশে এ পাখি পাওয়া বিস্ময়কর না হলেও, প্রথমবার পাওয়ায় দলের সবাই বেশ রোমাঞ্চিত।

তিনি আরও জানান, এই জঙ্গলে ইতোমধ্যেই উন্নয়নের দোহাই দিয়ে জঙ্গল সাফ করা হচ্ছে। আশেপাশের এলাকা থেকে প্রায় দুই-আড়াই মাসের প্রস্তুতি নিয়ে কাঠুরেদের দল জঙ্গলে ঢুকছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী রক্ষায় এই পার্বত্য এলাকার জঙ্গলগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি।

আল মারুফ রাসেল আরো বলেন, বাংলায় প্রচলিত কোনো নাম না থাকায় দ্বারস্থ হই পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট পাখি পর্যবেক্ষক কনাদ বৈদ্যের। তিনি জানান, ওপার বাংলার উত্তরাঞ্চলে এই পাখিকে বেশ ভাল সংখ্যায় দেখা যায়, আর এর নাম রাজগাংরা বা স্বর্ণচূড়।

Post A Comment: