ইডেন মহিলা কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী যমুনা ব্যাংক কর্মকর্তা আরিফুন নেছা আরিফা হত্যা মামলার একমাত্র আসামি তার সাবেক স্বামী ফখরুল ইসলাম রবিন আগে থেকেই বখাটে ছিল বলে জানিয়েছেন আরিফার স্কুল ও কলেজজীবনের খুব কাছের বান্ধবী তানজিলা আফরিন।

 

ইডেন মহিলা কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী যমুনা ব্যাংক কর্মকর্তা আরিফুন নেছা আরিফা হত্যা মামলার একমাত্র আসামি তার সাবেক স্বামী ফখরুল ইসলাম রবিন আগে থেকেই বখাটে ছিল বলে জানিয়েছেন আরিফার স্কুল ও কলেজজীবনের খুব কাছের বান্ধবী তানজিলা আফরিন।


তিনি জানান, জামালপুরে স্কুলে পরার সময় রবিনের সঙ্গে আরিফার পরিচয়। তারা সবাই এক এলাকায় বড় হয়েছে। আরিফা পড়তো বালিকা বিদ্যালয়ে আর রবিন পড়তো বালক বিদ্যালয়ে। কিন্তু রবিন সেই সময় থেকে আরিফার পেছন পেছন ঘুরতো। রাস্তার মোড়ে বখাটে ছেলের মতো দাঁড়িয়ে থাকতো। এক পর্যায়ে রবিনের সঙ্গে আরিফার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০১৩ সালে পরিবারের অনুমতি ছাড়াই আরিফা-রবিন বিয়ে করে। তখন রবিন বেকার ছিল।

আরিফার সঙ্গে তানজিলার সর্বশেষ কথা হয় ১৩ মার্চ। আরিফা খুন হওয়ার তিন দিন আগে। সেদিন রাতে আরিফা রাতে ফোন দিয়ে তানজিলাকে বলেন, আমি নতুন মোবাইল কিনেছি, কাল থেকে আবার ফেসবুক ব্যবহার করব।

তানজিলা জানান, আরিফা রবিনকে খুব ভালোবাসতো। কিন্তু রবিন নেশাগ্রস্ত থাকায় বিয়ের পর থেকে তাকে মারধর করত। মারধরের কথা আরিফা ডিভোর্সের পর আমাদের জানিয়েছে। তার আগে আরিফা রবিন সম্পর্কে আমাদের কাছে কোনো মন্তব্য করতো না। ভালোই বলতো।

আরিফা ২০১৬ সালে ডিভোর্স দেয় রবিনকে। বিয়ের পর দুই মাস আরিফা রবিনের সঙ্গে জামালপুর থাকে। কিন্তু রবিনের অত্যাচারে আরিফা আবার ইডেন কলেজের হলে এসে থাকা শুরু করে। এরপর ২০১৫ সালে আরিফা সিটি ব্যাংকে চাকরি নেয়। তারপর রামপুরায় রবিন-আরিফা আবার একসঙ্গে থাকা শুরু করে। সে সময় বাসা ভাড়া থেকে শুরু করে রবিনের যাবতীয় খরচ বহন করতো আরিফা। তারপরেও রবিন আরিফাকে মারতো। সে টাকা না পেলে আরিফার অফিসে গিয়ে গালাগালি করতো- এসব কথা জানান তানজিলা।

আরিফার বড়ভাই আব্দুল্লাহ আল আলামীন জানান, ২০১০ সালে আমাদের বাবা মারা যাওয়ার পর আরিফার সকল খরচ আমি চালাতাম। ওর সব কিছু আমি দেখতাম। ও আমাদের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ছোট, খুব আদরের ছিল। ও পরিবারের সবাইকে না জানিয়ে বিয়ে করলেও আমরা মেনে নিয়েছিলাম। আরিফা খুব চাপা স্বভাবের ছিল। বিয়ের পর ওর ওপর অনেক নির্যাতন করা হয়েছে; কিন্তু ও কাউকে কিছু বলত না। নিজের ভুলের মাশুল নিজেই দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আমরা আগে থেকেই জানতাম রবিন নেশাগ্রস্ত। কিন্তু হঠাৎ বিয়ে করায় ওকে কিছু জানাতে পারিনি।

তিনি জানান, আরিফার সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পরেও রবিন যোগাযোগ করার চেষ্টা করত। আরিফাকে হত্যার হুমকি দিত। গত বছর কলাবাগান থানায় ডায়েরি করে ছিল আরিফা। কিন্তু রবিন নেশাগ্রস্ত থাকায় কোনো কিছু গায়ে লাগাত না। সে নিজের খেয়ালখুশি মতো চলত।

এদিকে, আরিফার সমবয়সী চাচাতো বোন সিরাজুল মনিরা জানান, এ বছর রবিন আরিফাকে একটা ছুরি দিয়েছিল। রবিন ছুরি দিয়ে বলে, ‘এটা তোমার কাছে রাখো, তা না হলে আমি তোমাকে খুন করব।’ সেই ছুরি আরিফা তার অফিসের সহকর্মীদেরও দেখিয়েছিল।

আরিফা আমাদের কাছে বলতো, ‘ও আমাকে খুন করবে বলে সব সময় হুমকি দেয়। ও কি খুন করতে পারবে আমাকে।’ এসব কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রবিনের সকল খরচ আরিফা চালাত। যত দিন তারা একসঙ্গে ছিল, ততদিন তাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত ঝামেলা লেগে থাকত। আরিফা নিজে পছন্দ করে পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করে। তাই কাউকে কিছু বলতে পারত না।

তিনি জানান, আরিফাকে খুন করার ৬ ঘণ্টা আগে রবিন তার ফেসবুকে হত্যার কথা লিখে স্ট্যাটাস দেয়। এরপর খুন করার পরে আরিফা-রবিনের একসঙ্গে তোলা ছবি দিয়ে আবার স্ট্যাটাস দেয়। এরপর রবিন আমার ভাইদের ও আরিফার বান্ধবী তানজিলার নাম উল্লখে করে হুমকি দেয়।

‘আরিফা কাজের প্রতি খুব সিরিয়াস ছিল। একইসঙ্গে সব সহকর্মীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখত, সবাইকে সাহায্য করতো’ কান্না জড়ানো কণ্ঠে এসব কথা বলেন যমুনা ব্যাংকের কর্মকর্তা জাহিদ।

তিনি বলেন, ‘এখানে আমি ছয় মাস হলো কাজ করছি। কিন্তু আরিফার ব্যবহার ছিল আমার বোনের মতো। আমরা অনেকে তার সমস্যার কথা জানতাম। কিন্তু আরিফা চেষ্টা করত রবিনকে সবার কাছে যেন ছোট হতে না হয়।’

‘কিন্তু রবিন ছিল নেশাগ্রস্ত, সে আরিফার ভালোবাসা বুঝতে পারেনি’, বলেন জাহিদ।

এদিকে, মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে আরিফার পরিবার, বন্ধু-বান্ধবী ও কর্মস্থলের সহকর্মীরা আরিফার স্বামী রবিনের ফাঁসি দাবি করেছেন।

Post A Comment: