সিলেটের এক জঙ্গি আস্তানায় সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ আপারেশন শেষ হতে না হতেই এ বার তার পাশের জেলা মৌলভীবাজারের দুটি এলাকায় এক প্রবাসীর বাড়ি ঘিরে অভিযান শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এ দু’টি বাড়ি গতকাল সকালে ঘিরে ফেলার পর পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে জঙ্গিরা বোমা হামলা করেছে, জানায় পুলিশ।
 উৎকণ্ঠা ৩ জঙ্গি ঘাঁটি ঘিরে 

সিলেটের এক জঙ্গি আস্তানায় সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ আপারেশন শেষ হতে না হতেই এ বার তার পাশের জেলা মৌলভীবাজারের দুটি এলাকায় এক প্রবাসীর বাড়ি ঘিরে অভিযান শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এ দু’টি বাড়ি গতকাল সকালে ঘিরে ফেলার পর পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে জঙ্গিরা বোমা হামলা করেছে, জানায় পুলিশ। 


এর মধ্যেই সন্ধ্যায় ত্রিপুরা রাজ্য লাগোয়া বাংলাদেশের কুমিল্লার শহরতলির আরেকটি পাকা বাড়িতেও জঙ্গি আস্তানার খবর পেয়ে বাড়িটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ। কুমিল্লায় সিটি কর্পোরেশনের ভোট হবে আগামীকাল, তাই নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে এ বাড়িটি আপাতত আভিযান না করে, ঘিরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ। আগামীকাল শুক্রবার এ আস্তানায় অভিযান পরিচালনা করা হবে।

এদিকে, মৌলভীবাজারের নাসিরপুর গ্রামের একটি বাড়ি থেকে পুলিশের দিকে থেমে-থেমে গুলি ও বোমা ছোড়ার পর পুলিশের তরফেও পাল্টা গুলি করা হয়। সন্ধ্যায় এ বাড়িতে চূড়ান্ত অভিযান শুরু করার আগে জঙ্গিদের আত্মসর্মপণের শেষ সুযোগ দেওয়া হলেও তারা তাতে রাজি হয়নি। পুলিশ জানায়, শেষ সুযোগ দেওয়ার ১৫ মিনিট পর পুলিশের কমা-ো বাহিনী সোয়াট ও এন্টি টেররিজম ফোর্স ‘অপারেশন হিট ব্যাক’ শুরু করে।
র‌্যাবের কর্মকর্তারা জানান, মৌলভীবাজারের জঙ্গি আস্তানার একটি অবস্থান পৌরসভার বড়হাট এলাকায়। অন্যটি, সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের সরকার বাজারের কাছে ফতেহপুর গ্রামে। দুই ঘাঁটির মধ্যে দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। দু’টি বাড়ির মালিকই লন্ডনপ্রবাসী সাইফুল রহমান। তিনি সপরিবারে লন্ডনে থাকেন। সাইফুলের বাড়ি দু’টি দেখভাল (কেয়ারটেকার) করেন আতিক নামে তার এক আত্মীয়। স্থানীয় জনতাকে নিরাপদ রাখার জন্য এলাকায় মাইকিং করেছে পুলিশ। উৎসুক মানুষের আনাগোনা ও জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় মৌলভীবাজার পৌরসভা ও এর আশেপাশের এলাকায় জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা। বাড়ি দু’টিতে কমপক্ষে ১০ জঙ্গি থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছে পুলিশ। অভিযানের অংশ হিসেবে বড়হাট ও আশপাশের এলাকার গ্যাস পরিষেবা এবং সরকার বাজার এলাকার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। গণমাধ্যম কর্মীদেরও ঘটনাস্থল থেকে দু’ কিলোমিটার দূরে অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ।

এদিকে, একের পর এক জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়ায় দেশজুড়ে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সহেলী ফেরদৌস বলেন, সিলেট, মৌলভীবাজার ও কুমিল্লায় জঙ্গি আস্তানার সন্ধানের প্রেক্ষিতে সারাদেশের পুলিশ কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের অংশ হিসেবে সারাদেশে পুলিশের জঙ্গি বিরোধী অভিযান অব্যাহত আছে ও থাকবে।

জানা যায়, গত মঙ্গলবার গভীর রাত থেকে নাসিরপুরের সরকার বাজার ও শহরের বড়হাট এলাকায় জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে দুটি বাড়ি ঘিরে রাখে পুলিশ, র‌্যাব ও পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। পরে, গতকাল সকাল সাতটা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে দু’টি জঙ্গি আস্তানায় বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যায়। সাড়ে ১১টার দিকে বড়হাটের আস্তানার ভেতরে বিকট শব্দে তিনটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। এরপর অভিযান শুরু করতে বিকেল পাঁচটার দিকে নাসিরপুর গ্রামে এসে পৌঁছায় সোয়াত (সর্বাধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্পেশাল উইপন্স অ্যান্ড ট্যাক্টিকস)। তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছার ঘন্টা দেড়েক পরেই শুরু হয় গোলাগুলি। সেখানে সোয়াট সদস্য ছাড়াও ঢাকার কাউন্টার টেররিজম ইউনিটসহ মৌলভীবাজারের আশপাশের জেলা এবং সিলেট রেঞ্জের বিপুল পরিমাণ পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, বিকাল পৌনে ৫টার দিকে সোয়াট টিমের সদস্যরা নাসিরপুরে পৌঁছান। তারপরেই নাসিরপুরের ওই বাড়ির কাছে সিটি করপোরেশনের গাড়ি, এম্বুলেন্স, মই, জেনারেটরসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে যেতে দেখা গেছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, এই অভিযানের জন্য সোয়াটই ‘যথেষ্ট’ বলে তিনি মনে করছেন। প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হবে।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপ কমিশনার মহিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, সীতাকু- ও সিলেটে জঙ্গি আস্তানার খোঁজ মেলার পর তদন্তে মৌলভীবাজারের এই দুই বাড়ির তথ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “সরকার বাজারের ওই বাড়িটি পুলিশের সদস্যরা ঘিরে ফেলার পর বাড়ির ভিতর থেকে গ্রেনেড ও গুলি ছোড়া হয়। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে।

এদিকে, মৌলভীবাজারের দুটি স্থানে সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানা ঘিরে ফেলার পর কুমিল্লায়ও আরেকটি জঙ্গি আস্তানা ঘিরে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পুলিশ জানিয়েছে, বাড়িটিতে একজন জঙ্গি পাঁচ থেকে ছয়টি শক্তিশালী বোমা ও বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ে অবস্থান করছেন। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির মধ্যেই এই জঙ্গি আস্তানার খবর জানা যায়। পুলিশ জানায়, বিকালে শহরতলির দক্ষিণ বাগমারা সংলগ্ন গন্ধমতি বড় কবরস্থানের পশ্চিম পাশের একটি বাড়িতে সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানার খবর পায় পুলিশ। তিনতলা বাড়িটির নিচতলায় সন্দেহভাজন জঙ্গিদের অবস্থান আছে, এমন তথ্যের ভিত্তিতে বিকেল পাঁচটা থেকে বাড়িটি ঘিরে রাখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দেলোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তি ওই বাড়িটির মালিক।

কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন বলেন, ‘গত মঙ্গলবার রাতে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট এক জঙ্গিকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী কুমিল্লা নগরের দক্ষিণ বাগমারা এলাকার দেলোয়ার হোসেনের বাড়িটি ঘেরাও করে রাখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই বাড়িতে একজন জঙ্গি আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অনুরোধে এই আস্তানাটি ভোটের পর আভিযান করা হবে।

সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ির আতিয়া মহল নামের এক বাড়ি ঘিরে গত ২৩ মার্চ গভীর রাতে একই ভাবে অভিযান শুরু করেছিল পুলিশ। গত মঙ্গলবার রাতে সেনাবাহিনী অভিযান সমাপ্ত ঘোষণার পর ১২ ঘণ্টা পার না হতেই পাশের জেলা মৌলভীবাজারে নতুন অভিযান শুরু হল। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, আতঙ্কিত হওয়ার, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ১৬ কোটি মানুষের দেশে ৫০ জন জঙ্গি থাকতে পারে। পুরো বিশ্বেই এখন জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে। তবে এদের দমন করার ক্ষমতা সরকারের আছে। যে কোনও মূল্যে জঙ্গিদের দমন করতে সরকার বদ্ধপরিকর।

Post A Comment: