৭ জানুয়ারি, ২০১৭। ঢাকা বিমানবন্দরে নেমেই দেখি হুলুস্থুল ব্যাপার। বিমানবন্দরে এটা যে প্রথম দেখলাম তা নয়। আগে অবস্থা আরও খারাপ ছিল। প্লেন থেকে নামার উপায় থাকত না, বিশেষ কিছু কর্মকর্তা প্লেনের গেট থেকে কাউকে রিসিভ করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতেন। কেউ কেউ নামের প্লেকার্ড হাতে।

If-a-line-is-still-not-right-Bangladesh

৭ জানুয়ারি, ২০১৭। ঢাকা বিমানবন্দরে নেমেই দেখি হুলুস্থুল ব্যাপার। বিমানবন্দরে এটা যে প্রথম দেখলাম তা নয়। আগে অবস্থা আর খারাপ ছিল। প্লেন থেকে নামার উপায় থাকত না, বিশেষ কিছু কর্মকর্তা প্লেনের গেট থেকে কাউকে রিসিভ করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতেন। কেউ কেউ নামের প্লেকার্ড হাতে। 


এগুলো সাধারত বিমানবন্দরের যাত্রীদের আগমন হলের সামনে থাকে। কোনো অপরিচিত যাত্রীকে কেউ নিতে আসলে তারা প্লেকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন, যেন যাত্রী তাকে খুঁজে পান। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা নয়। বাংলাদেশের মানুষ প্লেনের গেট পর্যন্ত চলে যান। কারণ তারা দেখাতে চান, তাদের ক্ষমতা আছে। নিরাপত্তা কিংবা অন্য প্রটোকলগুলোকে তারা থোরাই কেয়ার করেন। একটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন এমন হয়, তখন সেই বিমানবন্দর এবং দেশ সম্পর্কে একটা ধারণা তো হয়েই যায়।

তবে এই যন্ত্রণা অনেক কমেছে। এখন প্লেনের গেট পর্যন্ত খুব একটা দেখা যায় না, ভিভিআইপি ছাড়া। তাদেরকে অভ্যর্থনা দেয়ার জন্য প্লেনের দরজা পর্যন্ত না গেলে তারা মাইন্ড করতে পারেন। তাই প্রোটোকল অফিসাররা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকেন। সাধার যাত্রীদেরকেও কার কার দরজা থেকে নিয়ে যাওয়ার বাড়তি আদরের পরিমা বেশ কমেছে। পাশাপাশি বিমানবন্দরের আয়তন অনেকটা বেড়েছে। এখন যাত্রীদের লবি দিয়ে হেঁটে যাওয়ার জায়গাটায় এসে এই মানুষগুলো ভিড় করেছে। তারা এখন দরজা পর্যন্ত যায় না, তবে লবি থেকে পিক করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সিভিল এভিয়েশনের ব্যাজ পরিহিত কর্মকর্তারাই এমন প্লেকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন। আমরা ধারণা, এর বড় একটি অংশ স্মাগলিং-এর সঙ্গে জড়িত। না হলে এমন বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে কেন?

পৃথিবীর বড় বড় অনেক বিমানবন্দর ঘুরেছি। এমন অভ্যর্থনার মুখোমুখি কখনও পড়তে হয়নি, যা বাংলাদেশে ভ্রম করলে হর-হামেশাই পড়তে হয়। অন্য যাত্রীদেরকে যন্ত্রণা না দিয়ে সবাইকে কীভাবে দ্রুত বিমানবন্দর থেকে বের করে দেয়া যায়, সেটাই নিশ্চয় একটি বিমানবন্দরের উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ লম্বা ভ্রমণের পর মানুষকে বাড়তি সময় আটকে রাখার কোনো অর্থ হতে পারে না। এটা নেহায়তই খারাপ ব্যবস্থাপনা। প্লেনের দরজা থেকে মানুষ টানাটানির পরিমাএকটু কমলেও, ইমিগ্রেশন কাউন্টারের অবস্থা সেই আগের মতোই রয়েছে।

বিমানবন্দরের ক্ষমতা যেহেতু বেড়েছে, মানুষ বেড়েছে, তাই প্রতিমুহূর্তেই হয়তো একাধিক উড়োজাহাজ অবতর করছে। একটি উড়োজাহাজে দুই থেকে তিন শতাধিক যাত্রী থাকতে পারে (নির্ভর করে কত বড় উড়োজাহাজ)। তাই একসঙ্গে দুটি উড়োজাহাজের যাত্রীরা চলে এলে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনের মাথা নষ্ট হয়ে যায়। তারা কীভাবে এই পরিমা যাত্রীকে সামাল দেবেন বুঝে উঠতে পারেন না। এবং বিরক্তিকর বিষয়গুলো ঘটতে থাকে এখানেই। বিদেশি যাত্রীরা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও আমাদের দেশের যাত্রীরা লাইনে থাকেন না। আমাদের পুলিশ অফিসাররাও সেটা ম্যানেজ করতে পারেন না এবং ক্ষেত্রবিশেষে তারাই এই অনিয়মটা করেন। তারা বিভিন্ন পরিচিত যাত্রীকে (কিংবা যাদের পরিচিত অফিসার রয়েছেন) আগে বের করে দেয়ার জন্য লাইন ভাঙেন। তারা পাসপোর্ট হাতে নিয়ে এই কাউন্টার থেকে ওই কাউন্টারে দৌড়ঝাঁপ করেন। আগে আসা যাত্রীর মাথার উপর দিয়ে তারা ওই পাসপোর্টগুলো নিয়ে টানাটানি করেন।

বাংলাদেশে বিদেশিদের আসা-যাওয়ার পরিমা বেড়েছে। তাদের জন্য ভিন্ন লাইন করা হয়েছে অনেক দিন থেকেই। এখন হয়তো সেই লাইনের পরিমা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তারপরেও তাদেরকে দাঁড় করিয়ে রেখে, আমাদের অন্যান্য যাত্রীদেরকে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে রেখে একদল অফিসার কেন লাইন ভেঙে অন্যদের পাসপোর্ট নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করেন? যেই যাত্রী চার থেকে চৌদ্দ ঘণ্টা যাত্রা করে এখানে আসতে পেরেছেন, তারা স্বাভাবিকভাবে ইমিগ্রেশন পা হতে পারেন না? আর তারা যদি ভিভিআইপি হন, তাহলে তাদের জন্য আলাদা প্রটোকল রয়েছে। সেটা মানলেই তো হয়। আমরা কেন একটি সুন্দর সুস্থ লাইন মানতে পারি না?

দুই.

এবার বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমি ইমিগ্রেশনের জন্য ফর্ম পূর করব। তখনও লাইনে দাঁড়াইনি। দূরের পিলারের সাথে লাগানো কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ফর্মটি পূর করছি। অমনি একজন যাত্রী এসে বললেন, ‘ভাই আমার এই ফর্মটা একটু পূর করে দিবেন?’

ইমিগ্রেশন ফর্ম পূর করতে তেমন সময় লাগে না। তবে লাইনে যেহেতু দাঁড়াতে হবে, তাই তাড়া থাকে। না হলে অনেক লম্বা সময় ধরে অপেক্ষা করতে হয়। সেই অপেক্ষার খারাপ লাগার চেয়ে অনেক কষ্টের যখন একজন মানুষ এসে বলে, ফর্মটি পূর করে দেবেন। কারণ তার অক্ষর জ্ঞান নেই, কিন্তু তিনি উড়োজাহাজে ভ্রম করেছেন। আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ আছেন যারা প্রবাসে কাজ করতে যান, কিন্তু ফর্ম পূর করতে পারেন না। আমি মাঝে মাঝেই সুযোগ পেলে তাদের ফর্ম পূর করে দেই। হাতে সময় থাকলে কিংবা উড়োজাহাজ ছাড়ার তাড়া না থাকলে, এটা করতে আমার খারাপ লাগে না। আমি একা ছিলাম। তাই তাড়া নেই। মুচকি হেসে ভদ্রলোককে বললাম, ‘একটু অপেক্ষা করুন, আমি আমার ফর্মটা শেষ করে নিই।’

ভদ্রলোক অপেক্ষা করলেন। আমি আমার ফর্মটি পূর করে তাকে বললাম, ‘দিন এবার।’
তিনি আমার হাতে যেটা ধরিয়ে দিলেন, সেটা ইমিগ্রেশন ফর্ম নয়। একটা দুই পৃষ্ঠার বড় বিশেষ ফর্ম, যা তাকে পূর করতে হবে। আমি এর কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তাকে বললাম, ‘এটা কিসের ফর্ম?’

তিনি বললেন, ‘সৌদি থেকে আসছি তো। এইডা ধরায় দিছে।’
আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। আমার মতোই বয়স হবে। আরেকটু বেশিও হতে পারে। চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। পোশাক এলোমেলো। আমি ফর্মটা পড়তে শুরু করলাম। তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন, ‘বেশি কিছু না লেখলেও হবে। এইখানে যা আছে ওইডাই ইংরেজিতে লেইখ্যা দেন।’
তিনি আরেকটি কাগজ আমার হাতে তুলে দিলেন।
আমি তাকে বললাম, ‘ব‌্যাপারটা কী আমাকে খুলে বলেন তো?’
তিনি যা বললেন তার সংক্ষেপ হলো, তিনি সৌদি আরবে থাকতেন। সেই দেশে তার কাজের ভিসা (আকাম) ছিল না। সৌদি সরকার তাকে ধরে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। তার সঙ্গে পাসপোর্ট নেই। ওই ডকুমেন্টটাই ট্রাভেল ডকুমেন্ট। বাংলাদেশে আসার পর সরকার তার কিছু পেপারওয়ার্ক করছে।
বিষয়টি কিছুটা বুঝতে পেরে আমি ফর্মটি পূর করতে শুরু করি। আমাকে পূর করতে দেখে ভদ্রলোককে ঘিরে আর কিছু মানুষ ভিড় করেছেন। আমি সৌদি সরকারের দেয়া ডকুমেন্টটি দেখে দেখে বাংলাদেশ সরকারের দেয়া ফর্মটি পূর করছিলাম। ওখানে বিভিন্ন রকমের প্রশ্ন। কীভাবে বিদেশে গিয়েছিলেন, সেই ট্রাভেল/এজেন্টের নাম ঠিকানা, কোন ভিসায় গিয়েছিলেন, বাংলাদেশে যোগাযোগ ইত্যাদি। একটি ঘরে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, কত দিন জেলে ছিলেন?
আমি একবার ঘরটি বাদ দিয়ে পরের ঘরে চলে গিয়েছিলাম। তারপর হঠাৎ কী মনে করে একটু আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলা, ‘এখানে জেলে থাকার কথা জানতে চাইছে। আপনি কি জেলে ছিলেন?’
তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘হ। আমাগো ধইরা জেলে রাখছিল। আমি ১০ দিন জেলে আছিলাম। এটা লেইখ্যা দেন।’
কথাটা শুনে মুহূর্তেই আমার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বিদেশ বিভুইয়ে আমার দেশের একজন মানুষ কাজ করতে গিয়ে জেল খেটে আবার দেশে ফিরেছেন, এটা ভেবেই ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। আমি কাঁধের ব্যাগটা মাটিতে রেখে পুরো ফর্মটি পূর করে দিয়ে বললাম, ‘এখানে সই করেন।’
আমি কলম এগিয়ে দিলাম। তিনি খুব কষ্ট করে নামের কিছুটা লিখতে পারলেন। 

তার হাত থেকে কলমটা নিতে গিয়ে দেখি চারপাশ আমাকে ঘিরে ধরেছে। সবার হাতেই একই ফর্ম। আমার বুঝতে বাকি থাকল না, এই মানুষগুলো কীভাবে দেশে ফিরে এসেছেন। তাদের অনুরোধ, কেউ তাদের ফর্মটি পূর করে দিচ্ছে না। এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলেন। আমি যদি দয়া করে পূর করে দেই, তাহলে তারা মুক্তি পেতে পারেন।

আমি তাদের মুখের দিকে তাকাই। এলোমেলো উষ্ক-শুষ্ক মানুষগুলো আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম, ‘এই ফর্মটা যারা দিয়েছেন তারা কেউ একটু সাহায্য করছেন না?’
তারা বললেন, ‘নাহ। আমাগো পূর করতে কইছে। এইগুলা কি আমরা বুঝি? আপনি একটু কইরা দ‌্যান। আর কেউ রাজি হইতাছে না।’

আমি খুব কঠিন বিষয়েও নিজেকে শক্ত রাখতে পারি। কিন্তু ছোটখাটো বিষয় আমাকে দুর্বল করে ফেলে। সৌদি ফেরত এই অসহায় মানুষের আকুতি আমাকে দুর্বল করে ফেলল। আমি একের পর এক ফর্ম পূর করতে শুরু করলাম। পাশের টেবিলে আরেকজন মানুষকে দেখলাম এগিয়ে আসতে। সৌদি ফেরত মানুষগুলো তাকেও ঘিরে ধরেছে।

ফর্মগুলো পূর করতে গিয়ে দেখলাম, সৌদি সরকার তাদেরকে ধরে কোনোরকমে কিছু তথ্য দিয়ে ইংরেজিতে সেগুলো হাতে লিখে উড়োজাহাজে তুলে দিয়েছে। কার যেহেতু পাসপোর্ট নেই, তাই সঠিক নাম, জন্ম তারিখ এগুলো নেই। যে যার মতো বলেছে, তারাও লিখে দিয়েছে। অনেকগুলো মানুষের বয়স দেখলাম ৫২। অনেকেই সিলেটের, কেউ বাহ্মবাড়িয়ার, কেউ চট্টগ্রামের, কেউ ফেনীর, কেউ হবিগঞ্জের ইত্যাদি। তারা সবাই জেলে ছিলেন। কেউ ১০ দিন, কেউ ১৩ দিন, কেউ হয়তো আর বেশি। এক সাথে পঞ্চাশের অধিককে দেশে পাঠানো হয়েছে। তাদের মতে, এমন আরও এসেছে এবং আসতে থাকবে। ধরা পড়লেই দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনারা গিয়েছিলেন কীভাবে?’ বেশির ভাগেরই উত্তর হলো, ওমরা করতে গিয়েছিলেন; তারপর থেকে গিয়েছেন। কেউ থেকেছেন ৩ বছর, কেউ ৫ বছর, কেউ আর বেশি। ভদ্রতা করে আর জিজ্ঞেস করতে পারিনি, তারা যেই টাকার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন সেই টাকা তারা আয় করতে পেরেছেন কি না!

আমার লাগেজ বেল্টে ঘুরছে। সঙ্গে আমার মাথাও। আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রবাসে কাজ করতে গিয়েছেন। তারা এই দেশের মানুষ। এই দেশের মাটির ওপর তার পূর্ণ অধিকার আছে। এই দেশের আলো-বাতাসের ওপর তার অধিকার আছে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ে এদের টাকায়, এদের ঘামে ঝরা পরিশ্রমে। কিন্তু এদের এক পৃষ্ঠার একটা ফর্ম পূর করার জন্য কেউ নেই। দূর থেকে দেখে মনে হবে, ভেড়ার পালের মতো এই দিক থেকে ওদিক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছি তাদের। প্রবাসী শ্রমিকদের দেখভাল করার জন্য এদেশে কেউ নেই, কেউ না। 

আমি যখন ইমিগ্রেশন দিয়ে বাইরে হেঁটে আসি, পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি পুরো এলাকাটি এলোমেলো; আর কাউন্টারের পুলিশ অফিসারদের সামনে লম্বা লাইন দাঁড়িয়ে। আর কিছু অফিসার সেই লাইন ভেঙে কার কার পাসপার্ট হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারাই এই দেশের সৌভাগ্যবান নাগরিক। তাদের পরিবার নিশ্চয়ই এই দেশের জমিদার ছিলেন।

তিন.

১৩ জানুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার। আবার যেতে হলো ঢাকা বিমানবন্দরে। ছোট বোন ডালাসে ফেরত যাচ্ছে। তাকে বিদায় দিতে গেলাম। বিশ্ব ইজতেমা শুরু হয়েছে। তাই একটু আগে-ভাগেই গেলাম। এবারে গিয়ে দেখি যাত্রীদের ড্রপ করার বাইরের যে স্থানটুকু আছে সেখানেই এলাহী কাণ্ড।
বিমানবন্দরের বাইরে এমনিতেই মানুষ গিজগিজ করতে থাকে। নিরাপত্তা প্রহরীরা দোতলায় বেশি মানুষ প্রবেশ করতে দেয় না। আগে টিকিট কেটে একদম ভেতরে যাওয়া যেত। এখন নিরাপত্তাজনিত কারণে সেটুকু করা যায় না। সেটা ভালোই হয়েছে। ভেতরে গিয়ে ভিড় করার প্রয়োজনটা কী? কিন্তু এবারে দেখলাম দোতলায় ড্রপ করার জায়গাটাতেই প্রচণ্ড ভিড়। হয়তো অনেকগুলো ফ্লাইট একসঙ্গে যাবে। যাত্রীরা বিশাল লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন। এমনটি ট্রলি পর্যন্ত খঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
টার্মিনাল ১ এবং ২, দুটোতেই প্রচণ্ড ভিড়। গাড়ি থেকে লাগেজ নামিয়ে একটা লাইনে দাঁড়ালাম। ধীর গতির লাইন। নিরাপত্তা বলয় পার হয়ে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছেন যাত্রীরা। যাত্রীদের বাইরে আর কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। খুবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু মুহূর্তেই খেয়াল করলাম, কিছু মানুষ সেই লাইনের তোয়াক্কা করছেন না। তারা গাড়ি থেকে নেমে বিভিন্ন উপায়ে, একে ধরে, তাকে বলে লাইনের সামনে ঢুকে যাচ্ছে, না হলে দরজা দিয়ে ভেতরেই চলে যাচ্ছে।

খুবই বিরক্তিকর একটি বিষয়। বিমানবন্দর হলো এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্থান। বাস স্ট্যান্ড, ট্রেন স্টেশন, কনসার্ট ইত্যাদি স্থানে মানুষ লাইন দিয়ে কাজ করে। কিন্তু বিমানবন্দরে মানুষ তার চেয়েও বেশি সুশৃংখল থাকে, লাইন দিয়ে চলে, নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু ঢাকা বিমানবন্দরে সেটাও হওয়ার উপায় নেই। এই বিমানবন্দরে একটি ভিআইপি টার্মিনাল আছে। তারা ওইদিক দিয়ে যাতায়ত করেন। সেখানে লাইনের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু সাধার মানুষের জন্য যে সেবা, সেখানে যারা লাইনে দাঁড়ান তাদেরকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একটা বড় অংকের মানুষ বেলাইনে চলে যান।

আমি খুব খেয়াল করে দেখলাম, সাধার যে যাত্রীটি দুবাই যাবে একজন শ্রমিক, যিনি কিন্তু লাইন ভাছেন না। লাইনটি ভাছেন যিনি বিশাল একটি গাড়িতে এসেছেন, কিংবা বিশাল কোনো পদ দখল করে আছেন। ছোট বোনকে সেই গেট পর্যন্ত দিয়ে বাইরে আরেকটু অপেক্ষা করলাম। এই সার্কাসটুকু দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লাইন ভাঙার পদ্ধতি দেখছি। আমার সামনেই একজন এসে বললেন, ‘ভাই পলিটিকাল পিপল। একটু ঢুকায় দেন।
আমাকে কেউ বলতে পারেন, এই কথাটার মানে কী? পলিটিকাল পিপল, তাই তাদেরকে লাইন ভেঙে দরজার চিপা দিয়ে ঢুকিয়ে দিতে হবে। তারা অন্য যাত্রীদের মতো ঢুকতে পারবেন না। আর কিছু মানুষকে দেখলাম, পুলিশের সঙ্গে কী কী সব আলাপ করে, পাশ দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষের লোকজন চিপা দিয়ে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু দরজার সামনেই বিশাল বিশাল অস্ত্রসহ দাঁড়িয়ে আছে নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনী। পরিস্থিতি দেখতে দেখতে এতই বিরক্তি লাগছিল যে, নিরাপত্তার থাকা অনেকগুলো মানুষের ভেতর একজনকে বললাম, ‘ভাই আপনার এই ভারি অস্ত্রটার কাজ কী?’

তিনি আমার প্রশ্নে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, ‘কী বলতে চান আপনি?’
আমি বিরক্তি নিয়ে বললাম, ‘একটা লাইন ম্যানেজ করতে পারেন না, আর এইটা (মনে মনে চুল সংক্রান্ত একটা গালি হবে) নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কী?’
তিনি বিষয়টা বুঝতে পারলেন। হঠাৎ করেই লাইন ঠিক করতে একটু পর হলেন।
আমরা যখন বিমানবন্দরে লাইন সামলাতে পারি না, তখন আর কোথায় পারি?

চার.

বাঙালিরা লাইন মানে না কেন?
এর সবচে’ বড় কারটি হলো অশ্রদ্ধা। আপনি অন্য মানুষকে সন্মান করতে শেখেননি। আপনার কাছে মনে হয়েছে, অন্য আর যে মানুষগুলো লাইনে দাঁড়িয়ে সময় কাটাচ্ছে, আপনি তাদেরকে মুরগির চেয়ে অধম মনে করছেন। আপনি নিজেকে অনেক বেশি রাজা মনে করছেন, জমিদার মনে করছেন। অন্যকে আপনি মানুষই মনে করছেন না। এই চরম অশ্রদ্ধা থেকে এই প্রবণতা তৈরি হয়।

এই জাতি কোথাও লাইন মানে না। এর অর্থ হলো, আমরা সুশৃংখল জাতি নই। আজকাল মাঝে মাঝে বাসের জন্য লাইন দেখা যায়। কিন্তু লাইন তো সর্বত্র হওয়ার কথা। যেখানেই আপনি সেবা নিতে যাবেন, সেখানেই আপনাকে একটা লাইনে এসে সেবাটি শৃংখলার সঙ্গে নেয়ার কথা। আমরা সেটা করি না। আমরা প্রথমেই ভাবতে থাকি, কীভাবে লাইনটি ডিঙিয়ে কত দ্রুত অন্যকে বাই-পাস করে সেবাটি নিয়ে নেয়া যায়। এটাই হলো আমাদের জন্য স্মার্টনেসের সংজ্ঞা।

এবং আমরা যে শ্রদ্ধাবোধ শিখিনি, সেটা তো আমাদের নিত্যদিনের কাজকর্ম দেখলেই বুঝা যায়। মিডিয়াতে, টিভিতে প্রতিনিয়ত আমরা সেগুলো দেখছি, রাস্তায় দেখছি, স্কুলে দেখছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখছি, সর্বত্র একই চিত্র। একটি দেশের মানুষ যখন লাইন মানছে না, এটুকু ছোট বিষয়ই দেশটি সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়। সেই দেশের মানুষের মানসিকতা সম্পর্কে বলে দেয়। অন্যকে সন্মান প্রদর্শনে তার এটিচিউড কী, সেটা বলে দেয়। আর যেখানে মানুষ একে অপরকে সন্মান করে না, সেখানে জীবন-যাপন কেমন হতে পারে?

হে বাংলাদেশ, গত ৪৫ বছরে তুমি আমাদেরকে একটা লাইন উপহার দিতে পারোনি, তাহলে আগামী ৪৫ বছরে তুমি কী দিবে?

Post A Comment: