বান্দরবানের রেমাক্রিতে একটা বাদুরগুহা আছে, শুধু এইটুকুই জানতাম। ঘটনাক্রমে বাদুরগুহা দেখতে যাবার পরিকল্পনা করে যখন তথ্য যোগাড় করার চেষ্টা করলাম, তখন দেখি কেউ তেমন কোনো তথ্য দিতে পারেন না। যারা বাদুরগুহা গিয়েছেন বা এর সম্পর্কে জানেন, তারাও কোনো তথ্য দিচ্ছিলেন না। তাই আরও জেদ হয়েছিল যে বাদুরগুহাতে যেতেই হবে।

 Baduraguhara-way

বান্দরবানের রেমাক্রিতে একটা বাদুরগুহা আছে, শুধু এইটুকুই জানতাম। ঘটনাক্রমে বাদুরগুহা দেখতে যাবার পরিকল্পনা করে যখন তথ্য যোগাড় করার চেষ্টা করলাম, তখন দেখি কেউ তেমন কোনো তথ্য দিতে পারেন না। যারা বাদুরগুহা গিয়েছেন বা এর সম্পর্কে জানেন, তারাও কোনো তথ্য দিচ্ছিলেন না। তাই আরও জেদ হয়েছিল যে বাদুরগুহাতে যেতেই হবে। 


নাফাখুম ঝর্ণায় যাবার জন্য যে গাইড থানছি থেকে ঠিক করা হয়েছিল, তিনিও বাদুরগুহার রাস্তা চিনেন না। কিন্তু তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে, রেমাক্রি থেকে এমন কাউকে সঙ্গে নিবেন যিনি বাদুরগুহা চিনেন। কাজেই এক মেঘলা সকালে আমরা ১৫ জন রওনা হলাম বাদুরগুহার পথে।

প্রথমে সাঙ্গু নদীর পাড় ঘেঁষে কিছুদুর যাবার পরে বামদিকের উঁচু একটা টিলা বেয়ে কিছুক্ষণ উঠলে একটা নাম না-জানা পাড়ায় গিয়ে পৌঁছলাম। সেখানে কিছু সময় কাটালাম পাহাড়িদের সঙ্গে। তাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, এ বছর আমরাই দ্বিতীয় দল যারা বাদুরগুহা যাচ্ছি। পাড়াটা অতিক্রম করে বন আর পাহাড়ের মাঝ দিয়ে শুরু হলো আমাদের পথ চলা। সারি বেঁধে সবাই চলছি। যত সামনে যাচ্ছি ট্রেইল আরও সরু ও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। একদিকে সরু ট্রেইল আর অন্যদিকে গভীর খাদ। পা পিছলে পড়লে আর রক্ষা নাই। ট্রেইলটাকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলতেই মনে হয় শুরু হলো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। একটা জায়গায় রাস্তা এত বিপজ্জনক ছিল যে, সেখানে প্রথম বারের মতো গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে পার হলাম সবাই।

Baduraguhara-way
গাছের সঙ্গে দড়ি এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

চলতে চলতে অবশেষে একটা ঝিরির দেখা পেলাম। সেখানে কিছুক্ষণ বিরতির পর ঝিরি দিয়ে আবার পথ চলা শুরু হলো। ভয়ঙ্কর সেই পথের সৌন্দর্য! বৃষ্টি ছিল তাই সেই সৌন্দর্যের ছিটেফোঁটাও ক্যামেরায় বন্দি করা সম্ভব হয়নি।

ওই দিন ডিসেম্বরের ১৮ তারিখ ছিল। এই সময়ে সাধারণত বৃষ্টি হয় না। কিন্তু সেদিনের বৃষ্টি এক অন্য মাত্রা যোগ করেছিল আমাদের অভিযাত্রায়। পিছনে যারা ছিল তাদের খুবই অসুবিধা হচ্ছিল পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া ট্রেইলে পথ চলতে। ঝিরি পার হয়ে পাহাড় বেয়ে বেশখানিকটা যাবার পর যখন বাদুরগুহার কাছাকাছি গেছি, তখন আমাদের রেমাক্রির গাইড জানালেন সামনে রাস্তা আরও খারাপ।

পা পিছলে গেলেই আর রক্ষা নেই। 

এ কথা শুনে আমাদের দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ঠিক করল, সে আর সামনে যাবে না। তার সঙ্গে আরও দুইজন জুটে গেল, যারা আর সামনে যেতে চায় না। এখন এইরকম গহীন একটা জায়গায় ওদের রেখে যাওয়া ঠিক হবে না মনে করে আমাদের থানচি’র গাইডকে বললাম, ওদের সঙ্গে থেকে যেতে। গাইড মহাখুশি, কারণ তিনিও আর সামনে যেতে চাইছিলেন না।

বৃষ্টিতে ভিজবে না এমন একটা জায়গায় ওদের রেখে আমরা আবার সামনে এগিয়ে গেলাম। রাস্তা সত্যি খুব খারাপ ছিল। আরও দুই জায়গা দড়ি বেঁধে পার হলাম। একটা পর্যায়ে আমাদের রেমাক্রি থেকে নেওয়া গাইডও জানালেন, তিনিও আর সামনে যাবেন না, তার জীবনের মায়া আছে, আমরা যেতে চাইলে যেতে পারি, আর ১৫ মিনিটের মতো ওই ট্রেইল ধরে গেলেই বাদুরগুহা পাব।

অনেক ভাবনা চিন্তার ঝড় চলছিল মাথায়, সামনে যাব কি যাব না। এত দূর থেকে এসেছি, আর কখনও হয়ত আসব না। এত দূর এসে ফিরে যাব! এভাবে হেরে ফিরে যাব! কাজেই নতুন উদ্যমে আবার শুরু করলাম সামনে হাঁটা। বৃষ্টি এক ফোঁটাও ছাড় দেয়নি আমাদের। বৃষ্টিতে আমার চশমা ভিজে যাচ্ছে, ঠিক মতো দেখতে পাচ্ছি না। শীতে কাঁপছি আর সামনে যাচ্ছি।

অবশেষে পৌঁছলাম সেই বাদুরগুহাতে। এমন আহামরি কিছুই না। কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর ট্রেইল, সেই ঝিরি পথ আর বৃষ্টি এমন একটা মাত্রা যোগ করেছিল আমাদের অভিযাত্রায়, যেটা সারা জীবন রোমাঞ্চকর স্মৃতি হয়ে থাকবে, উৎসাহ দিবে আরও ভয়ঙ্কর অভিযাত্রার!

Post A Comment: