মূল্য সংযোজন কর (মূসক) কমানোর দাবিতে ব্যবসায়ী ঐক্য ফোরামের ডাকে গতকাল বুধবার রাজধানীতে সকাল-সন্ধ্যা কর্মবিরতি পালন করেছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। এ কারণে গতকাল পুরান ঢাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ব্যবসাকেন্দ্র, মার্কেট ও শপিং মলের দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল।



মূল্য সংযোজন কর (মূসক) কমানোর দাবিতে ব্যবসায়ী ঐক্য ফোরামের ডাকে গতকাল বুধবার রাজধানীতে সকাল-সন্ধ্যা কর্মবিরতি পালন করেছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। এ কারণে গতকাল পুরান ঢাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ব্যবসাকেন্দ্র, মার্কেট ও শপিং মলের দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল।


কর্মবিরতি কর্মসূচি শেষে ব্যবসায়ী ঐক্য ফোরাম এক বিজ্ঞপ্তিতে পাঁচটি দাবি তুলে ধরে ২০ নভেম্বরের মধ্যে তা পূরণে অর্থমন্ত্রীকে বিশেষ আহ্বান জানায়। নইলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে। তবে ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবু মোতালেব প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি এবং প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালনের কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তা করছেন।


চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার আগে থেকেই মূসক-সংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। তাঁদের উদ্যোগে ব্যবসায়ী ঐক্য ফোরাম গঠিত হয়েছে। গত রোববার বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশে ফোরাম গতকালের কর্মবিরতি কর্মসূচি দেয়।


সকালে পুরান ঢাকার চকবাজার, মৌলভীবাজার, নবাবপুর রোডসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দোকানপাট পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এসব এলাকায় কর্মবিরতির সমর্থনে বিভিন্ন পণ্য ও এলাকাভিত্তিক ব্যবসায়ী সংগঠনের ব্যানার দেখা গেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় মিছিল করেছেন ব্যবসায়ীরা। এ সময় প্যাকেজ মূসক বহাল রাখার পক্ষে স্লোগান দেওয়া হয়।


রাজধানীর গাউছিয়া, এলিফ্যান্ট রোড, মিরপুর রোড, মিরপুর ও গুলশান এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সেসব এলাকায় বিভিন্ন শপিং মল ও মার্কেট বন্ধ ছিল। ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতি জানিয়েছে, তাদের ডাকে নগরের সব দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল।


ব্যবসায়ী ঐক্য ফোরামের নেতারা গতকাল পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন। দুপুরে চকবাজারে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ফোরামের নেতা আবু মোতালেব। এ সময় ফোরামের সভাপতি আবদুস সালাম, সহসভাপতি আলাউদ্দিন মালিকসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন মার্কেট ও পণ্যভিত্তিক ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।


আবু মোতালেব বলেন, প্যাকেজ মূসক ব্যবস্থা ২০১২ সালের মূসক আইনে অন্তর্ভুক্ত করে আইনটি কার্যকর করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্যাকেজ মূসকের পরিমাণ ২০ শতাংশ বা তার চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে দিতেও রাজি ব্যবসায়ীরা।


কর্মবিরতিতে অংশ নিয়ে মহানগর দোকান মালিক সমিতি গতকাল তাদের এলিফ্যান্ট রোডের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে। সেখানে সমিতির সভাপতি তৌফিক এহেসান বলেন, ‘এ কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমরা চাই মূসক-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা হোক এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে যৌক্তিক হারে মূসক নির্ধারণ করা হোক।’


কর্মবিরতির মধ্যেও নিউমার্কেট, রাপা প্লাজা, বসুন্ধরা সিটিসহ কিছু কিছু মার্কেট খোলা ছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৌফিক এহেসান বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বার্তা পাঠাতে দেরি হয়েছে বলে মার্কেটগুলো খোলা ছিল। তবে সবাই মূসক-সংক্রান্ত দাবির পক্ষে আছে।


সাধারণ ব্যবসায়ীরা চান, মূসক ধীরে ধীরে বাড়ুক: পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাধারণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা চান, মূসকের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ুক এবং তা যেন সবার ক্ষেত্রে সমান না হয়।


উর্দু রোডের এ কে প্লাস্টিকের দোকানের মালিক আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, একটি মার্কেটের সব ব্যবসায়ী সব সময় লাভ করতে পারেন না। তাঁদের পক্ষে হিসাব রাখা, সে অনুযায়ী মূসক দেওয়া সম্ভব নয়। সবাই মূসক দিতে চায়, তবে ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে। যা সবার জন্য সহনশীল হবে। তিনি বলেন, ‘এক লাফে দ্বিগুণ করে দিলে আমরা অনেকেই সেই চাপ সইতে পারব না।’


চকবাজারের হাজি মনা প্লাস্টিকের মালিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, যাদের বড় দোকান তারাও ২৮ হাজার টাকা মূসক দেবে, ছোট দোকানও একই হারে দেবে, এটা হয় না। মূসক আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী সমিতিকে সঙ্গে নিলে ভালো হয়। কারণ, সমিতি জানে, কোন দোকান কত ভালো ব্যবসা করছে।


প্লাস্টিকের পাদুকা ও হাওয়াই চপ্পল উৎপাদক মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ফেলে দেওয়া বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্য থেকে হাওয়াই চপ্পল তৈরি করি। আমাদের পক্ষে কি মূসকের রেয়াত নেওয়া সম্ভব?’


পাঁচটি দাবি: বিজ্ঞপ্তিতে ফোরাম যে পাঁচটি দাবি জানিয়েছে, তা হলো ২০ শতাংশ বাড়িয়ে প্যাকেজ মূসক আইনে অন্তর্ভুক্ত করা, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনে ৩ শতাংশ হারে লেনদেন কর আরোপ, উপকরণ কর রেয়াত নিতে অসমর্থ প্রতিষ্ঠানের পণ্যের সরবরাহ মূল্যের ওপর ৪ শতাংশ হারে মূসক পরিশোধের বিধান করা, ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার (ইসিআর) অথবা পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) ব্যবস্থায় পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে ২ শতাংশ হারে লেনদেন কর পরিশোধের বিধান করা এবং হাতে তৈরি প্রতি কেজি ১০০ টাকা মূল্য পর্যন্ত রুটি-বিস্কুট এবং প্রতি জোড়া ১২০ টাকা মূল্যমান পর্যন্ত প্লাস্টিকের পাদুকা ও হাওয়াই চপ্পলকে মূসক অব্যাহতি দেওয়া।


চলতি বছরের বাজেট ঘোষণার সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নতুন মূসক আইনের বাস্তবায়ন এক বছর পিছিয়ে দিলেও সর্বনিম্ন প্যাকেজ মূসকের পরিমাণ ঢাকায় ১৪ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২৮ হাজার টাকা করেন।

Post A Comment: