প্রায় দেড় শ পাখির একটি ঝাঁক নদীর জলের উপরিভাগে লম্বা ঠোঁট ঢুকিয়ে দিয়ে এক সারিতে এগিয়ে চলে সামনের দিকে। লম্বা পাখা দুখানা যেমন মেলে রাখে ওপরের দিকে, তেমনি শিল্পিত-নান্দনিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে দেয় চারপাশে। ওপরের ঠোঁটটি ছোট এই পাখিগুলোর, নিচের ঠোঁটটি বড়। ওই নিচের ঠোঁটটি জলের তলায় ঢুকিয়ে দিয়েই ওরা এগোয় সরলরেখায়। কোনো মাছ নিচের ঠোঁটের নাগালে পড়লেই ওপরের ঠোঁটটি সাঁড়াশির মতো চেপে ধরবে শিকার। মাছই এদের প্রধান খাদ্য। স্বভাবে চঞ্চল, চতুর ও প্রখর দৃষ্টিসম্পন্ন এই পাখিরা দেখতেও খুব সুন্দর। অনেকটাই ছুরির মতো ধারালো ঠোঁটের রং লালচে-কমলা, গোড়াটা অবশ্য আলতা-লাল। পা সিঁদুরে লাল। মেয়ে–পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম। তবে মেয়েটি কিঞ্চিৎ ছোট। নদীর পাড়ের কাছে, চরে বা নদীর মোহনার কাছাকাছির মাটির ওপরে বাসা বানায় এরা। ডিম পাড়ে তিন–চারটি।


মেয়েপাখিটি একাই তা দেয় ডিমে, পুরুষটি বাসার সীমানা পাহারা দেয় ও সময়মতো বাসার ডিম উল্টেপাল্টে দেয়। এরা চরের মাটিতে অন্য পাখিদের সঙ্গেও মিলেমিশে বাসা করে। তাতে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে ডিম ও ছানা শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করা সহজ হয়।

স্বাধীনতার আগে এই পাখিদের সারা দেশের বড় বড় নদীতে দেখা যেত, এখন তারা কোণঠাসা। বড় বড় নদীর মোহনা অঞ্চলের চরে ও তার আশপাশ এলাকায় দেখা যায়। বাংলাদেশে এরা বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত, আন্তর্জাতিকভাবে বিপদাপন্ন প্রজাতি।

এই বিপন্ন প্রজাতিরই বেশ কিছু পাখির দেখা মিলেছে সম্প্রতি উত্তরবঙ্গের একটি চরে। তরুণ পাখি আলোকচিত্রী আদনান আজাদ সেগুলোর ছবিও তুলেছেন। গত ১১ মে তিনি ওই চরে গিয়ে বিপন্ন এই পাখির দেখা পান। চরে বাসা আছে বালিবাবুই, খুদে গাংচিল ও নদীটিটি পাখির। ওদের ভেতরেই আছে বিপন্ন এই পাখিদের বাসা। আদনান এটা বুঝেছেন পাখিগুলোর আচরণ দেখে। বাসা যে আছে, তা পাখিগুলোর আক্রমণের ভঙ্গিই তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছে। হ্যাঁ, পাখিগুলো সেই চরে বাসা বেঁধে ডিম পেড়ে তা দিচ্ছে (১৯.০৫.২০১৬)।

পাখিটির একাধিক নাম: পানিকাটা, জলখোর ও পানিচরা। ইংরেজি নাম Indian Skimmer. বৈজ্ঞানিক নাম Rynchops albicollis। শরীরের দৈর্ঘ্য ৪০ সেন্টিমিটার। তীক্ষ্ণ ধারালো ঠোঁটের এই পাখিরা এখন কোণঠাসা হয়ে আছে ভোলা-নোয়াখালীর চর-দ্বীপাঞ্চলে। ১৯৭৫ ও ১৯৮৯ সালে আমি হাতিয়া ও সন্দ্বীপে এদের অনেক বড় ঝাঁক দেখেছিলাম। বরিশালের বিশখালী নদীতে ১৯৯১ সালে দেখেছিলাম ২৩–২৪টি পাখি।

নীলপদ্ম নিয়ে বিভ্রান্তি

২৭ মে প্রথম আলোয় ‘মান্নানের সবুজের রাজ্যে নীলপদ্ম’ শিরোনামে প্রকাশিত লেখায় বর্ণিত নীলপদ্ম নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। প্রকৃত অর্থে নীল শাপলাকেই অনেকে নীলপদ্ম মনে করেন। কোনো উদ্ভিদবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরান ও বাংলাসাহিত্যে বহুল উল্লিখিত নীলপদ্মের কোনো অস্তিত্ব নেই। নীল শাপলার বৈজ্ঞানিক নাম nymphaea nouchalli। অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত। 

Post A Comment: