রোজা যদিও শরীরবৃত্তীয় বা শারীরিক একটি আমল বা কর্ম, যা বাহ্যত ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার ও রতিক্রিয়া থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে সম্পাদন করা হয়ে থকে। কিন্তু আবেদনের দিক থেকে এটি মনোজাগতিক ও আর্থসামাজিক ইবাদত বটে। ইসলামের পরিভাষায় বাহ্যিক আমলকে শরিয়ত ও অভ্যন্তরীণ আমলকে তরিকত বলা হয়। শরিয়তের রোজা হলো: নির্দিষ্ট সময় খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ পরিহার করা ও যৌনকর্ম থেকে সংযত থাকা। তরিকতের রোজা হলো: শারীরিক ও মানসিক চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি অর্জন করা। শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সংযত করা। হাত দ্বারা হারাম ও অন্যায় কিছু না ধরা ও না করা; পা দ্বারা অন্যায় ও অবৈধ পথে না যাওয়া ও না চলা; চোখ দ্বারা হারাম ও নিষিদ্ধ জিনিস না দেখা। কান দ্বারা পাপ কথা, গিবত না শোনা। মুখ দ্বারা অন্যায় কথা, হারাম শব্দ ও বাক্য না বলা। মিথ্যা অপবাদ, পরনিন্দা, পরচর্চা, পশ্চাতে সমালোচনা না করা; নাসিকা দ্বারা হারাম ঘ্রাণ না নেওয়া; জিহ্বা দ্বারা নিষিদ্ধ আস্বাদন না করা। সর্বোপরি মনে হারাম ও অন্যায় অপরাধ চিন্তা স্থান না দেওয়া। দেহ ও মনকে সব ধরনের অন্যায় আচরণ থেকে পবিত্র রাখার নাম হলো প্রকৃত রোজা, এটাই হলো পবিত্র রমজানের অন্তর্নিহিত শিক্ষা।

সৌভ্রাতৃত্বের রমজান

আদম সন্তান একই মায়ের সন্তান। সব মুসলমান ভাই ভাই। রমজানের শিক্ষাও তা-ই। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি রমজানে তার ভাইয়ের কাজের ভার কমিয়ে দিল; মহান আল্লাহ তায়ালা তার গুনাহের ভার কমিয়ে দেবেন, তাকে ক্ষমা করে দেবেন (বায়হাকি)। তাই আমাদের উচিত পবিত্র রমজানের সম্মানে আমাদের অধীন কর্মচারীদের কাজের বোঝা কমিয়ে দিয়ে তাকে তার ইবাদত–বন্দেগিতে সহযোগিতা করা। অনুরূপভাবে সম্ভব হলে রমজান মাসে তার পারিশ্রমিক বাড়িয়ে দেওয়া; ঈদ বোনাসের ব্যবস্থা করা; প্রয়োজন অনুপাতে ছুটি দেওয়া। ছুটিতে যাওয়ার সময় অতিরিক্ত কিছু হাতখরচ দেওয়া।
পবিত্র রমজান শেষে ঈদ আসে আনন্দের সওগাত নিয়ে, এর জন্য চাই আর্থিক ও মানসিক প্রস্তুতি। একজন নিম্ন আয়ের মানুষ ঈদের
যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেন না। তাই কর্তৃপক্ষ ও ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের দায়িত্ব হলো এসব অধীন নিম্ন আয়ের লোকজনের পরিবারের জন্য কিছু উপহারসামগ্রী দেওয়া। তাদের মা-বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের জন্য জামাকাপড় এবং ঈদের দিনের বিশেষ আয়োজনের জন্য কিছু খরচখরচা প্রদান করা।
পবিত্র রমজানের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানবতার উৎকর্ষ ও বিকাশ সাধন করা। মানবতার উৎকর্ষের চূড়ান্ত পর্যায় হলো সাম্য, মৈত্রী, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা। সাম্য ও মৈত্রীর মানদণ্ড হলো ভ্রাতৃত্ব। তাই পবিত্র রমজানের রোজা পালন, ইবাদত ও দান-খয়রাতের মাধ্যমে সমাজে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই আসল উদ্দেশ্য। যেখানে ছোটদের প্রতি বড়দের উপেক্ষা, উপহাস ও ঘৃণা থাকবে না। বড়দের প্রতি ছোটদের বিরাগ-বিদ্বেষ ও হিংসা থাকবে না। থাকবে না কোনো মনোমালিন্য ও পরশ্রীকাতরতা।
দেহকে পাপ ও পাপের আকর্ষণ থেকে মুক্ত করা; মনকে অন্যায় বিশ্বাস, অন্যায্য চিন্তা ও অপরাধকল্পনা থেকে মুক্ত করা রোজার শিক্ষা; যার মাধ্যমে মানবসমাজ নেতিবাচক প্রবণতা থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্র বিশ্বাস, ইতিবাচক চিন্তা ও মঙ্গলকর্মে ব্যাপৃত হতে পারে।

রমজানের মাসআলা

ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদে শিক্ষা গ্রহণ করা ও শিক্ষা প্রদান করা জায়েজ আছে। তবে সে শিক্ষা হতে হবে প্রয়োজনীয়, বৈধ ও উপকারী। মসজিদে শিক্ষা প্রদান করে এর জন্য বিনিময় গ্রহণ করা জায়েজ হবে না। তবে দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা ফোরকানিয়া মক্তব, হিফজখানা বা হাফিজিয়া মাদ্রাসা অথবা কোনো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ইতিকাফে থাকা অবস্থায় তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন; এ জন্য তাঁর বেতন কর্তন করতে হবে না। কারণ, এটি তাঁর ইলমি খেদমত হিসেবে গণ্য।
ইতিকাফ অবস্থায় ইতিকাফকারী প্রাকৃতিক প্রয়োজনে (প্রস্রাব ও পায়খানা) এবং খাবার আনার লোক না থাকলে খাবার আনার জন্য বা খাবার খেয়ে আসার জন্য মসজিদের বাইরে যেতে পারবেন এবং দ্রুততম সময়ে প্রয়োজন শেষ করে ফিরে আসবেন। তবে মসজিদের বাইরে কারও সঙ্গে কথাবার্তা বা সালাম বিনিময় করতে পারবেন না; প্রয়োজনে তা ইশারা-ইঙ্গিতে সারতে হবে। (আল ফিকহুল ইসলামি)।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্‌ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।

Post A Comment: