মিরপুর ছয় নম্বর সেকশনের সি ব্লকের নয় নম্বর রোডের এক নম্বর বাড়ি। দুই পাশে রাস্তা। আর দুই পাশে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট। ওই বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছিলেন প্রকৌশলী মিতা ও তার চিকিৎসক বোন রীতা। এখন আর ওই বাড়িতে থাকে না তারা। জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পরিত্যক্ত পড়ে আছে কোটি টাকার বাড়িটি।


২০০৫ সালে যখন ওই বাড়ি থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়, তখন তারা মানসিক রোগী। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর দীর্ঘদিন দুই বোন একাকী সেখানে বাস করেন। কারও সঙ্গে যোগোযোগ করা এমনকি কথাও বলতেন না।  পাশের দোকান থেকে কখনো কখনো কলা-রুটি নিয়ে খেয়ে জীবন ধারণ করতেন।

রীতা-মিতা তখন দাবি করতেন, তাদের সঙ্গে আল্লার যোগাযোগ হয়। তারা এ বাড়ি ছাড়লে তাদের অন্য বোন সেটি দখল করে নেবে। তাদের আচরণ-চলাফেরায় তখন  মিরপুরের ওই বাড়িটি নাম পায় ‘ভূতের বাড়ি’।

সেই বাড়ি এখন জঙ্গলময়। শত শত বেজির আস্তানা সেটি। 

রীতা-মিতার বাড়ির আশপাশের দোকানদাররা কেউ বলেন তারা এখন তাদের বড় বোন কামরুন নাহার হেনার সঙ্গে ধানমন্ডির একটি বাড়িতে থাকেন। তবে ওই বাসার খোঁজ মিরপুরের কেউ জানে না। কেউ বলেন তারা বিদেশ চলে গেছেন।

রীতা-মিতাদের বাড়ির দক্ষিণ কোণে আসবাবপত্রের দোকান উডল্যান্ড ডোর অ্যান্ড ফার্নিচার। ঘরের মালিক রীতা-মিতারা। বড় বোন কামরুন নাহার হেনা প্রতিমাসে এসে ভাড়া তুলে নিয়ে যান।

ওই দোকানের নয়ন নামের একজন কর্মচারী বলেন, “তাদের ব্যাপারে কোনো তথ্য দেওয়া নিষেধ আছে। হেনা আপা ভাড়া নিতে এসে আমাদের বলে গেছেন, যদি কোনো মিডিয়া আমাদের কাছে যায় তাহলে তোদের বিপদ আছে”

ওই ফর্নিচারের দোকানের মালিক মাহবুবুল ইসলাম পনু এখন অস্ট্রেলিয়ায়। নয়ন আর আবুল হোসেন দোকানের আয়-ব্যয় মালিকের মায়ের কাছে দেন। তিনি প্রতিমাসে কামরুন নাহার হেনাকে ভাড়া দিয়ে থাকেন।

রীতা-মিতাদের বাড়ির সামনের রাস্তার উপরে রয়েছে কয়েকটি টং-দোকান।  তাদের বাড়িতে প্রবেশের পথ বন্ধ করে বসেছে আরেকটি দোকান। একটি দোকানের মালিক সোলায়মান মিয়ার কাছে রীতা-মিতার খোঁজ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কয়েক দিন আগেও একটি টেলিভিশনের কয়েকজন সাংবাদিক এসেছিলেন। তারাও ছবি তুলে নিয়ে গেছেন। কিন্তু রীতা-মিতা সম্পর্কে কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই।”

রীতা-মিতাদের বাড়ির পেছনের নয় নম্বর রোডের তিন নম্বর বাড়িটি একটি বহুতল বিশিষ্ট অ্যাপার্টমেন্ট। এর ম্যানেজার মো. মামুন শিকদার বলেন, “ভাই, রীতা-মিতার কথা আমি শুনেছি। কিন্তু তারা এখন আর এখানে থাকে না। শুনেছি তারা লন্ডনে থাকেন তাদের বোনের সঙ্গে। তার দুলাভাই সেনাবাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন। শুনেছি তিনি এসে প্রতি মাসে ভাড়া নিয়ে যান।”

মামুন শিকদার  আরও বলেন, “আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের ছেলেমেয়েদের খেলার সময় বল ওই বাড়ির মধ্যে চলে গেলে আমি দেয়াল টপকে ওই বাড়ির মধ্যে যাই। সেখানে ঝোপঝাড়ে ভরা। মনে হয় কয়েক শ বেজি সেখানে বাস করে। একটি একতলা ভবনের দুটি ঘর কতকাল ধরে বন্ধ, আল্লাহই জানে। আর চৌচালা টিনের ঘরের দুটি রুমে ফার্নিচারের দোকানের মালামাল রাখে। তবে এখানকার কেউই রীতা-মিতা সম্পর্কে কিছু বলতে পারবে না।”

রীতা-মিতাদের বাড়ির উত্তর পাশেও রয়েছে একটি অ্যাপার্টমেন্ট। ওই অ্যাপার্টমেন্টের দারোয়ান ফেরদৌস আলম বলেন, “ভাই, আমি এখানে ছয় মাস ধরে আছি। তাদের ব্যাপারে কিছুই জানি না।”

২০০৫ সালের ৮ জুলাই বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম হয়েছিলেন এই দুই দুই বোন। মানবাধিকার সংস্থার আইনজীবী অ্যাডভোকেট এলিনা খান 'ভুতুড়ে বাড়ি' থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় তাদের উদ্ধার করেছিলেন। দিনের পর দিন না খেয়ে হাড্ডিসার হয়ে গিয়েছিলেন দুই বোন। নানা রোগব্যাধি বাসা বেঁধেছিল শরীরে।

রীতা-মিতার মধ্যে আইনুন নাহার রীতা সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। আর নূরুন নাহার মিতা বুয়েট থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বিদেশে গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেন।

Post A Comment: