ভেবেছিলাম, রেদওয়ান রনির আইসক্রিম গলে যাবে, বাজার চলতি অন্যান্য বাংলা চলচ্চিত্রের মতো গলে নিঃশেষ হয়ে যাবে। কিন্তু গলল না—এটাই অবাক ব্যাপার! পুরো ছবিতে সে শক্ত করে টেনে রাখল দর্শককে। এমনকি আইসক্রিম খেয়ে (পড়ুন: দেখে) শেষ করার পর মনের মধ্যে ছবিটি শক্ত অবস্থান নিল, জেগে থাকল। এই সময়ের বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য এটা অবশ্যই সুখকর ঘটনা।


বলিউডের মতো বাংলাদেশের ছবির প্রচারণাও আজকাল সোশ্যাল নেটওয়ার্ক বা ইউটিউবে চালু হয়েছে, এটা বেশ ভালো ব্যাপার। কারণ, এখানে ট্রেলার দেখে ছবি দেখতে যাব কি না—দর্শকের এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে। আইসক্রিম-এর অনলাইন প্রচারণা দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ছবিটি দেখব না। ট্রেলারে ছবির সবকিছুই পছন্দ হয়েছিল—ঝকঝকে এইচডি মানের প্রিন্ট, ভালো ক্যামেরার কাজ। কিন্তু নায়ক-নায়িকা বলতে বাংলা সিনেমার দর্শকদের চোখে যে দৃশ্য গেঁথে আছে, তার বাইরে পরিচালক রেদওয়ান রনির পদযাত্রা দেখে দমে গিয়েছিলাম খানিকটা। ফলে ছবিটি না দেখার সিদ্ধান্তেই অটল ছিল মন।

কিন্তু অনেকটা হুট করেই দেখা হলো আইসক্রিম এবং গতানুগতিক বাংলা ছবির দর্শক হিসেবে আমি একবাক্যে মুগ্ধ।

প্রথমেই বলি ছবির নির্মাণগত মান নিয়ে। গোটা চলচ্চিত্রে ঝকঝকে প্রিন্ট আর ক্যামেরার দক্ষ কাজের জন্য পরিচালক ধন্যবাদ পাবেন। স্পট নির্বাচন থেকে প্রতিটি দৃশ্য ধারণে তার যে ক্যারিশমা, এককথায় তা অনন্য।

অনেক দিন পর কোনো বাংলা সিনেমা নিয়ে এমন দিলখোলা প্রশংসা করা যাচ্ছে, তাই নিজের কাছেই ভালো লাগছে। তবে একটি ছোট জায়গায় কোনো খুতখুতে দর্শক একটু বিরক্ত হতে পারেন—এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে জাম্প করার সময় ঢাকা শহরের বার্ডস আই ভিউটি দেখানো হয়েছে বারবার। এটা বেশ বিরক্তি-জাগানিয়া। কিন্তু নায়িকার সঙ্গে ঝগড়া করে নায়কের রাস্তা পার হওয়ার দৃশ্যে আমরা যারপরনাই বিমোহিত। ঝগড়া করলে প্রতিটি মানুষই এভাবে এলোমেলো পথ চলে।

এবার গানের প্রসঙ্গ। সিনেমায় নায়ক-নায়িকা ও সখীরা নেচে-গেয়ে গান করবে—এই সংস্কৃতি থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম আমরা। আইসক্রিম-এ রনি আমাদের সেটা দিয়েছেন। ছবির গানগুলো কখনোই অপ্রয়োজনীয় বা অপ্রাসঙ্গিক ঠেকেনি। গানগুলো গানের জায়গায়ই আছে। আরেক কদম বাড়িয়ে বলা যায়, গান হেঁটেছে ছবির সঙ্গেই।

কাহিনি এখানে দিতি-ইলিয়াস কাঞ্চন ও জাফর ইকবালের ত্রিভুজ প্রেমের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কাহিনিকার রনির প্রতি কৃতজ্ঞতা, তিনি অহেতুক চরিত্র বাড়িয়ে তথা নায়কের মায়ের চাচিশাশুড়ির সঙ্গে নায়িকার দাদার পুরোনো প্রেম কিংবা জমি নিয়ে বিরোধ—এ ধরনের ক্লান্তিকর বাড়তি ঘটনা ঘটাননি। অহেতুক বাড়তি সমস্যা না দেখিয়ে একটি প্রেমের সংকটকে বড় করে চলচ্চিত্রের কাহিনি দাঁড় করানো এবং সেই কাহিনির ফাঁদে দর্শককে বেঁধে ফেলা—এটা আসলে ছোট ঘটনাও নয়। তা ছাড়া সিনেমায় যে কটি চরিত্র বর্তমান, খুবই অনিবার্য সেগুলো। আর অফিসের পরিবেশ বা অন্য ঘটনাগুলো মেলোড্রামা-বর্জিত, বাস্তবের মধ্যে দাঁড়ানো।

চরিত্রগুলোর মধ্যে বস হিসেবে ওমর সানি, সহকর্মী হিসেবে কাশতান ও প্রয়াত সায়েম—সবাই বেশ মারমার কাটকাট, একদম ‘পারফেক্ট’। সব মিলিয়ে ‘দুইয়ে দুইয়ে চার’ মেলানোর এই সিনেমায় ‘চার’ যথার্থভাবেই মিলেছে, জোরাজুরি করতে হয়নি, আর আমরাও নিরেট বিনোদন নিয়ে আনন্দচিত্তে ঘরে ফিরতে পেরেছি—এটা পরিচালকের বড় সাফল্য।

সবশেষে বলব তিন প্রধান চরিত্রের কথা। এ টি এম শামসুজ্জামান, প্রয়াত অভিনেত্রী দিতি বা অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় নিয়ে কথা বলার অবকাশ কম। কিন্তু প্রধান তিন চরিত্রকে ছাড় দেওয়া উচিত হবে না। উদয়, তুষি ও রাজকে রনি কেন নির্বাচন করেছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠানো যায়। প্রথম অভিনয় হিসেবে হয়তো অনেকেই তিনজকেই ‘অপরিপক্ব’ বলে ক্ষমা করবেন বা ছাড় দেবেন। কিন্তু যে ছবির সবকিছু ভালো, সেই ছবির প্রধান তিন চরিত্রের অভিনয় ‘আপ টু দ্য মার্ক’ নয়, এটিকে কীভাবে ক্ষমা করা যাবে? নায়ক উদয় ও তুষির অভিনয় হতাশাজনক।

এক্সপ্রেশনের অভাব মারাত্মক। আর রাজকে যতটা লোফার লাগা উচিত, ততটাই লেগেছে। তুষির অনেক উচ্চারণ কানে লেগেছে। কান্নার এক্সপ্রেশন বেশির ভাগ সময়ই হয়নি। এগুলো শুধরে নিতে পারলে ছবিটি শতভাগ উতরে যেত।

আবারও বলি, আইসক্রিমটি গলে পানি হয়ে যায়নি। শেষ পর্যন্ত জমজমাটই ছিল।

Post A Comment: