ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না দিলে শোকজ করা উচিত


কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের পর ময়নাতদন্ত নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তার পটভূমিতে বাংলাদেশে ফরেনসিক বিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক-এর মুখোমুখি হয় ভিন্ন খবর । তিনি বলেছেন, তনুর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না দেওয়ায় সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শোকজ করা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান


ভিন্ন খবর : তনুর ময়নাতদন্ত কোন আইনে হলো? আইনের লঙ্ঘন ঘটল কোথায়?

মোজাহেরুল হক: বাংলাদেশে কোন আইনে ময়নাতদন্ত হয়? ৪০ বছর ধরে আমি এই প্রশ্ন রাখছি, তনুর ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন। এটা মৌলিক এবং সব থেকে জরুরি প্রশ্ন। সুরতহাল রিপোর্ট করতে পুলিশের অন্তত একটা আইনগত ভিত্তি আছে।

ভিন্ন খবর : ডিএনএ রিপোর্টের পর পুলিশ বলছে, এখন ধর্ষণের আলামত মিলেছে। অথচ, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট নীরব ছিল?

মোজাহেরুল হক: সুরতহাল রিপোর্টে ধর্ষণ-সম্পর্কিত তথ্য ও আলামত এবং অপরাধ সংঘটনের দৃশ্যপটে আলামত সংগ্রহটা যদি গোড়াতেই চিকিৎসকের নজরে আনা হতো, তাহলে ময়নাতদন্তকারী অধিকতর সতর্ক হতে পারতেন। ধর্ষণের দিকটি দেখা হয়তো ময়নাতদন্তে বাদ পড়ত না। চিকিৎসকের দৃশ্যপটে যে কারণে উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য। কারণ, চিকিৎসক ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ আলামত (ট্রেস এভিডেন্স) সংগ্রহ করা সম্ভব নয়, বরং মিস করার আশঙ্কা থাকে।

ভিন্ন খবর : এখন দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত দিতে বিলম্ব করা হচ্ছে। এই বিলম্ব কি সন্দেহজনক?

মোজাহেরুল হক: আমি সন্দেহজনক বলব না, অত্যন্ত অযথাযথ বলব। যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে ময়নাতদন্ত ও চিকিৎসকের চাকরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশে কারা এটা নিয়ন্ত্রণ করে, তা অস্পষ্ট। এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তরফে চিকিৎসককে একটা কারণ দর্শাও নোটিশ দেওয়া উচিত।

ভিন্ন খবর : কাকে শোকজ করা উচিত?

মোজাহেরুল হক: কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধানকে দেওয়াই শোভন।

ভিন্ন খবর : তনুর সুরতহাল রিপোর্টে কোনো ত্রুটি হয়েছে বলে মনে করেন?

মোজাহেরুল হক: আমাদের দেশে অনভিজ্ঞ পুলিশ সাধারণত সুরতহাল রিপোর্ট করে থাকে। তনুর ক্ষেত্রেও এটা ঘটে থাকতে পারে।

ভিন্ন খবর : মেডিকেল পেশায় বিদেশি ডিগ্রির ছড়াছড়ি। তাহলে আইন ও নিয়মনীতি না থাকার মতো এত বড় একটা ঘাটতি কীভাবে থাকল? ৪৫টা বছর আমরা আইন ছাড়া চললাম কী করে?

মোজাহেরুল হক: মেডিসিন বা সার্জিক্যালের মতো বিষয়ে অধ্যয়নের ঝোঁক বেশি। সব দেশেই ফরেনসিক মেডিসিনে রোগী দেখে আয়ের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। আর এটা দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সরকারও দেখে, তারা যদি ক্লিনিশিয়ান চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়াতে পারে, তাহলে জনগণকে চিকিৎসাসেবা বেশি দিতে পারবে। চিকিৎসকদের ফরেনসিকে উচ্চশিক্ষার আগ্রহ কম, তাই রাষ্ট্রের কাছেও তা অবহেলিত রয়ে গেছে।

ভিন্ন খবর : ১৮৭১ সালের করোনার্স আইনটা ছিল এবং আছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ময়নাতদন্তের গাইডলাইন করে দিয়েছেন। এখানে তা হলো না কেন?

মোজাহেরুল হক: এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতিটি সরকারগুলোর অবহেলা, যা এখনো বিদ্যমান। কিছুদিন আগে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ৯৯ ভাগ ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ভুল।

ভিন্ন খবর : এই তথ্যের ভিত্তি কী?

মোজাহেরুল হক: সেটা আমি জানি না। আমি মনে করি, এর ভিত্তি আছে। আর এটা একটা গুরুতর মন্তব্য, এ বিষয়ে ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম। তাহলে আমার প্রশ্ন, ওই সব ভুল ময়নাতদন্তনির্ভর রায়ের ওপরে তার কী প্রভাব পড়েছে? আপনি যদি মানুষের কোনো ইনজুরির কথা বলেন, তাহলেই ফৌজদারি কার্যবিধিসহ পুরো বিচারব্যবস্থার কথা আসে। চিকিৎসকেরা ইনজুরি রিপোর্ট দেন। তনুর ঘটনাতেই নয়, এর আগে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে দৃশ্যপট তদন্তের বিষয় ছিল। আর তখনো কোনো চিকিৎসক ছিলেন না, এখানেই আইনের ঘাটতি সংকট তৈরি করছে।

ভিন্ন খবর : ১৮৭১ সালের করোনার্স আইন বলছে, চিকিৎসকের উপস্থিতি ছাড়া মৃত্যু দৃশ্যপট তদন্ত—এটা হতেই পারে না।

মোজাহেরুল হক: ঠিক তাই। বিলেতসহ গোটা দুনিয়ায় এটাই রেওয়াজ, এটাই আইন। আমাদের দেশে এটা যে হয় না, সে বিষয়ে অনেক আগেই আদালতের পর্যবেক্ষণ প্রত্যাশিত ছিল। তনু কী অবস্থায় মরে পড়ে ছিল, শরীরে জখম বা কাপড়চোপড় ছেঁড়া ছিল কি না, দৃশ্যপটে ধস্তাধস্তির কোনো চিহ্ন ছিল কি না, অপরাধীদের কোনো আলামত ছিল কি না, সেটা পুলিশ ও চিকিৎসক মিলে দেখবেন। আলামত সংগ্রহ করবেন। তার আলোকচিত্র ধারণ করা দরকার ছিল।

ভিন্ন খবর : ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, এর ভিডিওগ্রাফি সংরক্ষণ করতে হবে।

মোজাহেরুল হক: ভিডিওগ্রাফির প্রচলন সঠিক এবং আমাদের দেশেও সম্ভব। লন্ডন হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের আওতাধীন আমি দুটো মরচুয়ারিতে কাজ করেছি। দুটোই পূর্ব লন্ডনে ছিল। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২—এই সময়টায় আমি তিন থেকে চার শ ময়নাতদন্ত করেছি। করোনার্স কোর্টে আমাকে প্রায়ই যেতে হতো। যেতে হতো মৃত্যু দৃশ্যপটে এমনকি উপস্থিত হতে হতো কবর থেকে লাশ তোলার সময় এবং স্থিরচিত্র গ্রহণ ছিল তখন একটি নিয়মিত বিষয়।

ভিন্ন খবর : আমরা এ রকম একটা ব্যবস্থা চালু করতে পারি কি না?

মোজাহেরুল হক: অবশ্যই পারি। করোনার হলো একটা ব্যবস্থা, আমেরিকায় তা মেডিকেল এগজামিনার,শ্রীলঙ্কায় জুডিশিয়াল মেডিকেল অফিসার।করোনার্স ব্যবস্থা কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে ছিল। তখন হত্যাকাণ্ডের হার খুব কম ছিল। ময়নাতদন্তও কম হয়। বর্তমানে বিশ্বে করোনার ব্যবস্থাসহ দেশোপযোগী বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু হয়েছে হত্যা তদন্তে। প্রাচীনকালে সমুদ্রডুবির পরে জাহাজের মৃতদের সম্পদ দখলে নেওয়ার দরকার থেকে রাষ্ট্র করোনার ব্যবস্থা চালু করেছিল। জনচিন্তা থেকে হয়নি। পরবর্তীকালে তা সংস্কার করে যুগোপযোগী করা হলো এবং এখনো হচ্ছে।

ভিন্ন খবর : ভারতের আইন কমিশন ২০০৮ সালে ওই করোনার্স অ্যাক্টের মূলনীতিগুলো নিয়ে একটি আইনের খসড়া তৈরি করেছে। আমাদেরও কি তেমন গাইডলাইন তৈরি করা উচিত?

মোজাহেরুল হক: আমি একমত, এটার প্রয়োজন অনেক আগে থেকে। বর্তমানে ময়নাতদন্ত হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। কিন্তু সেখানে কাজটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিযুক্ত চিকিৎসকেরা করছেন। এটা পাল্টাতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফরেনসিক চিকিৎসকেরাই ময়নাতদন্ত করবেন। মর্গগুলো থাকবে স্বরাষ্ট্রের। বিদেশে একজন প্যানেলভুক্ত ফরেনসিক চিকিৎসক একসঙ্গে শিক্ষকতা আবার ময়নাতদন্তটা করেন। আমাদেরও মেডিকেল কলেজে তাই হয়।

সাধারণভাবে এখন প্রতি জেলায় সিভিল সার্জন ময়নাতদন্তের দায়িত্বে থাকেন। অথচ তাঁর ফরেনসিক ডিগ্রি নেই এবং তাঁকে এই বিষয়ে কখনো প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় না। বর্তমানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোনো সিভিল সার্জন যদি কোনো একটি জেলাতেও না থাকেন, তাহলেও আমি অবাক হব না। সিভিল সার্জন নিজে সাধারণত ময়নাতদন্ত করেন না। করেন জেলা হাসপাতালের রেসিডেন্ট চিকিৎসক। কারণ মর্গটা সেখানে, অথচ তাঁরও কোনো যোগ্যতা বা প্রশিক্ষণ নেই। আবার এই কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক। উপরন্তু মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে আদালতেও যেতে হবে। অথচ এর জন্য তাঁকে কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিনা পয়সায় ডাক্তারদের খাটিয়ে নিচ্ছে। অন্যান্য দেশে এ জন্য একটা ফি নির্ধারিত আছে। বিলেতে ও ভারতেও আছে। তবে বিলেতে সব ধরনের চিকিৎসকের চেয়ে ফরেনসিক চিকিৎসকেরাই বেশি আয় করেন। তাঁদের সম্মানও বেশি, তাই ওই পেশায় যাওয়ার প্রবণতাও তীব্র।

ভিন্ন খবর : দেশের সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে ৪০-৫০ মার্কের একটা অপ্রতুল পাঠদান ব্যবস্থা চলছে। এটা সত্যি?

মোজাহেরুল হক: সত্যি। একটা ময়নাতদন্ত হচ্ছে। ২০-২৫ জন ছাত্রছাত্রী দূরে নাকে রুমাল দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখে, এটাই তাদের একমাত্র প্রশিক্ষণ এবং তা স্নাতকপূর্ব শিক্ষায়। দেখুন, তনু হত্যায় এক্সুমেশন হয়েছে, এটা কিন্তু আবার একেবারেই আলাদা টেকনিক। কবর থেকে লাশ তোলা খুবই বিজ্ঞানসম্মত। প্রথম ময়নাতদন্তের পরে সরকার অসন্তুষ্ট বা তনুর মতো ক্ষেত্রে বাবা-মা বা স্বজনেরা পুনরায় ময়নাতদন্ত চাইতে পারেন। বিদেশে সংক্ষুব্ধরা চাইলে তাঁদেরকে একটা ফি দিতে হবে। সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত একটা লাশের বারবার ময়নাতদন্ত হতে পারে। প্রথম ময়নাতদন্ত শেষেই দাফন নয়, সন্দেহজনক মৃত্যু তদন্তের জন্য মর্গে/হিমঘরে সংরক্ষিত করতে হবে লাশ। আমার প্রশ্ন সেখানেই। প্রথম ময়নাতদন্ত শেষে তনুর দ্বিতীয় দফার প্রশ্ন উঠল কেন? কে সিদ্ধান্ত দিল? কেউ চাইলেই তো হবে না। আইন কী বলে খতিয়ে দেখা দরকার। বাংলাদেশে চারবারও ময়নাতদন্ত হয়েছে। লাশকে আমাদের সম্মান করতে হবে। অযথা কাটাছেঁড়া নয়।আমার ৪৫ বছরের ফরেনসিক অভিজ্ঞতায় প্রথমটা থেকে দ্বিতীয়টায় আমি খুব কম ফারাক হতে দেখেছি। এমনকি তৃতীয় থেকে চতুর্থে নতুন কিছু পাওয়ার ঘটনাও অত্যন্ত বিরল। আমি স্মরণ করতে পারি না, কোনো একটি ঘটনাতেও এটা ঘটেছে। তাহলেই প্রশ্ন, আমরা তাহলে দ্বিতীয়বার করছি কেন? ময়নাতদন্তে মাথা, বুক ও পেট খুলতে হয়। তারপর সব কটি অর্গান ডিসেক্ট করে মৃত্যুর কারণ খুঁজতে হয়। তারপর পুনরায় আগের মতো রেখে দিতে হয় প্লাস্টিক ব্যাগে। ধরুন, ছুরিকাঘাতে কাউকে মেরেছে। তাহলে সেই আঘাতের চিহ্নটা থাকবে। সেটা কাটা যাবে না, বরং সযত্নে রেখে দিতে হবে। তারপর প্রিজারভেটিভ দিয়ে পুরো লাশ রেখে দিতে হয়, যাতে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত সহজ হয়। আমি কী করতাম। হাতে গ্লাভস ও কাটাকুটির যন্ত্রপাতি। তাই পকেটে টেপ রেকর্ডার থাকত। মাইক্রোফোনে আমি বলতাম কোনটির পর কী করছি, পরে সেটা সচিবকে দিতাম। তাঁর থেকে বিবরণ পেয়ে রিপোর্ট লিখতাম। ময়নাতদন্তের পর মর্গ থেকে বেরোনোর সময় একটি ছোট ফরমে প্রাথমিক রিপোর্ট দেওয়ার নিয়ম। এটা কী ধরনের মৃত্যু, তা লেখা থাকে। কারণ, আপনি সময় কেন দেবেন? একজন খুনি সাত দিনে কোথায় না যেতে পারে? আরেকটি কথা, দেখুন, তনুর ময়নাতদন্ত রিপোর্ট সাত দিন পরে দেওয়া হয়েছে, অথচ এটা তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা উচিত ছিল।

ভিন্ন খবর : তনুকে দাফনে কোনো তাড়াহুড়ো?

মোজাহেরুল হক: দ্বিতীয়বারের দাবি প্রমাণ করে যে, বিতর্ক ছিল, সুতরাং তার লাশ দাফনের অনুমতি দেওয়াটাই ঠিক হয়নি। উচিত ছিল তার লাশ সংরক্ষণ করা। তাহলে পচন এড়ানো যেত।

ভিন্ন খবর : পোকায় কামড়ানো কীভাবে ঘটল?

মোজাহেরুল হক: হতে পারে। মরার আগে ও পরের কোনো ক্ষত বা আঘাত। দুয়ের মধ্যে পার্থক্য থাকবে। মৃত্যুর পরে ঘটলে তাকে আমরা বলব আর্টিফ্যাক্ট। পোকার কামড় আর আঘাত চিহ্নিত করা খুবই সহজ।

ভিন্ন খবর : তনুর চুল কাটার আলামত কিসের ইঙ্গিতবহ?

মোজাহেরুল হক: এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চিকিৎসকেরা অনেক সময় চুল কাটেন, আবার তনু মহিলা, প্রতিহিংসাবশত তাই তার চুল অপরাধীরাও কেটে ফেলতে পারে। অন্য কেউ করতে পারে। আরও অনেক আলামতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু প্রক্রিয়া ও কার্যধারা সম্পর্কে যদি আমাদের জ্ঞানের অভাব থাকে, তাহলে তো তাকে কাজে লাগাতে পারব না। তনুর লাশ যেখানে মিলেছে, পুলিশের কাজ ছিল সেই জায়গাটা সংরক্ষণ করা। সেখানে কাউকে ঢুকতে না দেওয়া। নিশ্চিত করা কোথায় তনু খুন হয়েছে।

ভিন্ন খবর : লাশ তোলার পরে দেখা গেছে, তনুর একটি পায়ের অংশে মাংস ছিল না।

মোজাহেরুল হক: ধরুন, মরদেহে ডাক্তার কোনো ইনজেকশনের সুচের চিহ্ন পেলেন। তখন তিনি কী ইনজেকশন, সেটা নির্ণয় করতে মাংস রাখতে পারেন। আঘাত থাকলে মাংসসহ টিস্যুও রাখতে পারেন।

ভিন্ন খবর : কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কি মাংস রাখা সম্ভব?

মোজাহেরুল হক: প্রশ্নই আসে না। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে তার ব্যাখ্যা থাকতে হবে। বিনা প্রয়োজনে এটা করা হবে বডি মিউটিলিশেন, যা অপরাধ। এটা দণ্ডবিধিতে আছে। নিয়ম হলো আপনি কাটাছেঁড়া করতে পারেন কিন্তু মৃতকে আবার সাজাতে হবে, যাতে তার স্বজনেরা লাশ দেখে আহত না হন। এ-বিষয়ক একটা ফরমেও এর উল্লেখ আছে।

ভিন্ন খবর : আমরা বলছিলাম কোনো আইন নেই, তাহলে ফরম কোন আইনে?

মোজাহেরুল হক: সেটা আরও দুঃখজনক। দণ্ডবিধিতে যে ফরম আছে, তার খোলনলচে পাল্টাতে হবে। এটা ব্রিটিশ আমলের শুধু বাংলায়। অনুবাদ করা হয়েছে। অন্য দেশে এটা সংস্কার করে আধুনিক করা হয়েছে। সুরতহাল রিপোর্ট তৈরিতেও কতগুলো গৎবাঁধা কথা লেখা থাকে। এটাও বদলাতে হবে। পুলিশ, আইনজীবী ও বিচারকদের ময়নাতদন্ত বিষয়ে প্রশিক্ষণ দরকার। আইন শাস্ত্রে সব থেকে গুরুত্বহীনভাবে ফরেনসিক পড়ানো হয়, অনেক জায়গায় পড়ানোই হয় না। আইনের ছাত্রের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ভিন্ন খবর : প্রথম ময়নাতদন্তে মাথার পেছনের আঘাত, নখের আঁচড়ের উল্লেখ না থাকা কি স্বাভাবিক, না অস্বাভাবিক?

মোজাহেরুল হক: এটা সুরতহাল রিপোর্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। তখন ফটোগ্রাফি হলে তার প্রমাণ মিলত। পোকার কামড়ের প্রমাণ থাকত। প্রথম ময়নাতদন্তে তার মৃত্যুর একটা কারণ থাকবেই। তার মৃত্যুর সময় নিরূপণ গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময় বলে দেওয়াটা অনেকটাই সম্ভব। অনেক সময় আঘাত কখন হয়েছে, তা-ও মাইক্রোস্কোপি করে দেখা যায়। টিস্যু পরীক্ষা করে বলা যায়, মৃত্যুর পরপরই যে প্রথম পরিবর্তনটা ঘটে, সেটা চোখে। শরীর ঠান্ডা বা শক্ত হওয়া, খাবার হজম হওয়া ইত্যাদি দেখা হয়। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক কেন তনুর মৃত্যুর সময় তা নির্ণয় করতে পারেননি, সেই প্রশ্ন থেকেই যাবে। আরেকটি দিক হলো, আমাদের দেশে এখনো অনেক সময় চিকিৎসকেরা নন, ডোমরা ময়নাতদন্তে শব ব্যবচ্ছেদ করেন। যেটা চিকিৎসকের কাজ।

ভিন্ন খবর : দেশে ডোমনির্ভর ময়নাতদন্তের হার কতটা?

মোজাহেরুল হক: এটা বহুলাংশে ডোমনির্ভর। ডোমরাই কাটাছেঁড়া করেন, যথাযথ ডিগ্রি ও প্রশিক্ষণবিহীন চিকিৎসকেরা দাঁড়িয়ে দেখে থাকেন। গত ৪৫ বছরে ধরে এটা চলছে, কেউ স্বীকার করুন আর না-ই করুন, এটাই সত্যি। ফরেনসিকে যে ডিপ্লোমা চালু আছে, তা যাঁরা করেছেন তাঁরা কেউই সিভিল সার্জনের অধীনে নিয়োজিত নেই। যাঁরা ময়নাতদন্ত করেন, তাঁদের ৯০ ভাগেরই এই ডিপ্লোমা নেই। তাই এটা একটা বিস্ময়কর ব্যাপার যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন নিজেকে প্রশ্ন করছে না যে কোনো জবাবদিহি ছাড়াই তারা কী করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিযুক্ত চিকিৎসক দিয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছে। আমি যদি বলি, দেশে কোন আইনে ময়নাতদন্ত করেন—তাঁরা হয়তো বলবেন, এটা সরকারি আদেশ। কিন্তু এটা তো একটা আইনি বিষয়। এর ভিত্তিতে কেউ মাফ বা কেউ শাস্তি পাচ্ছেন। হত্যা একটি গুরুতর অপরাধ।

ভিন্ন খবর : প্রচলিত আইন যেখানে যেটুকু আছে, তা কতটা পূরণ করে? নাকি ১৮৭১ সালের মতো একটি আইন দরকার? করোনার্স অ্যাক্ট ও ভারতের গাইডলাইন অনুসরণ করা যেতে পারে বাংলাদেশে।

মোজাহেরুল হক: একেবারেই করে না। পূর্ণাঙ্গ ও যুগোপযোগী আইন দরকার।

ভিন্ন খবর : আপনি দেশে আসা-যাওয়ার মধ্যে থেকেছেন। একসময় চট্টগ্রাম শহর ছাত্রলীগের সহসভাপতি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে আপনার ভূমিকা ছিল। আপনার তিন বোন শহীদ হয়েছেন। দেশের প্রতি অঙ্গীকার থেকে এই অবস্থা বদলাতে আপনি কীভাবে চেষ্টা করেছেন? কী তার ফল?

মোজাহেরুল হক: ফল শূন্য, তবে আমার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আমিই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে ময়নাতদন্ত বিষয়ে শিখতে বিলেতে যাই। ১৯৭৩ থেকে ফরেনসিকেই আছি। বহু দেশে পরামর্শক হিসেবে গেছি। আমি যখন বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিদেশে খ্যাতি পেলাম, তখন আমি উদ্বেলিত হয়েছিলাম এই আশায় যে, দেশে গিয়ে একটা পরিবর্তন আনব। প্রচুর লিখেছি। সরকারের দুয়ারে ধরনাও দিয়েছি। গাজী শামসুর রহমান সাহেবকে নিয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মতিন চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তিনি পুরোপুরি রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। তবে এ বিষয়ে আপনাদের সাম্প্রতিক নিবন্ধ সব থেকে সাড়া জাগিয়েছে। নারীপক্ষ এনজিওটি রেপ ভিকটিমদের নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করছে। সেখানেও কিন্তু সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ফরেনসিক চিকিৎসকেরা। ধর্ষণের ডাক্তারি পরীক্ষায় যথাযথ প্রশিক্ষণ আজ পর্যন্ত দেওয়া শুরু হচ্ছে না। আমরা কোথায় আছি? ধর্ষণ হয়েছে কি হয়নি, তা নির্ণয়ের প্রশিক্ষণ পর্যন্ত চিকিৎসকদের দেওয়া হয়নি। আপনি বলে দিচ্ছেন, মহিলা ডাক্তার এটা করবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাঁদের প্রশিক্ষণে কী করেছেন? তাঁদেরকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি, প্রশিক্ষণ দিয়ে দায়িত্ব দিতে হবে। এটাকে যাতে তাঁরা পেশা হিসেবে নেন, সে জন্য একে আকর্ষণীয় করতে হবে। ফি ঠিক করতেই হবে। বিনা টাকায় ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষাসমূহ করানোর ফলে চিকিৎসকেরা শিথিলভাবে এসব বিষয় দেখছেন। সব ক্ষেত্রে অবহেলা নয়, জ্ঞানের স্বল্পতার কারণেও বিপর্যয় ঘটছে। মেডিকেল নেগলিজেন্স আর মেডিকেল এরর কিন্তু এক নয়। এ দেশে ফরেনসিক চিকিৎসকদের কদর কখনো হয়নি। ফরেনসিক বিষয়ে আরও উচ্চতর প্রশিক্ষণসহ প্রযুক্তির উন্নয়নও ঘটাতে হবে। এসবের ঘাটতি ডিএনএ পূরণ করবে না। ডিএনএ ফরেনসিক বিজ্ঞানের একটি ক্ষুদ্রতম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক প্রযুক্তি।

 ভিন্ন খবর : পাঁচ বছরের এমবিবিএস অধ্যয়নকালে তাঁরা গড়ে কত ঘণ্টা ময়নাতদন্তের অভিজ্ঞতা অর্জনে ব্যয় করেন? কত হওয়া উচিত?

মোজাহেরুল হক: গড়ে ২০ ঘণ্টার বেশি নয়। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে ১০০ ঘণ্টাও কোনো উত্তর নয়। স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ দরকার; যা দুই বছরের ডিপ্লোমা। প্রশিক্ষণ দরকার মাস্টার্স পর্যায়ে। ২০৩০ সালে লোকসংখ্যা ৩০ কোটি হলে কত ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দরকার, তার একটা প্রাক্কলন দেশে থাকতে হবে। এটা কোনো সরকার কখনো করেনি। আমি চাই এই সরকার তাই করুক।

ভিন্ন খবর : সময় নিয়ে আইন করার আগে অনতিবিলম্বে ১৮৭১ সালের আইনটির আদলে কি এখনই চালু করা যায়? করোনার্স আইনের জুরি প্রথা উত্তম মনে হয় না?

মোজাহেরুল হক: একটা প্রতিকার দ্রুত দরকার। সুরতহাল রিপোর্ট তৈরিতে ওই করোনার্স আইনে বর্ণিত স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা যায়। জুরি প্রথা আমাদের দেশে চালু ছিল। আবার চালু হোক। আদালতেও জুরি থাকুক।

ভিন্ন খবর : তার মানে, ১৮৭১ সালের আইনের কতিপয় নীতি চালু ছিল?

মোজাহেরুল হক: হ্যাঁ। ছিল। ১৯৭৩-৭৪-এ আমি নিজে চট্টগ্রামে দেখেছি। কোর্টে জুরিরা বসতেন।

ভিন্ন খবর : আশু করণীয় কী? দেশে এখন বছরে প্রায় চার হাজার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এতে ময়নাতদন্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মোজাহেরুল হক: আরবি শব্দ মো আয়না (দেখা) থেকে ময়নাতদন্ত শব্দ এসেছে। আমি বলব, নতুন করে সবাইকে ভেবে দেখতে হবে। বাস্তবে প্র্যাকটিস যা কিছু ঘটছে, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একটি পূর্ণাঙ্গ আইনে গোটা ময়নাতদন্তব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। সংস্কার করতে হবে। ভূতাপেক্ষ বৈধতাও লাগবে। সিভিল সার্জনের পরিবর্তে একজন করোনার/মেডিকো লিগ্যাল ডাক্তার জুডিশিয়াল মেডিকেল অফিসার দিতে হবে। তাঁর অধীনে শুধু ময়নাতদন্ত নয়, সব ফরেনসিক বিষয় আনতে হবে। তিনিই সব ধরনের মেডিকো লিগ্যাল বিষয় দেখভাল করবেন। তাঁর কার্যধারায় এসব থাকবে। প্রতি জেলায় একজন দায়িত্বপ্রাপ্তের অধীনে দুজন ফরেনসিক ডাক্তার, চারজন নার্স, একজন সচিব, দুজন ডোম ও ক্লিনার দিতে হবে। এখানে বলি, ডোমদের অচ্ছুত ভাববেন না। বিলেতে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রিধারীরা ডোমের কাজ করেন, পদবিতে তাঁরা মরচুয়ারি অ্যাসিস্ট্যান্ট। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে তাঁরা একটি ইউনিট হিসেবে কাজ করবেন।

ভিন্ন খবর : আপনাকে ধন্যবাদ।

মোজাহেরুল হক: ধন্যবাদ।



*অধ্যাপক মোজাহেরুল হক: বাংলাদেশের প্রথম ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. মোজাহেরুল হকের জন্ম ১৯৪৮ সালের ৮ ডিসেম্বর, ভারতের আগ্রায়। বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়াশোনা করেন ১৯৬৫-৭০ সালে। বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস থেকে ১৯৭৯ সালে ফরেনসিক মেডিসিন বিষয়ে স্নাতকোত্তর মেম্বারশিপ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৮২ সালে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে লন্ডন হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ থেকে ফরেনসিক প্যাথলজিতে উচ্চতর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীকালে ডান্ডি ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স ইন মেডিকেল এডুকেশন ডিগ্রি নেন ১৯৯৮ সালে। চট্টগ্রাম সলিমুল্লাহ ও রাজশাহী মেডিকেলে ফরেনসিক বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ডব্লিউএইচওতে স্বাস্থ্যবিষয়ক মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক উপদেষ্টার পদ থেকে ২০১০ সালে অবসর নেন। বর্তমানে ইউনেসকো নিয়োজিত মাস্টার ট্রেনার হিসেবে বিভিন্ন দেশে মেডিকেলে এথিকস বিষয়ে প্রশিক্ষক ও জাকার্তাভিত্তিক ইন্দো-প্যাসিফিক অ্যাসোসিয়েশন অব ল মেডিসিন অ্যান্ড সায়েন্সের ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন।

Post A Comment: