ত্বকের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে প্রতিদিন ঘরে-বাইরে যে ট্যালকম পাউডার আমরা ব্যবহার করি, তার প্রধান উপাদান হলো ট্যাল্ক। ট্যাল্ক হলো এমন এক ধরনের খনিজ যৌগ, যা মূলত ম্যাগনেশিয়াম, সিলিকন এবং অক্সিজেনের মতো বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। পাউডার হিসেবে এর কাজ হলো ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখা ও ত্বকের বহিরাংশের ওপর চাপ কমানো।


ট্যালকম পাউডার ব্যবহারের ফলে ত্বক শুষ্ক থাকে এবং ত্বকের ফুসকুঁড়ি রোধেও এটি কাজ করে। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কের মুখের ও দেহের ত্বকের ওপর ভিত্তি করে প্রসাধনী পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত ট্যালকম পাউডারের শ্রেণিভেদ রয়েছে।

প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক রূপে ট্যাল্কে অ্যাজবেস্টস নামের একটি উপাদান থাকে। এই উপাদানটি ক্যান্সারের কারণ হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে সুগন্ধি ট্যালকম পাউডার শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করে তা ফুসফুসের ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত ট্যালকম পাউডার জাতীয় পণ্যগুলোকে ১৯৭০ সাল থেকে অ্যাজবেস্টসমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

কিন্তু তাও ঝুঁকি থেকে বাইরে নেই খোদ যুক্তরাষ্ট্রই। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড জনসন অ্যান্ড জনসনকে ৭২ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছে। জরায়ুর ক্যান্সারে আক্রান্ত এক নারীর মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে এ ক্ষতিপূরণ দেবে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত বেবি পাউডার এবং শাওয়ার অ্যান্ড শাওয়ার পণ্য দু’টি দীর্ঘ কয়েক দশক ব্যবহার করেছিলেন মৃত ওই নারী এবং এর সঙ্গে তার ক্যান্সারের সংশ্লিষ্টতা থাকায় এই রায় দিয়েছেন আদালত।

জনসন অ্যান্ড জনসন নিজেদের পণ্যের বিক্রি বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে ট্যাল্কভিত্তিক পণ্যগুলো যে ক্যান্সারের কারণ হতে পারে, সে বিষয়ে গ্রাহকদের সচেতন করায় আগ্রহী নয় বলে কয়েক দশক ধরে অসংখ্যবার অভিযোগ উঠেছে। কেবল মিসৌরির আদালতটিতেই এরকম প্রায় হাজার খানেক মামলা দায়ের করা হয়েছে, এছাড়া নিউ জার্সিতেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এরকম আরো দুইশ’ মামলা রয়েছে।

ক্যান্সারের জন্য ট্যালকম পাউডার কি দায়ী?
ট্যালকম পাউডারের সঙ্গে ক্যান্সারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা, তা জানার আগে অ্যাজবেস্টসযুক্ত ও অ্যাজবেস্টসমুক্ত ট্যাল্কের মধ্যে পার্থক্য জানতে হবে। অ্যাজবেস্টসযুক্ত ট্যাল্ক শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে দেহের ভেতরে গেলে একে সাধারণত ক্যান্সারের গ্রহণযোগ্য কারণ হিসেবে ধরা হয়। আধুনিক ভোক্তা পণ্যে এ ধরনের ট্যাল্ক ব্যবহারের অনুমতি নেই। আর অ্যাজবেস্টসমুক্ত ট্যাল্ক ব্যবহারে ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায় বলে অনুমান গবেষকদের।

এ বিষয়ে যত গবেষণা
ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট কারণ আজ অবধি জানা যায়নি। এর নেই কোনো নিশ্চিত চিকিৎসাও। আপাতদৃষ্টিতে ক্যান্সারের জন্য দায়ী মনে হওয়া উপাদানগুলো সম্পর্কে জানার প্রচেষ্টা হিসেবে বিজ্ঞানীরা দু’ ধরনের গবেষণা করে থাকেন।

১. ল্যাব স্টাডিজ
গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন প্রাণির ওপর অসংখ্য গবেষণায় জানার চেষ্টা করেছেন যে কোন কোন উপাদানের সংস্পর্শে আসলে স্বাস্থ্যসমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া সাধারণ কোষকে এসব উপাদানের সংস্পর্শে আনলে কোষগুলোতে যে পরিবর্তন আসে, তার সঙ্গে ক্যান্সার কোষের কোনো মিল রয়েছে কিনা, তাও বোঝার চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল মানবদেহের ক্ষেত্রে কতটা প্রযোজ্য, সে বিষয়ে গবেষকরা আজও নিশ্চিত না হলেও ক্যান্সারের সঙ্গে কোনো উপাদানের সম্পর্ক নির্ণয়ের এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো মাধ্যম।

গবেষণাগারে নানা ধরনের ইঁদুরের ওপর বিভিন্ন গবেষণায় নানারকম ফল পাওয়া গেছে। কিছু কিছু পরীক্ষায় অ্যাজবেস্টসমুক্ত ট্যাল্কের সংস্পর্শে এলে প্রাণিদেহে ক্যান্সার সংশ্লিষ্ট কোনো পরিবর্তন দেখা না গেলেও উল্টোচিত্র হিসেবে টিউমার তৈরি হতে দেখা গেছে।

২. জরিপ
দ্বিতীয় ধরনের গবেষণায় নমুনা হিসেবে ব্যবহৃত একেকটি দলের মানুষের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার যাচাই করা হয়। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট উপাদানের সংস্পর্শে আসা দলটির সঙ্গে উপাদানটির সংস্পর্শে না আসা দলটিতে ক্যান্সারে আক্রান্তের হার যাচাই করা হয় এবং সে হিসেবে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কার হার অনুমান করা হয়। এ ধরনের গবেষণার ফলাফলের অর্থ বোঝা মাঝে মাঝে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে, কারণ অন্যান্য নানা প্রভাবকের কারণে গবেষণার ফলে পার্থক্য দেখা দিতে পারে।

এ ধরনের গবেষণায় একেক ধরনের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে একেকরকম ফল পাওয়া গেছে-

জরায়ুর ক্যান্সার
নারীরা যোনিপথের আশপাশে পাউডার ব্যবহার করলে কিংবা স্যানিটারি ন্যাপকিন, ডায়াফ্রাম বা কনডমে ব্যবহৃত পাউডারের মাধ্যমে রাসায়নিক উপাদানগুলো যোনি, গর্ভাশয়ে ও ফ্যালোপিয়ান টিউব হয়ে দেহের ভেতরে জরায়ুতে প্রবেশ করতে পারে। নারীদের ট্যালকম পাউডার ব্যবহার ও জরায়ুর ক্যান্সারের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতে গিয়ে অনেক গবেষণার ফলেই সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। মিশ্র ফলাফলের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে বলা হয়েছে বেশি ঝুঁকির কথা এবং কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি নেই বলে জানানো হয়েছে। নিয়ন্ত্রিত অনেক গবেষণায় কম ঝুঁকি দেখা গেছে। কিন্তু এ ধরনের গবেষণা অনেক ক্ষেত্রেই পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে, কারণ অধিকাংশ সময়েই এসব গবেষণার জন্য নির্ভর করতে হয় গবেষণায় অংশ নেওয়া মানুষজনের স্মৃতির ওপর, যে তারা কত বছর আগে পাউডার ব্যবহার শুরু করেছেন বা ইত্যাদি। এছাড়া ট্যাল্ক ব্যবহার করা হয়, এমন আরো অনেক পণ্যই রয়েছে যেগুলোও নিয়মিত ব্যবহার করে থাকেন অনেকে।

ফুসফুসের ক্যান্সার
ট্যাল্কের খনি ও কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের ওপর করা গবেষণা সূত্রে জানা যায়, তাদের ফুসফুসে ক্যান্সার ও শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাকিদের তুলনায় বেশি। অপরিশোধিত ট্যাল্কে অ্যাজবেস্টসের পরিমাণ একেকসময়ে একেক রকম হতে পারে এবং পরিশোধিত ট্যাল্ক থেকে অ্যাজবেস্টস পুরোপুরি নির্মূল করে ফেলা হয়। এছাড়া মাটির নিচে কাজ করার সময় তেজস্ক্রিয় রেডনের মতো মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নানা উপাদান বা পদার্থের সংস্পর্শে এলেও ক্যান্সারের ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে বলেও এসব গবেষণার ফল শতভাগ সঠিক বলা সম্ভব নয়।

প্রসাধনী পণ্য হিসেবে তৈরি ট্যালকম পাউডার থেকে ফুসফুসের ক্যান্সারের বিষয়টি প্রমাণিত নয়।

অন্যান্য ক্যান্সার
অন্যান্য ক্যান্সারের সঙ্গে ট্যাল্ক ব্যবহারের সরাসরি কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তবে অন্যান্য ক্যান্সারের সঙ্গে ট্যাল্কের সম্ভাব্য সম্পর্ক গবেষণায় তেমন গুরুত্ব দিয়ে কোনো গবেষণা হয়ওনি। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যোনিপথের আশপাশে ট্যাল্কের ব্যবহার মূত্রনালিতে ক্যান্সারের কারণও হতে পারে। এক্ষেত্রে রজঃক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া নারীদের ঝুঁকি বেশি। কিন্তু অন্যান্য গবেষণায় এ আশঙ্কা পাওয়া যায়নি। আবার কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে ট্যাল্ক দেহে প্রবেশ করে তা পাকস্থলীর ক্যান্সারের কারণ হতে পারে, কিন্তু বিষয়টি প্রমাণিত নয়।

দু’ ধরনের গবেষণাতেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রামাণিক যুক্তি পাওয়া যায়নি বলে ক্যান্সারের কারণ হিসেবে কোনোকিছুকে শনাক্ত করতে চাইলে গবেষকরা দু’ ধরনেই পরীক্ষাই করে থাকেন।

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলো যা বলে
বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিবেশের নানা উপাদানের সঙ্গে ক্যান্সারের সংশ্লিষ্টতা নির্ধারণের চেষ্টা করছে। ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে বা ক্যান্সার বাড়াতে সহায়ক- এমন উপাদানগুলোকে ‘কার্সিনোজেন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণিকে নিয়ে এসব গবেষণার ফলাফলের মাধ্যমে ক্যান্সারের ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজটি করে আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটি। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা কেন্দ্র- আইএআরসি’র মূল লক্ষ্য হল ক্যান্সারের কারণ শনাক্ত করা।

মানবদেহের জন্য অ্যাজবেস্টস কার্সিনোজেন হিসেবে কাজ করে বলে আইএআরসি জানিয়েছে। কিন্তু তথ্যের অভাবের কারণে শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করা অ্যাজবেস্টস কার্সিনোজেন হিসেবে কাজ করে কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত নয় আইএআরসি। মানবদেহের ওপর সীমিত গবেষণায় জরায়ুর ক্যান্সারের সঙ্গে ট্যাল্কের নিশ্চিত সম্পর্কের কথা বলা সম্ভব না হলেও একে ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ, সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এবং ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনসহ আরো নানা সংস্থাকে নিয়ে গঠিত ইউএস ন্যাশনাল টক্সিকোলজি প্রোগ্রাম ট্যাল্ককে সম্ভাব্য কার্সিনোজেন হিসেবে সম্পূর্ণ মত দেয়নি।

ট্যালকম পাউডার ছাড়াও ট্যাল্কসমৃদ্ধ অন্যান্য প্রসাধনী পণ্য ক্যান্সারের ঝুঁকি কতটা বাড়ায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন গবেষণায় মিশ্র ফল পাওয়া গেলেও জরায়ুর ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ানোর আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে বেশ কিছু গবেষণা প্রতিবেদনে। এ বিষয়ে যতদিন পর্যন্ত না গবেষকরা নিশ্চিত হতে পারছেন, ততদিন ট্যালকম পাউডার ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বিগ্ন ব্যক্তিদের জন্য এ ধরনের পণ্য ব্যবহার ছেড়ে বা কমিয়ে দেওয়ারই পরামর্শ গবেষকদের। এক্ষেত্রে তারা ‘কর্নস্টার্চ’ভিত্তিক প্রসাধনী ব্যবহার করতে পারেন বলে মত বিশেষজ্ঞদের। এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের ক্যান্সারের সঙ্গেই কর্নস্টার্চ পাউডার বা গুঁড়োর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ হয়নি। সূত্র : ক্যান্সার ডট ওআরজি

Post A Comment: