এবার চামড়া সংরক্ষণ করা যাবে লবণ ছাড়াই।

প্রচলিত নিয়মের বাইরে ভাবনার জগৎকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শাহরুখ নূর-এ-তমাল। লবণ ছাড়া চামড়া সংরক্ষণের উপায় আবিষ্কারের পথে অনেকটা এগিয়েছেন তিনি। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব লেদার টেকনোলজিস্ট অ্যান্ড কেমিস্ট সোসাইটিস—থেকে পেয়েছেন ইয়াং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড-২০১৬।


                                 এবার চামড়া সংরক্ষণ করা যাবে লবণ ছাড়াই।
নতুন একটি বিষয়ে পড়াশোনার সিদ্ধান্তটা ঠিক হলো তো?’ এই দ্বিধা নিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে যাত্রা শুরু হয়েছিল শাহরুখ নূর-এ-তমালের। ক্লাস শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলেন, বাংলাদেশে চামড়াশিল্পের ক্ষেত্র অনেক বড়; সম্ভাবনাও। পাঠ্যবইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতেই চামড়া প্রকৌশল বিষয়টিকে ভালোবাসতে শুরু করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষে এসে তমাল এখন জানেন, একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েও কুয়েটের ‘লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং’ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল না। নইলে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত চামড়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব লেদার টেকনোলজিস্ট অ্যান্ড কেমিস্ট সোসাইটিসের (আইইউএলটিসিএস) দেওয়া ‘ইয়াং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড ২০১৬’ আজ হয়তো অন্য কারও হাতে শোভা পেত!

লবণ ছাড়া চামড়া সংরক্ষণের উপায় বের করে তরুণ বিজ্ঞানী খেতাব ছাড়াও গবেষণার কাজকে এগিয়ে নিতে আইইউএলটিসিএসের পক্ষ থেকে তমাল পুরস্কার হিসেবে পাবেন এক হাজার ইউরো। এর আগে এই পুরস্কার পেয়েছিলেন চীনের সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের চামড়া গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক ড. ইউহাং জিং। পরিবেশবান্ধব চামড়াশিল্প নিয়ে গবেষণার জন্য প্রতিবছর বিশ্বের একজনকে এই পুরস্কার দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

‘আমাদের বিভাগের প্রধান আবুল হাসেম স্যারের পরামর্শে গবেষণার কাজ শুরু করেছিলাম।’ বলছিলেন তমাল। এই গবেষণার গুরুত্ব কতখানি, সেটা তাঁর স্যারই বুঝিয়ে বলেন, ‘লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণের পদ্ধতিকে বলা হয় কিউরিং। সাধারণত সারা বিশ্বে লবণ দিয়েই প্রাথমিকভাবে চামড়া সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু চামড়া ধুয়ে ফেললে লবণের ক্লোরাইড আয়ন পরিবেশে মিশে গিয়ে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে। তমাল যে গবেষণা করছে, এটা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু সে গবেষণা থেকে ভালো ফল পেয়েছে। ওর উদ্ভাবিত পদ্ধতি কার্যকর হলে পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে চামড়া সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।’ উদ্ভিদ তেলের মাধ্যমে চামড়া সংরক্ষণের উপায় নিয়ে কাজ করছেন তমাল। গবেষণার বিস্তারিত এখনই তিনি ‘ফাঁস’ করে দিতে চান না। তবে জানালেন, এ বছরের মধ্যেই হয়তো একটা ফলাফলে পৌঁছাতে পারবেন।

শাহরুখ নূর-এ-তমাল, ছবি: সাদ্দাম হোসেন
২০১৪ সালের শুরু থেকেই গবেষণায় বুঁদ হয়ে ছিলেন তমাল। ওই বছরের শেষের দিকে খবর পান, আইইউএলটিসিএস থেকে চামড়া নিয়ে গবেষণা করার জন্য তরুণ বিজ্ঞানীদের পুরস্কার দেওয়া হয়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, গবেষণাপত্র জমা দেওয়ার সময় পার হয়ে গেছে। ওই সময় গবেষণাপত্র জমা দিতে না পারলেও কাজ চালিয়ে যান তিনি। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ফল পেতে শুরু করেন। সেপ্টেম্বর মাসে আইইউএলটিসিএস থেকে সারা বিশ্বের তরুণ গবেষকদের কাছ থেকে গবেষণাপত্র চাওয়া হলে তিনি সেখানে তাঁর গবেষণাপত্র জমা দেন। পরে এ বছর ২১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানটি থেকে ই-মেইলে জানানো হয়, গবেষণার জন্য তারা তমালকে ইয়াং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড দিচ্ছে।

তমাল বলেন, ‘আমার গবেষণার বিষয়বস্তু ভালো ছিল, তাই মনে জোরও ছিল। কিন্তু সারা বিশ্ব থেকে একজনই এই পুরস্কার পান বলে খুব বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম না। ২১ জানুয়ারি সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বিভাগীয় প্রধান ফোন করে পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টি জানান। তখনো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। নিজে মেইল দেখার পর নিশ্চিত হলাম। এরপর বিভাগে গেলাম। শিক্ষকসহ সবাই আমাকে অভিনন্দন জানালেন।’

কুয়েটের এই শিক্ষার্থীর সাফল্য ভাগাভাগি করে নিতে পারে বগুড়ার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং সিরাজগঞ্জের বিএল সরকারি হাইস্কুলও। বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার চন্দ্রকণা গ্রামে হলেও বগুড়ায় কলেজজীবন পেরিয়ে খুলনায় পা রেখেছেন তমাল। বাবা নূরুল আলম মোল্লা উপজেলার নর্থ বেঙ্গল কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মা সুমনা আলম সংসারের দেখভাল করেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে তমাল বড়।

পুরস্কার প্রাপ্তি তরুণ বিজ্ঞানীর উদ্যম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তমাল বলছিলেন, ‘ভবিষ্যতে চামড়া নিয়েই কাজ করতে চাই। আমাদের দেশে চামড়াশিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রচুর কাঁচামাল রয়েছে। কিন্তু এই সেক্টরে ব্যবহৃত অধিকাংশ প্রযুক্তি ও কেমিক্যাল বিদেশি। আমি চাই আমরা যেন দেশীয় প্রযুক্তিতেই এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে পারি।

Post A Comment: