ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে জনবহুল দেশ জার্মানি। ইউরোপের অন্যতম প্রধান শিল্পোন্নত জামার্নি ১৬টি রাজ্য নিয়ে গঠিত একটি সংযুক্ত ইউনিয়ন। এর আয়তন ৩,৫৭,০২১ বর্গকিলোমিটার এবং আয়তনের দিক থেকে দেশটি ইউরোপের ৭ম বৃহত্তম রাষ্ট্র। পরিবেশ সচেতনতায় জার্মানিদের সুনাম বিশ্ববিখ্যাত।

সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপজুড়ে শরণার্থী সংকটের মুহূর্তে জামার্নি শরণার্থীদের গ্রহণে উদারত দেখিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়েছে। সেই জামার্নে বিশ্বব্যাপী চলমান ধর্মীয় সংঘাত ও গোষ্ঠীগত দাঙ্গা নিরসনে এক অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এক ছাদের নিচে নির্মাণ করা হচ্ছে বিশ্বের প্রধান তিন ধর্মের উপাসনালয়।

বিশ্বব্যাপী যখন ধর্মীয় দ্বন্দ্ব-বিবাদ চলছে, তখন মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের মধ্যে দূরত্ব কমানোর উদ্দেশ্যে অভিনব এ ধারণাটি প্রস্তাব করেন রেভারেন্ড গ্রেগর হোবার্গ (৪৭)।

জার্মানির বার্লিন শহরে পেত্রিপালটজে নির্মিত হচ্ছে হাউজ অব ওয়ান নামের এমন অভিনব একটি উপাসনালয়। এতে থাকবে পাশাপাশি তিনটি ভবন। হাউজ অব ওয়ানের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যেন প্রতিটি ধর্মানুসারীরা পৃথক কক্ষে উপাসনা করতে পারেন।

মাঝখানেরটি মুসলমানদের ইবাদতগৃহ মসজিদ। বামেরটি খ্রিস্টানদের উপাসনালয় গির্জা। ডানেরটি ইহুদিদের উপাসনালয় সিনাগগ। নিজ নিজ প্রার্থনা সেরে এই তিন ধর্মের লোক বের হবেন যে ফটক দিয়ে, সেটা অভিন্ন। ফটকে এসে মিলবেন তিন ধর্মের মানুষ।

প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মযাজক গ্রেগর এ পরিকল্পনার অন্যতম উদ্যোক্ত। তার বিশ্বাস এ পদক্ষেপটি প্রতিধ্বনিত হবে বার্লিনের সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের শিক্ষা থেকে এ ধারণাটি নিয়েছেন গ্রেগর। যে স্থানটিতে নতুন এ উপাসনালয় নির্মিত হচ্ছে সেখানে প্রতীকী ইট হাতে নিয়ে একসঙ্গে দেখা যায় রেভারেন্ড গ্রেগর হোবার্গ, র‌্যাবাই তোভিয়া বেন-চোরিন ও ইমাম কাদির সানচিকে।

কমপ্লেক্সটি নির্মিত হলে এটিই হবে বিশ্বের প্রথম ত্রি-ধর্মের অভিন্ন উপাসনালয়। এ পরিকল্পনা এমন একটি উদ্যোগের অংশ, যার উদ্দেশ্য অভিনব ধর্মীয় যোগসূত্র স্থাপন।

এই ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদনের এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে ২০১৪ সালে। আয়োজকদের প্রত্যাশা আগামী দুই বছরের মাধ্যে ভবনটি ব্যবহারের উপযোগী হয়ে যাবে।

অনেকের কাছে এ অভিনব প্রকল্পটি মানবিক সমর্থন পেলেও সমালোচনা হচ্ছে প্রচুর। বিশেষ করে রক্ষণশীল মুসলিম সম্প্রদায় এর বিরোধীতা করছেন। 

স্থপতি উইলফ্রিড কুয়েনের নকশায় উপাসনালয়টি নির্মাণে প্রয়োজন ৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। প্রকল্পের আয়োজকরা আশাবাদী, তাদের এ প্রকল্পটি আর্থিক ও আধ্যাত্মিক যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে উৎরে যাবে।

নকশায় মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে এক পাশে বর্গাকৃতির একটি সুউচ্চ টাওয়ার রাখা হয়েছে। এই তিন ভবনের জায়গার পরিমাণ একই রাখা হয়েছে। তবে প্রার্থনার ধরন ভিন্ন হওয়ার কারণে ভেতরে আকৃতি ও অবকাঠামোর প্রকৌশলগত ভিন্নতা রাখা হয়েছে।

মসজিদ ও সিনাগগ হবে দোতলা। তবে সমান উচ্চতার ভবন হলেও গির্জা হবে একতলা। ভবন তিনটিতে মিনার কিংবা গম্বুজ থাকবে না। মসজিদের ভেতরে ওজু করার বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে।

স্থপতি উইলফ্রিড কুয়েন এ প্রসঙ্গে বলেন, আলাদা আলাদা ধর্মের প্রার্থনার কায়দা-কানুনের কথা মাথায় রেখে ভবন তিনটি ভেতরের আসবাব ও অন্যান্য অবকাঠামোর ডিজাইন করা হয়েছে।

কুয়েন বলেন, তিনি এই নকশা করতে গিয়ে তিন ধর্মের উপাসনালয় নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছেন- মসজিদে মিনার থাকা বাধ্যতামূলক নয়। গির্জা বা সিনাগগের ক্ষেত্রেও তা-ই। এ কারণে তিনি প্রাচীনকালের ডিজাইন অনুসরণ করেছেন। এর মাধ্যমে এই তিন ধর্মের সাজুয্য যথাসম্ভব উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন।

বার্লিনের মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম কাদির সানচি বলেছেন, হাউস অব ওয়ান তার কাছে ধর্মীয় মেলবন্ধনের মতো মনে হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিশ্বকে দেখানো যাবে ইসলাম ধর্ম মোটেও অসহিষ্ণু নয়। এর মাধ্যমে এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারবে।

জার্মানি এমন উদ্যোগ দেখে যুক্তরাষ্ট্রের উমাহাতেও ‘ট্রাই ফেইথ ইনিশিয়েটিভ’ নামে তিন ধর্মের এ উদ্যোগের সম্প্রতি নির্মিত একটি সিনেগগের পাশাপাশি একটি চার্চ ও একটি মসজিদ নির্মাণের প্রচেষ্টা চলছে।

Post A Comment: