পরিচয়:
কোন বিখ্যাত ব্যক্তির পরিচয় তুলে ধরার জন্য তার পদবী বা তার উপাধী উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ভিঞ্চির পরিচয় উল্লেখ করার সময় পড়তে হয় সমস্যায়। কারণ তিনি একাধারে অনেকগুলো প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে যন্ত্রবিদ, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, চিত্রশিল্পী, প্রযুক্তিবিদ, ভাস্কর, স্থপতি ও শরীরবিদ্যাবিদ। এসব প্রতিভার প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি দেখিয়েছেন সমান দক্ষতা। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির পুরো নাম লিওনার্দো দি সের পিয়েরো দা ভিঞ্চি (Leonardo di ser Piero da Vinci)। ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল ইতালির ফ্লোরেন্সের অদূরবতী ভিঞ্চী নগরের এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা ছিলেন বিত্তশালী একজন আইনজ্ঞ। আর মা ছিলেন কৃষক কন্যা।  ভিঞ্চি ছিলেন পিয়েরে দ্যা ভিঞ্চি এবং গ্রাম্য মহিলা ক্যাটরিনার অবৈধ সন্তান। ধারণা করা হয় তার মা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা একজন দাসী। লিওনার্দোর নামের দ্যা ভিঞ্চি নামের অর্থ হলো তিনি ভিঞ্চি নগর থেকে এসেছেন এবং লিওনার্দো দি সের পিয়েরো দা ভিঞ্চি এর অর্থ হলো পিয়েরোর পুত্র লিওনার্দো এবং তার জন্ম ভিঞ্চিতে।

প্রথমিক জীবন:
লিওনার্দোর প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে জানা গেছে খুবই অল্প। জীবনের প্রথম ৫ বছর কেটেছে আনসিয়ানোর একটি ছোট্ট গ্রামে। এরপর তিনি চলে যান ফ্রান্সিসকোতে। সেখানে তিনি তান বাবা, দাদা-দাদী ও চাচার সাথে থাকেন। এসময় তার বাবা অ্যালবিরা নামের ১৬ বছর বয়সী এক তরুণীকে বিয়ে করেন। অ্যালবিরা লিওনার্দোকে অনেক ভালবাসত। কিন্তু অল্প বয়সেই তার মৃত্যু হয়। কৈশর জীবন সম্পর্কে লিওনার্দোর লেখা দুটি ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রথম টি হল—একবার একটি ঘুড়ি হঠাৎ করে আকাশ থেকে নেমে তার দোলনার উপর দিয়ে যাবার সময় তার মুখে এর লেজের পালক বুলিয়ে যায়। লোকজন এই ঘটনাকে তার ভবিষ্যত জীবনের সফলতার লক্ষণ হিসেবেই ধরে নিয়েছিল। দ্বিতীয় ঘটনা হল—তিনি ছোটবেলায় একবার এক পাহাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি একটা গুহা আবিষ্কার করেছিলেন। গুহাটা ছিল অন্ধকার আর ভুতুড়ে। তার মনে হচ্ছিল গুহার ভিতরে নিশ্চয় কোন অতিকায় দৈত্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু তার অদম্য কৌতূহলের কারনে এই গুহায় কি আছে তা খুঁজে দেখেছিলেন। আদালতের নথি থেকে দেখা যায় ভিঞ্চির বয়স যখন ২৪ তখন আরও ৩ জন পুরুষ সঙ্গীসহ তাঁকে সমকামিতার (sodomy) দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। যদিও প্রমাণ না পাওয়ায় তাদেরকে পরে অব্যহতি দেওয়া হয়। তবে দ্যা ভিঞ্চির জার্নাল থেকে দেখা যায় এ ঘটনা প্রকাশিত হওয়ায় তিনি বেশ বিচলিত হয়ে পড়েন। কারণ তিনি নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপার গোপন রাখতে পছন্দ করতেন। আর তার ওপর এ অপরাধ প্রমাণিত হলে তার মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারতো। এ অভিযোগ উঠিয়ে নেবার পর তিনি ফ্লোরেন্স থেকে মিলানে চলে আসেন।
১৩ শতকের শেষ থেকে ১৬ শতক পর্যন্ত ছিল ইটালিয়ান রেনেসার যুগ। এসময়ে সমগ্র ইউরোপ বিশেষ করে ইটালি ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রত্যেকটি শাখার উন্নতির চরম শিখরে। ভিঞ্চি ছিলেন সেই সময়ের একজন মেধাবী মানুষ।

শিক্ষা-দীক্ষা:
ভিঞ্চি কোন রকম আনুষ্ঠানিক লেখাপড়া গ্রহণ করেননি। তার লেখাপড়ার সবকিছুই ঘরোয়াভাবে। তার ছিল প্রকৃতির প্রতি ভীষণ টান। এজন্য তিনি বেশিরভা্গ সময় বাইরে বাইরে কাটাতে পছন্দ করতেন। ১৪৬৬ সালে লিওনার্দোর বয়স যখন ১৪ তখন তাকে ডেল ভেরোচ্চির (Verrocchio) কাছে শিক্ষানবিশ হিসেবে পাঠানো হয়্ এরপর দ্রুতই তার প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। বলা হয়ে থাকে ভিঞ্চির “দা ব্যাপ্টিজম অফ ক্রাইস্ট” এতটাই সুনিপুণ হয় যে তা দেখার পর ভেরোচ্চি জীবনের জন্য আঁকা ছেড়ে দেবার পণ করেন।

পেশাগত জীবন:
সমকামীতার অভযোগে গ্রেফতার হয়ে বেকসুর খালাস লাভের পর ভিঞ্চি ফ্লোরেন্স থেকে মিলানে চলে আসেন। এরপর ১৪৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি কি করেছেন, কোথায় ছিলেন তার কিছুই জানা যায় না। ধারণা করা হয় এই সময়ে তিনি ১৪৭৮ থেকে ১৪৮১ পর্যন্ত তার নিজের ওয়ার্কশপে কাজ করেছেন। এরপর ১৪৭৮ সালে চ্যাপেল অব সেন্ট বার্নার্ড ও অ্যাডোরেশন অব দি ম্যাগি এবং ১৪৮১ সালে মঙ্ক অব সান ডোনাটো এ স্কাপিটো (Monks of San Donato a Scopeto) এর জন্য “দ্যা এ্যডোরেশন অভ দ্যা ম্যাগী” আঁকার কাজ পান।
ভাসারির মতে লিওনার্দো সে সময়ের সেরা সংগীতজ্ঞ ছিলেন। ১৪৮২ সালে তিনি ঘোড়ার মাথার আকৃতির একটি বীণা তৈরি করেছিলেন। এর নাম ছিল লরেঞ্জো দ্যা মেডসি (Lorenzo de’ Medici) যা তিনি মিলানের ডিউক লুদোভিকো এল মোরো এর কাছে শান্তিচুক্তি নিশ্চিত করার জন্য।
লিওনার্দো ১৪৮২ থেকে ১৪৯৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মিলানে কাজ করেছেন। এখানে তিনি Confraternity of the Immaculate Conception এর জন্য “ভার্জিন অব দ্যা রকস” এবং “Santa Maria delle Grazie” আশ্রমের জন্য “দ্যা লাস্ট সাপার”  ছবি দুটি আঁকার দায়িত্ব পান। ১৪৯৩ থেকে ১৪৯৫ এর মধ্যে তার অধিনস্তদের মাঝে ক্যাটরিনা নামে এক মহিলার নাম পাওয়া যায়। ১৪৯৫ সালে এ মহিলাটি মারা যান। সে সময় তার শেষকৃত্যের খরচ দেখে ধারণা করা হয় তিনি ছিলেন লিওনার্দোর মা।

প্রকৌশল এবং উদ্ভাবন
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি তার জীবদ্দশায় প্রকৌশলী হিসেবে অনেক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। লুভোডিকো মুরো নামক এক ব্যক্তিকে তিনি এক চিঠি দিয়ে দাবি করেছিলেন যে তিনি একটি শহরের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার জন্য সয়ংক্রিয় কিছু যন্ত্র আবিষ্কারে সক্ষম হয়েছেন। যখন তিনি ভেনিসে স্থানান্তরিত হলেন তখন সেখানে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে চাকরি পান। সেখানে তিনি শহরকে বহিরাগত আক্রমন থেকে রক্ষার জন্য একটি স্থানান্তরযোগ্য ব্যারিকেড তৈরিতে সক্ষম হন। লিওনার্দো তাঁর ডায়েরিতে বিভিন্ন বাস্তব এবং অবাস্তব যন্ত্রের বর্ণনা দিয়েছিলেন। যার মধ্যে রয়েছে নানা রকম বাদ্যযন্ত্র, একটি যান্ত্রিক সৈন্য, হাইড্রোলিক পাম্প, ডানার মর্টার শেল এবং একটি বাষ্প কামান।
তিনি তাঁর জীবনের একটি বড় সময় উড়তে সক্ষম যন্ত্র তৈরিতে ব্যায় করেন। তাঁরই প্রদত্ত ডিজাইনে বর্তমানে আধুনিক বিমান এবং হেলিকপ্টার নির্মান করা সম্ভব হয়েছে।
১৫ শতকের শেষ দিকের বিখ্যাত ব্যক্তি Ludovico Sforza ছিলেন জ্ঞানচর্চার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। তিনি মিলানে একটি দূর্গ দখল করেন। সেখানে তিনি শহরের বিখ্যাত শিল্পী, সাহিত্যিক, স্থাপতি, বৈজ্ঞানিক, চিত্রশিল্পী, দার্শনিকদের তার দূর্গে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তার আমন্ত্রণে লিওনার্দো ১৪৮২ সালে তার দূর্গে আসেন। এখানে তিনি একটানা ১৭ বছর কাজ করেন। এই সময়ে তিনি বিখ্যাত গণিতবিদ Luca Pacioli এর সাথে বিজ্ঞান ও গণিত নিয়ে গবেষণা করেন।

বিখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা ও দ্যা লাস্ট সাপার:
বাঁকা চোখের চাহনি ,চাপা হাসি আসি আর রহস্যে ভরা মুখশ্রী যে নারী সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ছুয়েছে তার নাম অপরূপা মোনালিসা। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি এই ধরাধাম ছেড়ে যাওয়ার ঠিক এক যুগ আগেই আপন হাতের তুলি সুনিপুন টানে ক্যানভাসে আঁকেন মোনালিসা। দীর্ঘ চার বছরের সাধনা আর অধ্যবসায়ের ফসল হল এই চিত্র কর্মটি ।লিওনার্দো কাজটা শুরু করেছিলেন ১৫০৩ সালে আর ইতি টানেন ১৫০৭ এ এসে। অনেকে তো বলেন প্রায় কথায় কথায় যে মোনালিসার হাসি নিয়ে যে পরিমাণ গবেষণা হয়েছে তা দিয়ে একটা মহাকাব্য লিখা যাবে অতি সহজেই। শুধু হাসিতে নয় নামের ব্যাপারটাতেও অনেকের ধাঁধা লেগে যায়।কেউ বলে লাজাকান্দো আবার কেউ বলে মোনালিসা। তবে আর যাই হোক মোনালিসা নামেই তার পরিচিতি টা একটু বেশী। "মোনালিসা" তৈরির সময় সাদা ক্যানভাসের উপরে বিভিন্ন স্তর তৈরির জটিল পদ্ধতি ব্যবহার করেন লিওনার্দো। আর এতে তিনি এতটাই দক্ষ আর সফল ছিলেন যে পরবর্তিতে আর কেউই এই পদ্ধতিতে সমানভাবে সফল হয়নি। বিভিন্ন অনুপাতের মিশ্রনের তৈলাক্ত স্তর ব্যবহার করে কাজটি করেন লিওনার্দো। এতে বিভিন্ন স্তরে আলাদা আলাদা ভাবে রং মিশিয়ে তিনি ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন "মোনালিসা" এর । শুধু মোনালিসাই নয় আরও বেশ কয়েকটি চিত্রকর্মে লিওনার্দো এই একই পদ্ধতি ব্যবহার করে গেছেন। শিল্পজগতে লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির এই কাজগুলো আজও সমান ভাবে রহস্যময় এবং শ্রেষ্ঠ।
 
 
 
 
 
‘দ্যা লাস্ট সাপার’ দেয়ালচিত্রটি ৪৫০×৮৭০ সেন্টিমিটার আকারের। এটি শোভা পাচ্ছে ইতালির মিলানের সান্তা মারিয়া দেল গ্রেজির ডায়নিং হলের পিছনের দেয়ালে। ছবিটির প্রাথমিক বিষয়বস্তু হলেন যিশুখ্রিষ্ট ও তাঁর বারোজন শিষ্য একত্রে নৈশভোজ সারছেন। খ্রিষ্টীয় ধারণানুযায়ী যিশুখ্রিষ্ট তাঁর বারোজন শিষ্যকে নিয়ে মৃত্যুর আগে যে শেষ নৈশভোজ সারেন তাই যিশুর শেষ নৈশভোজ নামে পরিচিত। এই ভোজে যিশু তাঁর বারোজন শিষ্যকে নিয়ে মদ পান করেন ও রুটি খান। নৈশভোজে যিশু ঘোষণা করেন এই শিষ্যদেরই একজন পরদিন তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। আলোচ্য চিত্রে ফুটে ওঠেছে যিশু তার শিষ্যদেরকে এই কথাটি বলছেন আর তাঁরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে কে সে বিশ্বাসঘাতক।
ছবিতে যিশুর বারোজন শিষ্যকে তিনজনের একেকটা দলে ভাগ করে উপস্থাপন করা হয়েছে আর যিশুকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন যিশু সম্পূর্ণ মাঝখানে আলাদাভাবে উপস্থাপিত হয়েছেন। এই চিত্রটি তেরোজন পুরুষের একটি চিত্রকর্ম। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এ ছবিতে যিশুর মুখ ফুটিয়ে তোলার জন্য দীর্ঘ সময় নিয়েছিলেন বলে শোনা যায় যাতে যিশুর মুখে অভিব্যক্তিহীন একটা আবহ ফুটিয়ে তোলা যায়।
 
সেপ্টেম্বর ১৫১৩ থেকে ১৫১৬ পর্যন্ত অধিকাংশ সময় তিনি রোমে দশম পোপ এর অধীনে কাটিয়েছিলেন। অক্টোবর ১৫, ১৫১৫ তে যখন রাজা ফ্রান্সিস-১ম মিলান দখল করলেন তখন লিওনার্দো তার অধীনে কাজ শুরু করেন। তিনি তখন রাজার বাসভবনের পাশেই "ক্লস লুইস" নামক ভবনে বসবাস করতে শুরু করলেন যেখানে তিনি তার জীবনের পরবর্তী ৩ বছর অতিবাহিত করেন। ২রা মে ১৫১৯ এ লিওনার্দো এই "ক্লস লুইস" ভবনে মৃত্যু বরণ করেন।

লিওনার্দোর আঁকা মানুষের মুখের গোল্ডেন রেশিও।


 

Post A Comment: