তারেক মাসুদ
তারেক মাসুদ
Decrease font Enlarge font
আগামী ৬ ডিসেম্বর অকালপ্রয়াত গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের জন্মদিন। চলচ্চিত্রে সুদিন ফেরাতে আজীবন লড়াই করেছেন তিনি। সংগ্রামী ও পরিশ্রমী এই মানুষটি বেঁচে থাকবেন তার কর্মে। তার কালজয়ী সৃষ্টি তাকে বাঁচিয়ে রাখবে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে।

তারেক মাসুদ চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন দেশে-বিদেশে। বক্তা হিসেবেও তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। তাকে নিয়ে তরুণ নির্মাতাদের মধ্যে আগ্রহ প্রচুর। যে মানুষটি নির্মাতা হিসেবে এতো সফল, যার এতো অনুসারী, যার ছবি জয় করেছে বিশ্ব- তারও নিশ্চয়ই কিছু সীমাবদ্ধতা ছিলো। জীবদ্দশায় একাধিক সাক্ষাৎকারে চলচ্চিত্রকার হিসেবে নিজের কিছু সীমাদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন তিনি।

বিখ্যাত অনেক চলচ্চিত্রে গল্পের খাতিরেই ভায়োলেন্স বা সেক্স (নৃশংসতা বা যৌনতা) ‍উঠে এসেছে নানাভাবে। কিন্তু বিশ্বমানের নির্মাতা হয়েও তারেক মাসুদ তার ছবিতে এ দুটি বিষয় তুলে ধরেননি বা এড়িয়ে গেছেন। এক কথায়, নৃশংসতা ও যৌনতা প্রকাশে ছিলো তার অনাগ্রহ ও আপত্তি। অবশ্য নৃশংসতা সিনেমায় তুলে না ধরার বিষয়টিকে তিনি ব্যক্তিগত অক্ষমতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সত্যি কী তাই? নাকি অন্য কোনো কারণ ছিলো?

ছবিতে নৃশংসতা রাখা না রাখার ব্যাপারে তারেক মাসুদ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমরা যারা সৃজনশীল ছবি বানাতে চেষ্টা করি, তাদের ফিল্মে ভায়োলেন্স যে আসে না, তা না, কিন্তু তার ট্রিটমেন্ট হয় ভিন্ন। যেমন যদি আমি আমার ছবি ‘মাটির ময়না’র কথা বলি। পুরো ছবিটা বেসিক্যালি ভায়োলেন্স নিয়ে। ছবির বিষয়বস্তুই যদি দেখি, নানাভাবে ভায়োলেন্স আছে, ওয়ার ইজ দ্য ব্যাকড্রপ। ছবির মধ্যে নানাভাবে ব্রুটালিটি আছে।… একজন নির্মাতা হয়তো ভায়োলেন্স না দেখিয়ে ভায়োলেন্ট একটা অ্যামবিয়েন্ট তৈরি করছে। এটা তার কাছে অনেক বেশি অর্থবহ যে গ্রাফিক ওয়েতে ভায়োলেন্স দেখাবো না, কিন্তু আমি ক্রিয়েট এ সেন্স অব ভায়োলেন্স। ‘মাটির ময়না’ ছবিতে ভায়োলেন্স মোর অ্যাসথেটিক্যালি এসেছে। এসথেটিক এ অর্থে যে, ইটস মাচ মোর ক্রিয়েটিভলি চ্যালেঞ্জিং টু শো ভায়োলেন্স উইদাউট শোয়িং ভায়োলেন্স। ইন্ডিপেনডেন্ট সিনেমার ক্ষেত্রে ফর্মুলা ট্রিটমেন্টের জায়গায় ইনডিভিজ্যুয়াল টেম্পারমেন্ট কাজ করে।…আমি আসলে ভায়োলেন্স জিনিসটা ব্যক্তিজীবনে নিতে পারি না। আই হ্যাভ মাই ওন হিস্ট্রি। সে কারণে আমি ভায়োলেন্স নিতে পারি না।…আই অ্যাম সো মাচ অ্যাফেক্টেড বাই ভায়োলেন্ট সিন। একটা ভার্চুয়াল ভায়োলেন্স, যেটা আসলে অ্যাকচুয়াল ভায়োলেন্স না, তা-ও আমি নিতে পারি না।’

ব্যক্তিগত জীবনের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন,‘অনেক সময় এমন হয়েছে, কোনো একটা দুর্ঘটনা হয়েছে, কারও রক্ত ঝরছে, আমি সেখান থেকে পালিয়ে চলে গেছি। এই যে আমার ব্যক্তিগত জিনিসটা রয়েছে, সেটাও এখানে সম্পৃক্ত। ‘মাটির ময়না’য় অনেক ভায়োলেন্ট দৃশ্যের সুযোগ ছিল, যখন গরু জবাই দেওয়া হচ্ছে, প্রাসঙ্গিকভাবেই ওখানে স্লটারিংটা দেখানো যেতে পারত, কিন্তু ওখানে শুধু পোস্ট-স্লটারিং রক্তভেজা ছুরিটা দেখা যাচ্ছে। চড়ক খুবই ভায়োলেন্ট ব্যাপার, আমাদের ক্লোজআপ ছিল, বিশাল বড়শি দিয়ে গাঁথা চামড়া, সেটা কিন্তু আমার টেম্পারমেন্টের কারণে ওই ভায়োলেন্ট সিন আমি ব্যবহার করবো না।’

যৌনতার ব্যাপারে তারেক মাসুদ একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “সিনেমায় যুদ্ধ ও যৌনতার মতো জিনিস দু’ভাবে এসেছে। পুঁজি হিসেবে আর উপজীব্য হিসেবে। পুঁজি হিসেবেই বেশি দেখি আমরা। সিনেমা তো শুধু আর্ট নয়, এটা একটা ইন্ডাস্ট্রি, বিপণনযোগ্য জিনিস। এটাকে প্রথমে স্বীকার করে নিতে হবে। …এর একটা মাধ্যমগত অ্যাডভান্টেজ আছে, বিকজ বোথ আর ভিজ্যুয়ালি এক্সপ্লয়টেবল, পজিটিভ সেন্সেই বলছি, ভীষণ এক্সপ্লয়টেবল এলিমেন্টস অব লাইফ। এই দুটোই আমাদের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। …জীবনের একটা বিশাল অংশ এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো যৌনতা। সেটা আমার ছবিতে প্রায় শতভাগ অনুপস্থিত। নির্মাতা হিসেবে মনে করি, এটা একধরনের অসম্ভব সীমাবদ্ধতা, অসম্পূর্ণতা এবং অক্ষমতা।’

তারেক মাসুদ মনে করতেন, বিকল্প ছবি বানাতে হলে শুধু বিকল্প প্রদর্শনী হলে হবে না, বিকল্প বিষয়বস্তু নিয়ে আসতে হবে। তিনি বলে গেছেন, ‘যৌনতা শুধু ব্যক্তিগত নয়, পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রিক জীবনেও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা আমি নিজেই আত্মসমালোচনা করবো। আমাদের এ ব্যাপারে সাহসী হতে হবে এবং আরও বেশি সচেতন হতে হবে। যুদ্ধের মধ্যে যেমন রাজনীতি থাকে, যৌনতাও তেমনি একটি বিরাট রাজনীতির অংশ। একজন শিল্পী হিসেবে, নির্মাতা হিসেবে আমি বলব সেক্সুয়ালিটি অলমোস্ট অ্যামাউন্ট টু দ্য ইমপরট্যান্স অব ওয়ার বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন সোশ্যাল ইনজাস্টিস, পারসিকিউটেড প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—এগুলো যদি সিনেমার জরুরি বিষয় হয়, তবে যৌনতাও খুব জরুরি বিষয়।’

Post A Comment: