সাধারণ পরিচিতি:
মার্টিন লুথার কিং বা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র একজন আফ্রিকান-আমেরিকান মানবাধিকার কর্মী।  যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর ইতিহাসে যে সব ব্যক্তি নির্যাতিত, অত্যাচারিত নিপীড়িত আর অধিকার বঞ্চিত মানুষদের জন্যে সংগ্রাম করে গেছেন, সেই সংগ্রামে নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছেন মার্টিন লুথার কিং তাদের মধ্যে অন্যতম। মার্টিন লুথার কিং ই প্রথম মানুষ যে আমেরিকায় কালো মানুষদের প্রতি বৈষম্যের জন্যে প্রতিবাদ শুরু করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নির্যাতিত মানুষের জন্যে লড়াই করে গেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার জর্জিয়ায় ১৫ই জানুয়ারি, ১৯২৯ জন্ম গ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মার্টিন লুথার কিং সিনিয়র এবং মা আলবার্ট উইলিয়ামস কিং।  জন্মের সময় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল মাইকেল লুথার কিং, পরবর্তীতে কিশোর বয়সে এই নাম পালটে তিনি নিজেই বাবার নামানুসারে তার নতুন নাম রাখেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। তিনি ছিলেন একাধারে আমেরিকান ব্যাপটিস্ট মন্ত্রী,মানবাধিকার কর্মীএ,বং আফ্রিকান-আমেরিকান সিভিল রাইটস মুভমেন্ট এর নেতা। তিনি তার খৃস্টান বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে তার ভূমিকার জন্য বেশি পরিচিত। তিনি ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি হতে আমৃত্যু আমেরিকার সিভিল রাইট মুভমেন্ট এর নেতা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল একজন শ্বেতাঙ্গ উগ্রপন্থী যুবক জেমস আর্ল রে দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
শিক্ষাজীবন:
মার্টিন লুথার কিং যে কোন এলেবেলে ধরনের ছেলে ছিলেন না, তা তাঁর কিশোর বয়স থেকেই বুঝা গিয়েছিল। তার যখন ৬ বছর বয়স তখন মার্টিন লুথার কিং এর সাথে এক সাদা বালকের বন্ধুত্ব হয় যার বাবা ছিল একজন ব্যবসায়ী। কিন্তু স্কুলে ভর্তি হবার পর তার বাবা আর তাকে কিং এর সাথে মিশতে দেয়নি। এজন্য কিং মানসিকভাবে খুবই হতাশ ছিলেন। আটলান্টার বুকার টি ওয়াশিংটন হাইস্কুলে তার স্কুল জীবন শুরু। কালো চামড়ার ছিলেন বলে তাকে কালোদের জন্য নির্দিষ্ট স্কুলে তাকে যেতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি এতটাই মেধাবী ছিলেন যে তাকে ক্লাস নাইন ও ক্লাস টুয়েলভ পড়তেই হয়নি। দুইবার অটো-প্রমোশন পেয়ে ১৯৪৮ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে মোর-হাউজ কলেজ থেকে সমাজ বিজ্ঞান এর উপর স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর ১৯৫৫ সালে বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে দর্শন শাস্ত্রে পিএইচডি, ডক্টর অব ফিলোসোফি ডিগ্রি লাভ করেন।

লুথার কিং এর সংগ্রামী কর্মজীবন:
কর্মজীবনের শুরুতে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র মানবাধিকার কর্মী ছিলেন। নাগরিক অধিকার রক্ষাই তার উদ্দেশ্য ছিল। আমেরিকার সিভিল রাইট নেতা হাওয়ার্ডস থমসন এবং ভারতের নন ভায়োলেন্স এর জনক মহাত্মা গান্ধীর মতবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে কিং অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে আমৃত্যু এই সংগঠনটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। গান্ধীজীর সত্যাগ্রহ তাঁকে খুব বেশী অনুপ্রাণিত করেছিল। লুথার কিং গান্ধীজীর সত্যাগ্রহে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৫৯ সালে গান্ধীর জন্মস্থান ভারত সফর করেন। ১৯৫৭ সালে রেফ এবারনেথি এবং অন্যান্য সিভিল রাইট নেতাদের সহযোগিতায় স্থাপন করেন সাউদার্ন লিডারশীপ কনফারেন্স। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তাদের নৈতিক চরিত্র গঠন নিশ্চিত করাও ছিল এই সংগঠনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রই প্রথম মানুষ যে আমেরিকায় কালো মানুষদের প্রতি বৈষম্যের জন্যে প্রতিবাদ শুরু করেন। একটা সময় আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের সাথে চরম বৈষম্য করা হতো। সাদা মানুষ বাসে উঠলে কালো মানুষদের সিট ছেড়ে দিতে হত। মূলত এই ইস্যুকে কেন্দ্র করেই তার সত্যিকারের সিভিল রাইট মুভমেন্ট শুরু হয় ১৯৫৫ সালে। ১৯৫৫ সালের ১লি ডিসেম্বর তারিখে মিসেস রোজা পার্কস নামের আফ্রিকান-আমেরিকান এক ভদ্র মহিলা বাসে শ্বেতাঙ্গ মানুষকে সিট ছেড়ে না দেওয়াতে তাকে গ্রেফতার করে হাজতে নিয়ে যায় পুলিশ। এই ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে তারা মন্টোগমারীতে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন।  মার্টিন মহাত্মা গান্ধীর অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের প্রক্রিয়া সমর্থন করে ঐ বাস সার্ভিস সমস্ত কালোদের জন্য বয়কটের সিদ্ধান্ত নেন। এতে বাসে না চড়ে পায়ে হেঁটে, কেউবা নিজের গাড়ী চালিয়ে অফিসে যাওয়া আসা করতে থাকেন। এভাবে চলে ৩৮১ দিন। ফলে আলবামা শহরে বাসে বর্ণ ভেদাভেদ নিষিদ্ধ করা হয়।
১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে কৃষ্ণাঙ্গদের অর্থনৈতিক মুক্তি, চাকরির সমতা অর্জন এবং সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লুথার কিং, বেয়ারড রাস্তিন এবং আরও ছয়টি সংগঠনের সহায়তায় মার্চ অন ওয়াশিংটন ফর জব এন্ড ফ্রিডম (March On Washington for Job and Freedom.) নামে এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করেন। এই সমাবেশটি ছিলো আমেরিকার ইতিহাসে সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ মহা-সমাবেশ। এই সমাবেশে যোগ দেবার জন্য অসংখ্য মানুষ ২০০০ টি বাস, ২১ টি স্পেশাল ট্রেন, ১০ টি এয়ারলাইন্স এর সকল ফ্লাইট ও অসংখ্য গাড়িতে করে ওয়াশিংটনে এসেছিল। সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল লিঙ্কন মেমোরিয়ালে। প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষের সমাবেশ হয়েছিল ঐ মহা-সমাবেশে। “I Have a Dream”('আই হ্যাভ এ ড্রিম') নামে লিংকন মেমোরিয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে দেয়া সেই বিখ্যাত ভাষণ বিশ্বের সর্বকালের সেরা বাগ্মিতার দৃষ্টান্তগুলোর অন্যতম হয়ে আছে। সেই সমাবেশে প্রধান বক্তা ছিলেন দশ জন, তার মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন জন লুইস – মার্টিন লুথার কিং য়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
আমেরিকার ভিয়েতনাম যুদ্ধের তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। ছিলেন দারিদ্র্যমুক্তি আন্দোলনের নেতা। আজ বিশ্বে তাঁর স্থান মানবাধিকারের কিংবদন্তি হিসেবে। সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সম্মান তাঁরই। অমর তাঁর মহান সংগ্রাম। একইভাবে অমর তাঁর ঐতিহাসিক বক্তৃতা ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’।

রাজনৈতিক জীবন ও ঐতিহাসিক সেই ভাষণ-(‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’):
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র তার বক্তৃতার মাধ্যমে ঘোষণা দেন জাতিগত বৈষম্যের দিন শেষ করার। তিনি তার ভাষণে শ্বেতাঙ্গদের কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর নির্যাতন ও বঞ্চনার আর বৈষম্যমূলক আচরণের কথা তুলে ধরন। তার ভাষণটি ছিল এরকম—
এই দিনে আমি আপনাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে খুশি। ইতিহাস এই দিনটি মনে রাখবে, আমাদের জাতির ইতিহাসে মুক্তির মহান সমাবেশ হিসেবে।
কিন্তু ১০০ বছর পর মর্মান্তিক সত্য হচ্ছে, নিগ্রো আজও মুক্ত নয়। শতবর্ষ পরও নিগ্রোরা আজও দুঃখজনক ভাবে বিচ্ছিন্নতার শেকলে আর বৈষম্যের জিঞ্জিরে বাঁধা। শতবর্ষ পরও নিগ্রোদের জীবন যেন ধন-সম্পদের বিরাট সমুদ্রের মাঝখানে এক নিঃসঙ্গ দারিদ্র্যের দ্বীপ। শতবর্ষ পরও নিগ্রোরা মার্কিন সমাজের এক কোণে নির্জীব দশায় পড়ে আছে, হয়ে আছে নিজভূমে নির্বাসিত। তাই আজ আমরা এখানে আমাদের দুর্দশাকে তুলে ধরতে এসেছি।
এক অর্থে আমরা আমাদের রাজধানীতে এসেছি একটা চেক ভাঙাতে। আমাদের প্রজাতন্ত্রের স্থপতিরা যখন সংবিধানের সেই দারুণ কথাগুলো লিখছিলেন এবং দিয়েছিলেন স্বাধীনতার ঘোষণা, তখন তাঁরা এমন এক চেকে সই করছিলেন, প্রতিটি আমেরিকান যার উত্তরাধিকারী। সেটা ছিল সব মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অধিকার, মুক্তি ও সুখ সন্ধানের নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতি।
আজ পরিষ্কার হয়ে গেছে, আমেরিকা সেই প্রতিশ্রুতিপত্র খেলাপ করেছে, অন্তত তার কালো নাগরিকদের বেলায়। সেই পবিত্র দায়িত্ব মান্য করার বদলে আমেরিকা নিগ্রো মানুষদের হাতে যে চেক ধরিয়ে দিয়েছে, তা ফেরত এসেছে, ‘তহবিল ঘাটতি’র চিহ্ন নিয়ে। কিন্তু ন্যায়বিচারের ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে—এ আমরা বিশ্বাস করতে রাজি না।
আমরা মানতে রাজি না, এই জাতির সুযোগ ও সম্ভাবনার সিন্দুকে যথেষ্ট তহবিল নেই। তাই যে চেক চাইবা মাত্র মুক্তির দৌলত আর ন্যায়বিচারের নিরাপত্তা দেবে, আজ আমরা এসেছি সেই চেক ভাঙাতে। এখনই সময় ঈশ্বরের সব সন্তানের জন্য সুযোগের সব দ্বার অবারিত করে দেওয়ার। এখনই সময় বর্ণবৈষম্যের চোরাবালি থেকে আমাদের জাতিকে ভ্রাতৃত্ব-বন্ধনের পাথুরে জমিতে তুলে ধরার।
যত দিন না নিগ্রোরা তাদের নাগরিক অধিকার ভোগ করতে পারবে, তত দিন আমেরিকায় বিরাম ও শান্তি থাকবে না। যত দিন না ন্যায়ের সুদীপ্ত দিন আসছে, তত দিন বিদ্রোহের ঘূর্ণিঝড় আমেরিকার ভিতকে কাঁপিয়ে দিতে থাকবে।
বন্ধুরা, আজ আমি আপনাদের বলছি, বর্তমানের প্রতিকূলতা ও বাধা সত্ত্বেও আমি আজও স্বপ্ন দেখি। আমার এই স্বপ্নের শেকড় পোঁতা আমেরিকান স্বপ্নের গভীরে।
আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন এই জাতি জাগবে এবং বাঁচিয়ে রাখবে এই বিশ্বাস আমরা এই সত্যকে স্বতঃসিদ্ধভাবে গ্রহণ করছি সব মানুষ সমান।
আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন জর্জিয়ার লাল পাহাড়ে সাবেক দাস আর সাবেক দাস মালিকের সন্তানেরা ভ্রাতৃত্বের এক টেবিলে বসতে সক্ষম হবে।
আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন মরুময় মিসিসিপি রাজ্য অবিচার আর নিপীড়নের উত্তাপে দম বন্ধ করা মিসিসিপি হয়ে উঠবে মুক্তি আর সুবিচারের মরূদ্যান।
আমি স্বপ্ন দেখি, আমার চার সন্তান একদিন এমন এক জাতির মধ্যে বাস করবে যেখানে তাদের চামড়ার রং দিয়ে নয়, তাদের চরিত্রের গুণ দিয়ে তারা মূল্যায়িত হবে। আমি আজ এই স্বপ্ন দেখি।
আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন অ্যালাব্যামা রাজ্যে, যেখানকার গভর্নরের ঠোঁট থেকে কেবলই বাধানিষেধ আর গঞ্জনার বাণী ঝরে, একদিন সেখানকার পরিস্থিতি এমনভাবে বদলে যাবে যে কালো বালক আর বালিকারা সাদা বালক আর বালিকাদের সঙ্গে ভাইবোনের মতো হাত ধরাধরি করবে। আমি আজ এই স্বপ্ন দেখি।
আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন সব উপত্যকা উত্তীর্ণ হবে, সব পাহাড় আর পর্বত হবে আনত, এবড়ো-খেবড়ো জমিন মসৃণ হবে, আঁকাবাঁকা জায়গাগুলো সমান হবে এবং ঈশ্বরের জয় উদ্ভাসিত হবে এবং একসঙ্গে সব মানব তা চাক্ষুষ করবে।
এই-ই আমাদের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন নিয়েই আমি দক্ষিণে ফিরে যাব। এই বিশ্বাস নিয়ে হতাশার পর্বত থেকে আমরা সৃষ্টি করব আশার প্রস্তর। এই বিশ্বাস নিয়ে আমরা আজকের এই বেসুরো কোলাহল থেকে জন্ম দেব ভ্রাতৃ বন্ধনের সুন্দরতম সংগীতের। এই বিশ্বাস নিয়ে আমরা একসঙ্গে কাজ করব, প্রার্থনায় মিলব একত্রে, একদিন আমরা মুক্ত হব এই জেনে, একসঙ্গে শামিল হব সংগ্রামে।
সেটা হবে সেই দিন, যে দিন ঈশ্বরের সন্তানেরা গাইতে পারবে গান, ভাষায় দেবে নতুন অর্থ: ‘ও আমার দেশ, তুমি তো মুক্তির স্নিগ্ধ ভূমি। যে মাটিতে আমার পিতারা শায়িত, যে মাটি তীর্থযাত্রীদের গরিমা, তার প্রতিটি পাহাড়ের ঢাল থেকে বেজে উঠুক মুক্তির গান।’
এবং আমেরিকাকে মহান এক দেশ হতে হলে এটাই সত্য হতে হবে। তাই মুক্তি ধ্বনিত হোক নিউ হ্যাম্পশায়ারের বিপুল পাহাড়চূড়া থেকে। মুক্তি ধ্বনিত হোক নিউইয়র্কের শক্তিমান পাহাড়গুলো থেকে। মুক্তি ধ্বনিত হোক পেনসিলভানিয়ার ওই আকাশছোঁয়া আলেঘেনির শীর্ষ থেকে।
মুক্তি ধ্বনিত হোক কলোরাডোর তুষার মোড়া পাহাড় থেকে।
মুক্তি ধ্বনিত হোক ক্যালিফোর্নিয়ার বঙ্কিম চূড়া থেকে!
শুধু তা-ই নয়, মুক্তি ধ্বনিত হোক জর্জিয়ার স্টোন মাউন্টেইন থেকেও!
মুক্তি ধ্বনিত হোক টেনেসির লুকআউট পাহাড় থেকে!
মুক্তি ধ্বনিত হোক মিসিসিপির প্রতিটি টিলা ও পাহাড় থেকে। প্রতিটি পাহাড়ের খাঁজ থেকে বেজে উঠুক মুক্তির গান।
যখন আমরা মুক্তিকে ধ্বনিত হতে দেব যখন প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি বসতি, প্রতিটি রাজ্য এবং শহরে বাজবে মুক্তির গান তখন আমরা সেই দিনকে আরও কাছে নিয়ে আসতে পারব, যেদিন কালো মানুষ ও সাদা মানুষ, ইহুদি ও জেন্টাইল, প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক—সবাই হাতে হাত ধরে গাইবে সেই নিগ্রো মরমি সংগীত ‘এত দিনে আমরা মুক্ত হলাম! এত দিনে পেলাম মুক্তি! ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর, তোমাকে ধন্যবাদ, আমরা আজ মুক্ত!’ ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কোনো প্রাপ্তি নেই যতক্ষণ নিগ্রোরা পুলিশের বর্ণনাতীত নির্যাতনের শিকার হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কোনো প্রাপ্তি নেই যতক্ষণ ভ্রমণ-ক্লান্ত নিগ্রোরা শহরের হোটেল বা মোটেলে বিশ্রামের অধিকার পাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের প্রাপ্তি নেই যতক্ষণ আমাদের শিশুরা 'কেবলমাত্র শ্বেতাঙ্গদের জন্য' লেখা সাইনবোর্ড দেখবে। আমি জানি, তোমরা কেউ এসেছ দূর-দূরান্ত থেকে। কেউ জেলের কুঠরি থেকে। কেউ পুলিশের টর্চার সেল থেকে। তোমরা যার যার ঘরে ফিরে যাও। কিন্তু কাদা পানিতে ডুব দিয়ে থেক না। হয়তো আজ বা আগামীকাল আমাদের জন্য সংকটময় হবে। তবুও আমি স্বপ্ন দেখি, এই স্বপ্ন-গাথা আছে আমেরিকার অস্তিত্বে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন এই জাতি জাগ্রত হবে এবং মানুষের এই বিশ্বাসের মূল্যায়ন করবে, সব মানুষ জন্মসূত্রে সমান।
মার্টিন লুথার কিং, জুনিয়র তার খ্রীষ্টীয় মতানুসারে অহিংস উপায়ে নাগরিক অধিকার রক্ষায় অবদানের জন্য অধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। সফল এই রাজনীতিবিদ তার মণ্ত্রমূগ্ধকর বক্তৃতা দ্বারা জনমনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।
আলোড়ন তোলা আই হ্যাভ এ ড্রিম (আমি স্বপ্ন দেখি) ভাষণের প্রভাবেই ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার আইন ও ১৯৬৫ সালে ভোটাধিকার আইন প্রণয়ন করা হয়।
তিনি ভিয়েতনামের সাথে আমেরিকার যুদ্ধে জড়িত হওয়ার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ আর নিন্দা প্রকাশ করেন। ১৯৬৭ সালের ৪ এপ্রিল নিউইয়র্কে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন "আমেরিকানরা ভিয়েতনামকে তাদের কলোনি বানানোর যে বাসনা করেছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণ্য আর বর্বরোচিত একটা অধ্যায় হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকবে"।
১৯৬২ সালে তিনি আলবেনিয়া ও জর্জিয়াতে ব্যারথ অভিযান চালান। ১৯৬৩ সালে তিনি ওয়াশিংটনে মার্চ সুসংগঠিত করেন।

ধর্মীয় বিশ্বাস:
মার্টিন লুথার কিং জন্মগত ভাবে ছিলেন খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী এবং একজন খ্রিষ্টান পাদ্রী। মার্টিনের পিতৃপুরুষেরা বংশানুক্রমিক ভাবে ছিল খুবই ধার্মিক। লুথার কিং এর দাদা ও বাবা দুজনেই ছিলেন চার্চের ধর্মযাজক। সেই সূত্রে তিনিও ছিলেন একজন ধর্মযাজক। ১৯৫৪ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি Dexter Avenue Baptist Church এর একজন যাজক হয়েছিলেন। কিংয়ের জিউসকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন এবং তার আদেশ মেনে চলতেন। তিনি মানুষকে বোঝাতেন ‘তোমার প্রতিবেশীকে তেমনই ভালবাসো যেমন তুমি নিজেকে ভালবাসো, সবচেয়ে বেশি ভালবাসো সৃষ্টিকর্তাকে, ভালবাসো তোমার শত্রুকে, তাদেরকে আশীর্বাদ কর এবং তাদের জন্য প্রার্থনা কর’।
বার্মিংহাম জেল থেকে তার লেখা বিখ্যাত চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “সিভিল রাইট নেতা হবার আগে, আমি ধর্মবাণীর প্রচারক ছিলাম। এটা ছিল আমার প্রথম ডাক এবং এটা এখনও আমার সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি হয়ে আছে। তুমি জান বাস্তবিক ভাবে আমি সিভিল রাইটের জন্য যা করেছি তা প্রচারক হিসেবে আমার কর্তব্যের অংশ হিসেবে করেছি। এটা ছাড়া Christian ministry-তে আমার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের কোন ইচ্ছা নেই। আমার কোন রাজনৈতিক অফিস চালানোর কোন পরিকল্পনা নেই। আমি ধর্মযাজক ছাড়া অন্য কোন পরিকল্পনা করছি না। এবং এই সংগ্রামে অন্য সবাইকে সাথে নিয়ে আমি যা কিছু করছি তার সবই একজন যাজকের দায়িত্বের অংশ হিসেবে করছি যে একজন যাজককে সমগ্র জাতির জন্য দায়ী থাকা উচিত”। তিনি আরও উল্লেখ করেন ‘শুধু সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা-ই আমার ইচ্ছা’।
 
মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ আজও পৃথিবীর বুকে মানুষের মনে চির অম্লান হয়ে আছে। তার ঐতিহাসিক সংগ্রামের কারণেই আজ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং একতাবদ্ধ জাতিতে পরিণত হয়েছে। আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা, যিনি একজন কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান-আমেরিকান। তিনি আজ যুক্তরাষ্ট্রের তথা সমগ্র বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তি। আজ যুক্তরাষ্ট্র তাদের একতাবদ্ধতার জন্যই সমগ্র বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। মার্টিন লুথার কিং এই স্বপ্নই দেখতেন যে আমেরিকা হবে সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ। আজ তার সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এজন্যই তো প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সেই ভাষণের ৫০ তম বার্ষিকীতে বলেছেন,
“তিনি যা বলেছিলেন, যা করেছিলেন, তার জন্য আমি তৃপ্ত। কারণ তার সেই ভাষণ ছিল এমন কিছু, যা সকল আমেরিকানই তার নিজের করে নিয়েছে। সারা আমেরিকা জুড়ে আপনি দেখবেন, তরুণরা বা ছোট্ট শিশুরাও বলে, 'আমার একটি স্বপ্ন আছে।”

Post A Comment: