ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত
Decrease font Enlarge font
গত ২২ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে হিউম্যার রাইটস ওয়াচ-এর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের ২৯ শতাংশ মেয়েরই ১৫ বছরের মধ্যে বিয়ে হয়ে যায়। আর ১৮ বছরের মধ্যে বিয়ে হয় ৬৫ শতাংশের। এর চেয়েও ভয়ংকর বিষয় হল ১১ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায় ২ শতাংশ মেয়ের।

ইউনিসেফের ২০১১ সালে প্রকাশিত ‘The State of the World's Children’ রিপোর্টের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়সের আগেই ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় এবং একতৃতীয়াংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় ১৫ বছর বয়সের আগেই।

সরকার প্রচলিত বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনThe Child Marriage Restraint Act,১৯২৯  বদলে নতুন আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৪ নামে, যার একটি খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে মতামতের জন্য।

সরকার মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ বছর করতে নতুন আইনে একটি প্রস্তাব দেয়। তারপর মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক দাতাদের প্রতিবাদের মুখে বারবার বলেছে, বিয়ের বয়স কমানো হবে না। কিন্তু গত ২৩ অক্টোবর দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বাল্যবিবাহ প্রশ্নে পেছনে হাঁটছে বাংলাদেশÑ এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদন’ শিরোনামের রিপোর্ট থেকে জানা যায় সরকার কিছু ক্ষেত্রে মেয়েদের বিয়ের বয়স কমানোর লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে সর্বশেষ গত ১৮ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট আয়োজিত বাল্যবিবাহ বিষয়ক এক আলোচনা সভায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, ‘আইনে কোনো শর্ত রাখব, না তা নীতিতে থাকবে, তা নিয়ে চিন্তা করছি।’ সেখানে তিনি আরো বলেন, ‘বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতির কথা প্রত্যাহার না করে আলোচনা করেন, সুপারিশ করেন। আমরা সব সুপারিশ মনোযোগ সহকারে দেখব।’

আইন বা নীতি যেখানেই থাক, ‘বিশেষ প্রয়োজন’ বা ‘যুক্তিসঙ্গত কারণ’ এবং এর জন্য বাবা-মা বা আদালতের সম্মতি সংক্রান্ত শর্তের কথা বলে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ এর স্থলে ১৬ করলে এর অপব্যবহারই যে বেশি হবে, তা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়।
বাংলাদেশে যেখানে অহরহ মা-বাবাই বাল্যবিয়ের আয়োজন করে, সেখানে তাঁদেরকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া মানে অবিবেচনাপ্রসূতভাবে বাল্যবিয়ে আয়োজনকারীদের হাতে একটি মোক্ষম অস্ত্র তুলে দেয়া।

অন্যদিকে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আদালত এবং আইন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মানসিকতাও ভাববার বিষয়। আদালতে অ্যাডভোকেট, পাবলিক প্রসিকিউটরসহ সবাই যে নারীর বিষয়ে সচেতন, তা নয়। সাধারণভাবে বিয়ের বয়স ১৮ রেখে আদালতকে ১৬ বছরে বিয়ের অনুমতি প্রদানের দায়িত্ব দেয়া মানে আদালতকেই আইনের ব্যত্যয় ঘটাতে অনুপ্রাণিত করা।

আবার, আদালতে বিয়ের অনুমতি নিতে হলে নিশ্চয়ই একটি মামলা করতে হবে, কিন্তু প্রশ্ন হলো সেই মামলার বাদী কে হবে? ১৮ বছর বয়স না হলে অর্থাৎ সাবালক না হলে কেউ সরাসরি মামলা করতে পারে না, আইনগত অভিভাবকের মাধ্যমে মামলা দায়ের করতে হয়। তার মানে হলো, ঘুরেফিরে ক্ষমতাটি বাল্যবিয়ে আয়োজনকারীদের হাতেই থেকে যাচ্ছে।

আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো, এই মামলার বিবাদী কাকে করা হবে সেই বিষয়টিও স্পষ্ট নয়।

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, বাংলাদেশের শিশু নীতি এবং শিশু আইন সহ অনেক আইনে ১৮ বছরের কম বয়স্ক প্রত্যেককে শিশু বলা হয়েছে। সাবালকত্ব অর্জনের জন্য ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর করার প্রধান কারণ হলো তার আগে কোনো ব্যক্তির সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ সক্ষমতা ও পরিপক্বতা আসে না।

সাবালক না হলে কোনো ব্যক্তি চুক্তি করতে পারে না কারণ চুক্তিতে তার সম্মতির কোনো মূল্য নেই। বিয়ে একধরনের দেওয়ানী চুক্তি এবং এতে স্বাধীন সম্মতি একটি অপরিহার্য উপাদান। এক্ষেত্রে পক্ষদ্বয়ের সাবালকত্বকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একজন নাবালকের সম্মতিকে আইনে কখনোই স্বাধীন সম্মতি হিসেবে গণ্য করা হয় না।

বাবা-মায়ের কিংবা আদালতের সিদ্ধান্তে মেয়েদের ১৬ বছর মেয়েদেরবিয়ের আইন করলে এই ইঙ্গিতই দেয়া হয় যে, মেয়েদের নিজের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়ার অধিকারকে সরকার সমর্থন করে না। বিয়ের মতো জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একজনের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয়ার প্রথা যেখানে বিলোপ করা জরুরি, সেখানে এধরনের পশ্চাৎপদ আইন করে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দেয়ার মধ্যযুগীয় পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে উৎসাহিত করার কোনো মানে হয় না।

 এ প্রসঙ্গে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের বক্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে বিনীতভাবে আবেদন করছি, আইনগত সুরক্ষা দিয়ে ‘বিপদগ্রস্ত’ হওয়া থেকে যাতে আমাদের রক্ষা করে।’

একটি আইন শতভাগ জনগণকে মানতে কখনোই বাধ্য করা যায় না, কিন্তু আইন সমাজে একটি মানদ- তৈরি করে দেয়।

প্রায় ১০০ বছর ধরে এদেশে মেয়েদের বিয়ের আইনানুগ বয়স ১৮ বছর। এখন এটি একটি মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো, মেয়েদের প্রজনন স্বাস্থ্যের উন্নতি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, নারীশিক্ষাকে উৎসাহ প্রদান, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও নারীর সমঅধিকার ইত্যাদি অনেক সামাজিক সূচকের প্রতি লক্ষ্য রেখে আইনে বিয়ের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল।

একে সামনে রেখে সরকারি-বেসরকারি অগণিত উন্নয়নকর্মী, অধিকারকর্মী ও নারীআন্দোলনকর্মীর শতবছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে যখন দেশের সামাজিক সূচকগুলোতে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হচ্ছে, তখন মেয়েদের বিয়ের বয়সের প্রতিষ্ঠিত যৌক্তিক মানদ- থেকে পিছু হটা সমাজে অবশ্যই একটি অশুভ ইঙ্গিত দেবে।

Post A Comment: