সাধারণ পরিচিতি:
প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস ৪৬৯ খ্রিষ্টপূর্বে গ্রীসের রাজধানী এথেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সফ্রোনিসকস  (Sophroniscus)। তিনি ছিলেন একজন ভাস্কর। সক্রেটিসের মায়ের নাম ফেনারিটি (Phaenarete)। পেশায় তিনি ধাত্রী ছিলেন। এই মহান দার্শনিক সম্পর্কে তার নিজের লিখিতভাবে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। যে তথ্য পাওয়া যায় তা হল তার শিষ্য প্লেটো-র ডায়ালগ এরিস্টোফেনিসের নাটকসমূহ এবং সৈনিক জেনোফোন এর লেখা বর্ণনা থেকে। সক্রেটিস জন্ম নিয়েছিলেন এক অতি দরিদ্র কারিগরের ঘরে। তার বাবা এবং মা উভয়েই অর্থ উপার্জনের জন্য কাজ করতেন। তথাপি সংসারে সারাক্ষণ অনটন থাকার কারণে তাকে স্কুলে পাঠাতে পারেননি। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের তেমন সুযোগ হয়নি তার। কিন্তু তিনি স্বীয় বুদ্ধি, বিবেক, মেধা-মননের সাহায্যে সৃষ্ট করেছিলেন গভীর এর জ্ঞানভাণ্ডার। সক্রেটিস দেখতে ছিলেন খুব সাদামাটা ধরনের। তার চেহারা ছিল কালো এবং কুৎসিত ধরনের। পোশাক পরিচ্ছদ ছিল একেবারে সাধারণ। পোশাকের ব্যাপারে তার দর্শন ছিল এরকম—
“পেষাক দিয়ে কি হবে? পেষাক তো বাহিরের আবরণ মাত্র। জ্ঞানই হল আসল সৌন্দর্য”।
চ্যাপ্টা নাক, মোটা ও বেঁটে, মলিন-বেশ এবং কিছুটা উদভ্রান্ত এবং আগ্রহী দৃষ্টির জন্য তাঁকে আসলে দার্শনিক বলে মানানসই মনে হতো না । যদিও শারীরিকভাবে কুৎসিত এবং কখনো নোংরা তাঁর ছিল প্রচণ্ড মানসিক শক্তি ও মেধা।

শিক্ষা-দীক্ষা:
আগেই উল্লেখ করেছি দারিদ্র্যতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-দীক্ষা তার তেমন হয়নি। তিনি ছিলেন স্ব-শিক্ষিত ও সুশিক্ষিত। ছোটবেলা থেকেই তার ছিল অসাধারণ মেধা এবং চমৎকার কথা বলার ক্ষমতা। একবার সক্রেটিসের ভদ্র ও মধুর আচরণে, বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তায় মুগ্ধ হয়ে ক্রাইটো  নামের একজন ধনী ব্যক্তি তার পড়ালেখার সমস্ত ব্যয়ভার গ্রহণ করেন। সক্রেটিস ভর্তি হলেন এনাক্সগোরাস (Anaxagoras) নামের এক গুরুর কাছে। কিছুদিন পর কোনো কারণে এনাক্সগোরাস আদালতে অভিযুক্ত হলে সক্রেটিস আরখ এখলাসের শিষ্য হলেন।

কর্মজীবন:
সক্রেটিস স্থায়ীভাবে কোন পেশা গ্রহণ করেছেন বলে জানা যায় না। তিনি ঠিক কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করতেন তা পরিষ্কার নয়। ছোটবেলায় তিনি পাথর কাটার কাজ করতেন। এনাক্সগোরাস নামের গুরুর কাছে ভর্তি হবার পর তিনি আর সে কাজ করেননি। সক্রেটিস নিজে একজন ভাস্কর ছিলেন। একটা সময় তিনি পাথরের মূর্তি তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে রোজগার করতেন। প্রাচীনকালে অনেকেই মনে করতো গ্রিসের অ্যাক্রোপলিসে দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত বিরাজমান ঈশ্বরের করুণা চিহ্নিতকারী মূর্তিগুলো সক্রেটিসের হাতে তৈরি। অবশ্য এখনকার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এই বিষয়ে মতপার্থক্য আছে।
জেনোফোন রচিত সিম্পোজিয়াম থেকে জানা যায়, সক্রেটিসকে কখনও কোন পেশা অবলম্বন করবেন না। কারণ তিনি ঠিক তা-ই করবেন যাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন আর তা হচ্ছে দর্শন সম্বন্ধে আলোচনা। এরিস্টোফেনিসের ক্লাউডস্‌ রচনায় পাওয়া গেছে যে সক্রেটিস শিক্ষার বিনিময়ে অর্থ নিতেন এবং গ্রিসের চেরিফোনে একটি সোফিস্ট বিদ্যালয়ও পরিচালনা করতেন। আবার প্লেটোর অ্যাপোলজি এবং জেনোফোনের সিম্পোজিয়ামে দেখা যায় সক্রেটিস কখনই শিক্ষার বিনিময়ে অর্থ নেননি। বরং তিনি তার দরিদ্রতার দিকে নির্দেশ করেই প্রমাণ দিতেন যে, তিনি কোন পেশাদার শিক্ষক নন। তার ভাষায়— “নিজেকে অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেয়ায় আমার অভ্যাস, আর এজন্যই এমনিতে না পেলে পয়সাকড়ি দিয়েও আমি দার্শনিক আলোচনার সাথী যেগাড় করতাম।”
তরুণ বয়সে সক্রেটিস সৈনিক ছিলেন। প্লেটোর বর্ণনায়, সক্রেটিস তিনটি অভিযানে এথেনীয় সেনাবাহিনীর সাথে যোগ দিয়েছিলেন। অভিযানগুলো সংঘটিত হয়েছিল পটিডিয়া, অ্যাম্ফিপোলিস এবং ডেলিয়ামে। যুদ্ধে সক্রেটিস অসাধারণ বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন। যুদ্ধের  পর তার মন ক্রমশই যুদ্ধের প্রতি বিরূপ হয়ে উঠল। তিনি চিরদিনের মতো সৈনিকবৃত্তি পরিত্যাগ করে ফিরে এলেন এথেন্সে।
এথেন্স তখন জ্ঞান-গরিমা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শৌর্য, বীর্যে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশ। তখন এথেন্সে ছিল শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির এক স্বর্ণযুগ। ফলে তিনি নিজেকে জ্ঞানচর্চা থেকে বিরত রাখতে পারেননি। এভাবে জ্ঞানচর্চা করেই কেটে যায় তার সারাটা জীবন।

জীবনের ঘটনাপ্রবাহ:
মধ্য বয়সে তিনি বাজারে বাজারে ঘোরাঘুরি করতেন, প্রায়ই মানুষজনকে ধরে থামাতেন আর বুদ্ধিদীপ্ত কিন্তু বিব্রতকর সব প্রশ্ন করতেন। এই ছিল তাঁর একমাত্র কাজ। কিন্তু তিনি যে প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করতেন সেগুলো ছিল ক্ষুরধার এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ। খুব সহজ-সরল মনে হলেও আসলে প্রশ্নগুলোর উত্তর অতটা সহজ সরল বা সরাসরি দেয়ার মতো ছিল না মোটেই। উদাহরণ হিসেবে ইউথিডেমোসের সাথে কথোপকথনের কথা বলা যায়। সক্রেটিস তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, প্রতারণা করা কি অনৈতিক? “অবশ্যই”, সহজ-সরল উত্তর দিলেন ইউথিডেমোস। তিনি ভাবলেন সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সক্রেটিসের প্রশ্ন ছিল একটু অন্যরকম। তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেন ধর তোমার কোন বন্ধু আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে এবং তুমি তার অস্ত্রটা চুরি করলে। তাহলে? সেটা কি প্রতারণার মধ্যে পড়ে? অবশ্যই তা প্রতারণার মধ্যে পড়ে, পুনরায় উত্তর দিলেন ইউথিডেমোস। কিন্তু ঠিক এ কাজটা করাই কি উচিত আর নৈতিক নয়? এটা একটা ভাল কাজ, একজনের জীবন রক্ষা করছেন, বন্ধুকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করছেন – যদিও কাজটি প্রতারণা। অসহায় ভাবে ইউথিডেমোস বললেন, হ্যাঁ, তা ঠিক। চতুর পাল্টা-যুক্তি প্রয়োগ করে সক্রেটিস ইউথিডেমোসকে দেখিয়ে দিলেন যে, প্রতারণা সব ক্ষেত্রেই অনৈতিক কাজ নয়। ইউথিডেমোস এ ব্যাপারটা আগে কখনও এভাবে ভেবে দেখেননি।
সক্রেটিসের সময় এথেন্সে বিত্তবানদের ছেলেদের দর্শনের শিক্ষকদের কাছে পাঠানো হতো জ্ঞানার্জনের জন্য। দর্শনের শিক্ষকরা ছিলেন খুবই চতুর প্রকৃতির। তাঁরা ছাত্রদের বক্তৃতা দেয়া শেখাতেন। এ জন্য তাঁরা অনেক উঁচু সম্মানী আদায় করতেন। কিন্তু সক্রেটিস কোন প্রকার সম্মানী নিতেন না। তিনি দাবি করতেন, তিনি কিছুই জানেন না। আর কিছুই না জানলে তিনি শেখাবেন কি করে? যদিও তাতে বক্তৃতা শোনার জন্য ছাত্র আসার কমতি ছিল না । দর্শনের অন্যান্য শিক্ষকদের কাছে এ কারণে তিনি তেমন গ্রহণযোগ্যতা পান নি।
তাঁর বন্ধু ক্যারোফন একদিন ডেলফির ওরাকল এর কাছে গেলেন। ওরাকল ছিলেন একজন জ্ঞানী মহিলা এবং ভবিষ্যৎ বক্তা। আগতদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন তিনি । তাঁর উত্তরগুলো অনেকটা গোলকধাঁধার মতো শোনাত। ক্যারোফন জিজ্ঞেস করলেন, সক্রেটিসের চেয়ে জ্ঞানী কেউ আছে কি? “না”, সরাসরি উত্তর দিলেন ওরাকল। আরও বললেন, “কেউই সক্রেটিসের চেয়ে জ্ঞানী নয়।” ক‍্যারোফন যখন সক্রেটিসকে এ কথা বললেন, প্রথমে সক্রেটিস তা বিশ্বাস করলেন না। তিনি আশ্চর্য হলেন এই ভেবে যে, এত কম জেনে আমি কিভাবে এথেন্সের সবচেয়ে জ্ঞানী হলাম?
প্রতিদিন ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে সামান্য প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়তেন সক্রেটিস। খালি পা, গায়ে একটা মোটা কাপড় জড়ানো থাকত। কোনোদিন গিয়ে বসতেন নগরের কোনো দোকানে, মন্দিরের চাতালে কিংবা বন্ধুর বাড়িতে। নগরের যেখানেই লোকজনের ভিড় সেখানেই খুঁজে পাওয়া যেত সক্রেটিসকে। প্রাণ খুলে লোকজনের সঙ্গে গল্প করছেন। আড্ডা দিচ্ছেন, মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছেন, নিজে এমন ভাব দেখাতেন যেন কিছুই জানেন না, বোঝেন না। লোকের কাছ থেকে জানার জন্য প্রশ্ন করছেন।  আসলে প্রশ্ন করা, তর্ক করা ছিল সে যুগের এক শ্রেণীর লোকদের ব্যবসা। এদের বলা হতো সোফিস্ট। এরা পয়সা নিয়ে বড় বড় কথা বলত। সক্রেটিস তাদের সরাসরি জিজ্ঞেস করতেন, বীরত্ব বলতে তারা কি বোঝে? পাণ্ডিত্যের স্বরূপ কি? তারা যখন কোনো কিছু উত্তর দিত তিনি আবার প্রশ্ন করতেন। প্রশ্নের পর প্রশ্ন সাজিয়ে বুঝিয়ে দিতেন তাদের ধারণা কত ভ্রান্ত। মিথ্যা অহমিকায় কতখানি ভরপুর হয়ে আছে তারা। নিজেদের স্বরূপ এভাবে উদঘাটিত হয়ে পড়ায় সক্রেটিসের ওপর তারা সকলে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। কিন্তু সক্রেটিস তাতে সামান্যতম বিচলিত হতেন না। নিজের আদর্শ সত্যের প্রতি তার ছিল অবিচল আস্থা।
অর্থ সম্পদের প্রতি চরম উদাসীনতা। একবার তার বন্ধু অ্যালসিবিয়াদেশ তাকে বাসস্থান তৈরি করার জন্য বিরাট একখণ্ড জমি দিতে চাইলেন। সক্রেটিস বন্ধুর দান ফিরিয়ে দিয়ে সকৌতুকে বললেন, আমার প্রয়োজন একটি জুতার আর তুমি দিচ্ছ একটি বিরাট চামড়া। এ নিয়ে আমি কি করব?

সক্রেটিসের স্ত্রী ও কলহপ্রিয়তা:
পার্থিব সম্পদের প্রতি নিঃস্পৃহতা তার দার্শনিক জীবনে যতখানি শান্তি নিয়ে এসেছিল তার সাংসারিক জীবনে ততখানি অশান্তি নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তার প্রতিও তিনি ছিলেন সমান নিঃস্পৃহ। সক্রেটিসের স্ত্রীর নাম জানথিপি (Xanthiphe)যার বয়স ছিল সক্রেটিসের থেকে অনেক কম। তার স্ত্রী জানথিপি ( Xanthiphe) ছিলেন ভয়ংকর রাগী মহিলা। সাংসারিক ব্যাপারে সক্রেটিসের উদাসীনতা তিনি মেনে নিতে পারতেন না। একদিন সক্রেটস গভীর একাগ্রতার সাথে একখানি বই পড়ছিলেন। প্রচণ্ড বিরক্তিতে জানথিপি গালিগালাজ শুরু করে দিলেন। কিছুক্ষণ সক্রেটিস স্ত্রীর বাক্যবাণে কর্ণপাত করলেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ধৈর্য রক্ষা করতে না পেরে বাইরে গিয়ে আবার বইটি পড়তে আরম্ভ করলেন। জানথিপি আর সহ্য করতে না পেরে এক বালতি পানি এনে তার মাথায় ঢেলে দিলেন। সক্রেটিস মৃদু হেসে বললেন, আমি আগেই জানতাম যখন এত মেঘগর্জন হচ্ছে তখন শেষ পর্যন্ত একপশলা বৃষ্টি হবেই।  জানথিপি ছাড়াও সক্রেটিসের আরও একজন স্ত্রী ছিলেন, তার নাম মায়ার্ত (Myrto)।  দুই স্ত্রীর গর্ভে তার তিনটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল যাদের নাম ছিল লামপ্রোক্লিস, সফ্রোনিস্কাস এবং মেনেজেনাস। দারিদ্র্যের মধ্যে হলেও তিনি তাদের ভরণ পোষণ শিক্ষার ব্যাপারে কোনো উদাসীনতা দেখাননি।
কোন কোন গল্পে দেখা যায় সক্রেটিসকে তার স্ত্রী ঝাড়ু-পেটা করছেন আর সক্রেটিস শান্তভাবে বই পড়ে যাচ্ছেন। যেন আশপাশে কিছুই হচ্ছে না।

সক্রেটিসের মৃত্যু:
সক্রেটিসের আদর্শকে দেশের বেশ কিছু মানুষ সুনজরে দেখেনি। তারা সক্রেটিসের সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা করল। তাছাড়া যারা ঐশ্বর্য, বীরত্ব শিক্ষার অহংকারে নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে মনে করত, সক্রেটিসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাদের এই অহংকারের খোলসটা খসে পড়ত। এভাবে নিজেদের স্বরূপ উদঘাটিত হয়ে পড়ায় অভিজাত শ্রেণীর মানুষরা সক্রেটিসের ঘোর শত্রু হয়ে উঠল। তাদের চক্রান্তে দেশের নাগরিক আদালতে ৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলো। সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এলো মেলেতুল, লাইকন, আনাতুস নামে এথেন্সের তিনজন সম্ভ্রান্ত নাগরিক।
তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল তিনি এথেন্সের প্রচলিত দেবতাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে নতুন দেবতার প্রবর্তন করতে চাইছেন। দ্বিতীয়ত তিনি দেশের যুব সমাজকে ভ্রান্ত পথে চালিত করেছেন। এই অভিযোগের বিচার করার জন্য আলোচোনের সভাপতিত্বে ৫০১ জনের বিচারকমণ্ডলী গঠিত হলো। এই বিচারকমণ্ডলীর সামনে সক্রেটিস এক দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিলেন।  তার সেই বক্তৃতাটি ছিল এরকম—
“হে এথেন্সের অধিবাসীগণ, আমার অভিযোগকারীদের বক্তৃতা শুনে আপনাদের কেমন লেগেছে জানি না, তবে আমি তাদের বক্তৃতার চমকে আত্মবিস্মৃত হয়েছিলাম, যদিও তাদের বক্তৃতায় সত্য ভাষণের চিহ্নমাত্র নেই। এর উত্তরে আমার বক্তব্য পেশ করছি। আমি অভিযোগকারীদের মতো মার্জিত ভাষার ব্যবহার জানি না। আমাকে শুধু ন্যায়বিচারের স্বার্থে সত্য প্রকাশ করতে দেয়া হোক।
কেন আমি আমার দেশবাসীর বিরাগভাজন হলাম? অনেক দিন আগে ডেলফির মন্দিরে দৈববাণী শুনলাম তখনই আমার মনে হলো এর অর্থ কি? আমি তো জ্ঞানী নই তবে দেবী কেন আমাকে দেবীর কাছে নিয়ে গিয়ে বলল এই দেখ আমার চেয়ে জ্ঞানী মানুষ।
আমি জ্ঞানী মানুষ খুঁজতে আরম্ভ করলাম। ঠিক একই জিনিস লক্ষ করলাম। সেখান থেকে গেলাম কবিদের কাছে। তাদের সাথে কথা বলে বুঝলাম তারা প্রকৃতই অজ্ঞ। তারা ঈশ্বরদত্ত শক্তি ও প্রেরণা থেকেই সবকিছু সৃষ্টি করেন, জ্ঞান থেকে নয়।
শেষ পর্যন্ত গেলাম শিল্পী, কারিগরদের কাছে। তারা এমন অনেক বিষয় জানেন যা আমি জানি না। কিন্তু তারাও কবিদের মতো সব ব্যাপারেই নিজেদের চরম জ্ঞানী বলে মনে করত আর এই ভ্রান্তিই তাদের প্রকৃত জ্ঞানকে ঢেকে রেখেছিল।
এই অনুসন্ধানের জন্য আমার অনেক শত্রু সৃষ্টি হলো। লোকে আমার নামে অপবাদ দিল, আমিই নাকি একমাত্র জ্ঞানী কিন্তু ততদিনে আমি দৈববাণীর অর্থ উপলব্ধি করতে পেরেছি। মানুষের জ্ঞান কত অকিঞ্চিৎকর। দেবতা আমার নামটা দৃষ্টান্তস্বরূপ ব্যবহার করে বলতে চেয়েছিলেন তোমাদের মধ্যে সেই সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী যে সক্রেটিসের মতো জানে, যে সত্য সত্যই জানে তার জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই।
আমি নিশ্চিত যে আমি অনেকের অপ্রিয়তা এবং শত্রুতা অর্জন করেছি এবং আমার চরম দণ্ড হলে এই শত্রুতার জন্যই হবে। মেলেতুস বা আনিতুসের জন্য নয়। দণ্ড হলে তা হবে জনতার ঈর্ষা ও সন্দেহের জন্য যা আমার আগে অনেক সৎকারের নিধনের কারণ হয়েছে এবং সম্ভবত আরও অনেকের নিধনের কারণ হবে। আমিই যে তাদের শেষ বলি তা মনে করার কোনো কারণ নেই। অতএব হে এথেন্সের নাগরিকগণ, আমি বলি তোমরা হয় আনিতুসের কথা শোন অথবা অগ্রাহ্য কর। হয় আমাকে মুক্তি দাও নয়তো দিও না। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পার আমি আমার জীবনের ধারা বদলাব না।
আমাকে ঈশ্বর এই রাষ্ট্র আক্রমণ করতে পাঠিয়েছেন। রাষ্ট্র হলো একটি মহৎ সুন্দর ঘোড়া। তার বৃহৎ আয়তনের জন্য সে শ্লথগতি এবং তার গতি দ্রুততর করতে, তাকে জাগিয়ে তোলার জন্য মৌমাছির প্রয়োজন ছিল। আমি মনে করি যে আমি ঈশ্বর প্রেরিত সেই মৌমাছি। আমি সর্বক্ষণ তোমাদের দেহে হুল ফুটিয়ে তোমাদের মধ্যে সুস্থ ভাবনা জাগিয়ে তুলি, যুক্তির দ্বারা উদ্বুদ্ধ করি এবং প্রত্যেককে তিরস্কারের দ্বারা তৎপর করে রাখি।
বন্ধুগণ সম্ভব অসম্ভবের কথা বাদ দিয়ে বলছি মুক্তিলাভের জন্য বা দণ্ড এড়ানোর জন্য বিচারকদের অনুনয় করা অসঙ্গত। যুক্তি পেশ করে তাদের মনে প্রত্যয় জন্মানোই আমাদের কর্তব্য, বিচারকের কর্তব্য হচ্ছে ন্যায়বিচার করা। বিচারের নামে বন্ধু তোষণ করা নয়।
আমি দেবতাকে বিশ্বাস করি, আমার অভিযোগকারীরা যতখানি বিশ্বাস করে তার চেয়েও অনেক বেশি বিশ্বাস করি। এতক্ষণ আমি ঈশ্বর এবং তোমাদের সামনে আমার বক্তব্য রাখলাম। এবার তোমাদের এবং আমার পক্ষে যা সর্বোত্তম সেই বিচার হোক”।
কিন্তু বিচারকদের রায়ে সক্রেটিসের ২৮১/২২০ ভোটে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যদন্ডের রায় ঘোষিত হল। তাকে হেমলক নামক বিষ স্বেচ্ছায় পান করে মৃত্যুবরণ করতে হবে। সক্রেটিস হাসিমুখে রায় মেনে নিলেন। সক্রেটেসের কারারক্ষী এবং সক্রেটিসের শিষ্যরা সক্রেটিসকে পালিয়ে যেতে বললে তিনি তাতে অসম্মতি জানিয়ে বললেন যে পালিয়ে গেলে দেশের আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা করা হবে এবং সবাই ভাববে যে আমি সত্যি সত্যিই অপরাধী। বিচারের কার্যকরের দিন হাসিমুখে জল্লাদের কাছ থেকে হেমলকের পেয়ালা নিয়ে তা পান করলেন এবং কয়েক মুহূর্তেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।

সক্রেটিসের কিছু বিখ্যাত উক্তি:
  • পৃথিবীতে শুধুমাত্র একটি-ই ভাল আছে, জ্ঞান। আর একটি-ই খারাপ আছে, অজ্ঞতা।
  • আমি কাউকে কিছু শিক্ষা দিতে পারব না, আমি শুধু তাদের চিন্তা করাতে পারব।
  • বিস্ময় হল জ্ঞানের শুরু।
  • টাকার বিনিময়ে শিক্ষা অর্জনের চেয়ে অশিক্ষিত থাকা ভাল।
  • জ্ঞানের শিক্ষকের কাজ হচ্ছে কোনো ব্যক্তিকে প্রশ্ন করে তার কাছ থেকে উত্তর জেনে দেখানো যে জ্ঞানটা তার মধ্যেই ছিল।
  • বন্ধু হচ্ছে দুটি হৃদয়ের একটি অভিন্ন মন।
  • অপরীক্ষিত জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা গ্লানিকর।
  • পোশাক হলো বাইরের আবরণ, মানুষের আসল সৌন্দর্য হচ্ছে তার জ্ঞান।
  • নিজেকে জান।
  • প্রকৃত জ্ঞান নিজেকে জানার মধ্যে, অন্য কিছু জানার মধ্যে নয়।
  • তুমি কিছুই  জান না এটা জানা-ই জ্ঞানের আসল মানে।
  • যাই হোক বিয়ে কর। তোমার স্ত্রী ভাল হলে তুমি হবে সুখী, আর খারাপ হলে হবে দার্শনিক।
  • ব্যস্ত জীবনের অনুর্বরতা সম্পর্কে সতর্ক থাকুন।
  • আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত সাধারণের ভালর জন্য। শুধু ঈশ্বরই জানেন কিসে আমাদের ভাল।
  • সত্যিকারের জ্ঞান আমাদের সবার কাছেই আসে, যখন আমরা বুঝতে পারি যে আমরা আমাদের জীবন, আমাদের নিজেদের সম্পর্কে এবং আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে তার সম্পর্কে কত কম জানি।
  • তারা জানে না যে তারা জানে না, আমি জানি যে আমি কিছু জানি না।
  • নারী জগতে বিশৃঙ্খলা ও ভাঙ্গনের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস। সে দাফালি বৃক্ষের ন্যায় যাহা বাহ্যত খুব সুন্দর দেখায়। কিন্তু চড়ুই পাখি ইহা ভক্ষণ করিলে ইহাদের মৃত্যু অনিবার্য।
  • সেই সাহসী যে পালিয়ে না গিয়ে তার দায়িত্বে থাকে এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
  • নিজেকে উন্নয়নের জন্য অন্য মানুষের লেখালেখিতে কাজে লাগাও এই জন্য যে অন্য মানুষ কিসের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে তা তুমি যাতে সহজেই বুঝতে পার।
  • সুখ্যাতি অর্জনের উপায় হল তুমি কি হিসেবে আবির্ভূত হতে চাও তার উপক্রম হওয়া।
  • তুমি যা হতে চাও তা-ই হও।
  • কঠিন যুদ্ধেও সবার প্রতি দয়ালু হও।
  • শক্ত মন আলোচনা করে ধারনা নিয়ে, গড়পড়তা মন আলোচনা করে ঘটনা নিয়ে, দুর্বল মন মানুষ নিয়ে আলোচনা করে।
  • বন্ধুত্ব কর ধীরে ধীরে, কিন্তু যখন বন্ধুত্ব হবে এটা দৃঢ় কর এবং স্থায়ী কর।
  • মৃত্যুই হল মানুষের সর্বাপেক্ষা বড় আশীর্বাদ।

Post A Comment: