ব্যক্তিগত পরিচিতি:
বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ রুশ প্রজাতন্ত্র বা রাশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন, পুরো নাম ভ্লাদিমির ভ্লাদিমিরোভিচ পুতিন। তিনি রাশিয়ার অন্যতম একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। পুতিন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫২ সালের ৭-ই অক্টোবর। তার জন্ম রাশিয়ার লেনিনগ্রাদের সোভিয়েত ইউনিয়নে (বর্তমান সেন্ট পিটসবার্গ)। তার বাবার নাম ভ্লাদিমির স্পিরিডোনোভিস পুতিন এবং তার মায়ের নাম মারিয়া ইভানোভানা শীলোমোভা। তার বাবা ছিলেন লোহা কারখানার ফোরম্যান এবং মা ছিলেন একজন ফ্যাক্টরি শ্রমিক।  পুতিন রুশ অর্থোডক্স গির্জার একজন সদস্য। ব্যক্তিগত জীবনে পুতিন বিবাহিত। তিনি ১৯৮৩ সালে লিদমিলা  শ্রেবনেভা নামের একজন সাবেক বিমানবালা মেয়েকে বিয়ে করেন। সেখানে তার দুইজন কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু ২০১৪ সালে পুতিনের স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা:
পুতিন ১৯৬০-১৯৬৮ সালের মধ্যে প্রাইমারি স্কুলে পড়াশুনা করেছেন। ১৯৬০ সালে তিনি লেনিনগ্রাদে স্কুল নং-১৯৩ এ ভর্তি হন। এরপর সেখান থেকে অষ্টম গ্রেডের পর তিনি স্কুল নং-২৮১ তে হাই স্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৭০ সালে পড়া শেষ করেন।
১৯৭০ সালে পুতিন লেনিনগ্রাদ স্টেট ইউনিভার্সিটিতে আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৭৫ সালে ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৮০ সালের শুরুর দিকে পুতিন মস্কোর KGB স্কুল নং-১ এ পড়াশুনা করেন।
শিক্ষা ক্ষেত্রে পুতিন কিছুটা অলস প্রকৃতির ছিলেন। এ প্রসঙ্গে পুতিনের নিজস্ব বক্তব্য হলো-
"I was always late for my first class, so even in winter I didn't have time to dress properly".
রাজনৈতিক ও পেশাগত ইতিহাস:
ভ্লাদিমির পুতিন ২০০০ থেকে ২০০৮পর্যন্ত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পুনঃ-নির্বাচিত হয়েছেন ২০১২ সালে। এর আগে তিনি ১৯৯৯ থেকে ২০০০ এবং আবারও ২০০৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময়ে পুতিন একীভূত রাশিয়া দলের সভাপতি ও রাশিয়া ও বেলারুশের মন্ত্রীসভার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এর আগে পুতিন ১৬ বছর ধরে একজন KGB অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদ পর্যন্ত পদোন্নতি লাভ করেন। পরবর্তীতে রাজনীতিতে যোগ দিতে ১৯৯১ সালে অবসর গ্রহণ করে সেন্ট পিটসবার্গে চলে আসেন। তারপর তিনি ১৯৯৬ সালে মস্কো চলে আসেন এবং সেখানে তিনি প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন এর প্রশাসনিক কার্যালয়ে যোগ দেন। সেখানে তিনি ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৯ সালে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর ২০০০ ও ২০০৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুতিন সাংবিধানিকভাবে একাধারে ৩য় মেয়াদে নির্বাচন করার অযোগ্য হওয়ায় সেবার দিমিত্রি মেদভেদেভ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং পুতিনকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেন। এরপর তিনি ঘোষণা করেন যে তিনি ৩য় মেয়াদের জন্য নতুন করে ২০১২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ২০১২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি ৩য় মেয়াদে জয়লাভ করেন যার মেয়াদকাল ৬ বছর।
নিজের পেশাগত পছন্দ সম্পর্কে পুতিনের বক্তব্য- Even before I finished high school, I wanted to work in intelligence. Granted, soon after, I decided I wanted to be a sailor, but then I wanted to do intelligence again. In the very beginning, I wanted to be a pilot”.
সাফল্য এবং অর্জনসমূহ:
প্রথমেই আসা যাক পুতিনের একটি বিখ্যাত বক্তব্যে যেটি হলো- I consider it to be my sacred duty to unify the people of Russia, to rally citizens around clear aims and tasks, and to remember every day and every minute that we have one Motherland, one people and one future”.
পুতিন আইনের শাসন প্রবর্তন ও স্থিতিশীলতা আনয়ন করে দেশের জনগণের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। যদিও পশ্চিমা পর্যবেক্ষক ও শক্তিগুলো তাকে অগণতান্ত্রিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। পুতিন তার শাসনকালে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন চেচনিয়ায় চেচেন যুদ্ধ-২ এর মাধ্যমে অঙ্গরাজ্যগুলোর অখণ্ডতা বজায় রেখেছেন। তিনি রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ভিত মজবুত হয়। ৯ বছরে রাশিয়ার জিডিপি ৭২% বৃদ্ধি পায়। এসময়ে তিনি রাশিয়ার দারিদ্রতা ৫০% পর্যন্ত কমিয়ে আনেন। চাকুরীজীবীদের মাসিক বেতন ৭০ ডলার থেকে ৬৫০ ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এসময়ে তিনি অনুকূল জ্বালানি নীতি গ্রহণ করে রাশিয়ার অনবিক শক্তিতে নবজাগরণ সৃষ্টি করেন। এছাড়াও অনেকগুলো বৃহৎ রপ্তানি সহায়ক পাইপ লাইনের মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থায় অবকাঠামো উন্নয়নের সূচনা করেন। যুবক বয়সে পুতিন বেশ কয়েকবার জুডো ও কারাতে খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।
ভ্লাদিমির পুতিন সম্পর্কে কিছু মজার তথ্য:
  • যে ভবন থেকে রাশিয়ার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত হয় সেই সেন্ট পিটসবার্গ ভবনের সিঁড়িতে শৈশবে পুতিন দৌড়াদৌড়ি করে ইঁদুর মারতেন।
  • রাশিয়া বর্তমান বিশ্বের দ্বিতীয় পরাশক্তি হয়ে ওঠার পেছনে যাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে তাদের প্রধান পথিকৃৎ হলেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন যার বাড়িতে পুতিনের দাদা দীর্ঘদিন শেফ এর কাজ করতেন।
  • পুতিন জুডো ও কারাতের কৌশল জানা একজন দক্ষ পুরুষ। আঠারো বছর বয়সেই পুতিন জুডোতে ব্ল্যাক বেল্ট অর্জন করেন।
  • পুতিন বই পড়তে খুব ভালবাসেন। তবে পুতিন গোয়েন্দা কাহিনী পড়তে বেশি পছন্দ করেন।
  • পুতিন যেখানেই যান সঙ্গে তার প্রিয় পোষা কুকুর কনি থাকবেই।
  • বিস্ময়কর একটি ব্যাপার হলো বেশ কয়েকটি ভাষায় দক্ষ হলেও পুতিন আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি খুব একটা জানেন না। তিনি জার্মান ভাষাতে বেশ দক্ষ।
  • ধর্মীয় বিশ্বাসে পুতিন একজন অর্থোডক্স খ্রিষ্টান। ধর্মীয় ব্যপারে পুতিন খুবই অনুদার। সমকামী বিয়েকে তিনি শয়তানের সাথে তুলনা করেছেন।
বর্তমানে পুতিন:
ভ্লাদিমির পুতিন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। রাশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তির দেশ। পুতিন সেই দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন নেতা। পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া বর্তমান ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তিন দশক আগে বিশ্ব রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়া রাশিয়া সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব সম্প্রদায়কে তাদের বর্তমান অবস্থানের কথা জানান দিচ্ছে। বর্তমানে সিরিয়া-ইরাক ছড়িয়ে আই এস জঙ্গিদের আতঙ্ক যখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ঠিক তখনই পর্দার সামনে আসেন পুতিন। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা গত ৩ বছরে আই এস বিষয়ে কোনো সুরাহা করতে পারেনি সেখানে রাশিয়া তা স্বল্প সময়ে করে দেখিয়েছে। এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচাইতে আলোচিত প্রেসিডেন্ট হচ্ছে পুতিন। তিনি মাত্র কয়েকদিন সিরিয়ার আই এস অবস্থানে হামলা করে তাদেরকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছেন। গণমাধ্যমে আমরা সিরিয়া থেকে আই এসদের বোরকা পরে পালানোর সংবাদও দেখেছি।

Post A Comment: