Decrease font Enlarge font
তাঁর সাতষট্টিতম জন্মদিন। চারদিকে সব আছে, তবু হাহাকার তোলা এক শূন্যতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। জোছনা আছে, কিন্তু জোছনা দেখানোর মানুষটি নেই। জন্মদিনের নানা আয়োজন তাঁকে নিয়ে, অথচ তিনি নেই। অন্যভুবনে কিভাবে পালিত হচ্ছে তাঁর জন্মদিন—বড় জানতে ইচ্ছে করে।

মনে পড়ে তাঁর তেষট্টিতম জন্মদিনটির কথা। হুমায়ূন আহমেদ তখন নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন। আমিও তাঁর সঙ্গেই ছিলাম, ক’দিনের জন্য ঢাকায় এসেছি। ১২ নভেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে দখিন হাওয়ায় আমার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে স্কাইপের মাধ্যমে যোগাযোগ হলো তাঁর সঙ্গে। লেখকজননী আয়েশা ফয়েজ, পুত্র নুহাশসহ জড়ো হওয়া বন্ধু ও স্বজনেরা একে একে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। তারপর প্রতি বছরের মতো জন্মদিনের কেক কাটা হয়।



রাত ১২টা ১ মিনিটে হুমায়ূন আহমেদকে বাইরে নিয়ে আসা হলো। পুরো আয়োজনটি দেখে অসম্ভব মুগ্ধ হলেন তিনি। শুধু বললেন, মোমবাতি জ্বালিয়ে তো আমার মাজার তৈরি করে ফেলেছো!



এর আগের প্রতিটা জন্মদিনে আমরা ভাবতাম, এবার তাঁকে কী সারপ্রাইজ দেওয়া যায়। হুমায়ূন আহমেদ অন্যদের সারপ্রাইজ দিতে যেমন পছন্দ করতেন, তেমনি নিজেও সারপ্রাইজড হয়ে আনন্দ পেতেন। প্রচলিত উপহার, যেমন পোশাক-আশাক খুব একটা পছন্দ করতেন না। চিত্রকলার প্রতি তাঁর ছিল তীব্র কৌতূহল। ভালো পেইন্টিং পছন্দ করতেন। তাই খ্যাতিমান চিত্রশিল্পীদের পেইন্টিং গিফট করে সারপ্রাইজ দিয়েছি আমরা তাঁর বিভিন্ন জন্মদিনে। ঘনিষ্ঠজনরাও নানাভাবে তাঁকে চমকে দিতে চেষ্টা করতেন।

একবার জন্মদিন উপলক্ষে আমরা তাঁর একটি ভাস্কর্য তৈরির পরিকল্পনা করি। ভাস্কর্যটি তৈরি করে অন্যমেলার ডিজাইনার গোবিন্দ। সাত দিনের মধ্যে এটি তৈরি হয়। জন্মদিনের আগের রাতে আমার বাসায় আনা হয় ভাস্কর্যটি। ভাস্কর্যের চশমাটা আমার পছন্দ হলো না। মোটা তার দিয়ে সাদা রঙ করে বানানো হয়েছিল চশমা। গোবিন্দকে বললাম, এই চশমা হুমায়ূন আহমেদের চশমা নয়। আর চশমাটা চেহারার সঙ্গে মোটেই মানাচ্ছে না। রাত তখন ১০টা। গোবিন্দ জিগাতলা বাজার থেকে তার কিনে এনে নতুন করে চশমা বানালো। রাত সাড়ে এগারটায় ভাস্কর্যটি হুমায়ূন আহমেদের বাসায় নিয়ে বসার ঘরে দক্ষিণ দিকের দেয়ালের কাছে রাখা হলো। তখনও রঙ কাচা। হাতের দাগ পড়ে গেল। নতুন করে ওখানেই রঙের ফিনিশিং টাচ দেওয়া হলো। হুমায়ূন আহমেদ তখন তাঁর রেড রুমে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন। রাত ১২টা ১ মিনিটে তাঁকে বাইরে নিয়ে আসা হবে। ভাস্কর্যটি দেখানো হবে এবং পাশের টেবিলে রাখা কেক কাটা হবে। রঙ কাঁচা দেখে ভাস্কর্যটির সামনে অনেকগুলো মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হলো, যেন কেউ কাছে গিয়ে হাত দিয়ে স্পর্শ করতে না পারে।

রাত ১২টা ১ মিনিটে হুমায়ূন আহমেদকে বাইরে নিয়ে আসা হলো। পুরো আয়োজনটি দেখে অসম্ভব মুগ্ধ হলেন তিনি। শুধু বললেন, মোমবাতি জ্বালিয়ে তো আমার মাজার তৈরি করে ফেলেছো!

এটা ছিল ৫৮তম জন্মদিন। ১৩ নভেম্বর ২০০৬। পরবর্তীতে এই ভাস্কর্যটি নুহাশপল্লীতে পদ্মপুকুরের পাশে রাখা হয়।

পরের বছর অর্থাৎ তাঁর ৫৯তম জন্মদিনের কথা। কিভাবে হুমায়ূন আহমেদকে চমকে দেওয়া যায়—বিস্তর শলা-পরামর্শ চলছে সে বিষয়ে। মোক্ষম পরিকল্পনাটি এলো লেখকপত্নী শাওনের মাথায়। পরিকল্পনা তাঁর এবং এই উপহারটিও তাঁর পক্ষ থেকে। চার রঙে একটি ক্যালেন্ডার ছাপা হবে। ১৩ নভেম্বর থেকে পরের বছরের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত এক বছর। ক্যালেন্ডারের প্রতি পাতায় থাকবে হিমু, মিসির আলি ও শুভ্র’র সাজে পুত্র নিষাদের সঙ্গে (তখনও নিনিতের জন্ম হয়নি), তার মা’র আনন্দময় কিছু মুহূর্তের ছবি। পরিকল্পনামতো ছবি তোলা হলো। গ্রাফিক্স আর মুদ্রণের কাজটি হলো আমাদের প্রেসে। জন্মদিনের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে শাওন যখন ক্যালেন্ডারটি তুলে দিলেন হুমায়ূন আহমেদের হাতে, কী যে বিস্ময় আর মুগ্ধতা তাঁর চোখে-মুখে!

এভাবেই তাঁর জন্মদিন পালন করেছি আমরা। একান্ত ঘরোয়া আয়োজনে, ঘনিষ্ঠজনদের সান্নিধ্যে।

তাঁর প্রয়াণের পর গত তিন বছরের বাস্তবতাটা একেবারেই আলাদা। তিনি আছেন তাঁর নিজের নদী ‘ময়ূরাক্ষী’র তীরে, ‘অনন্ত নক্ষত্রবীথি’তে। অদৃশ্য স্কাইপের মাধ্যমে আমরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করব। তাঁর আর দশটা জন্মদিনের মতোই আমরা উদযাপন করব। তিনি দেখবেন প্রিয়জনেরা তাঁর জন্মদিনে কত কী করছে। সেই অদৃশ্য স্কাইপে আমরা তাঁকে বলব, ‘শুভ জন্মদিন। হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ, স্যার।’

Post A Comment: