x

Decrease font Enlarge font
এক ॥ প্রাচীনতম ছবি
আমার ক্যামেরায় হুমায়ূন আহমেদের প্রথম ছবি তোলার ঘটনাটি মনে পড়লে লজ্জা পাই। ১৯৮৬ সালের ২১ জানুয়ারি তাঁর আজিমপুরের নিউ পল্টন লাইনের ভাড়াবাড়িতে যখন ইন্টারভিউ নিতে যাই, সঙ্গে ছিল আমার এক অটোফোকাস ক্যামেরা।

এই ক্যামেরা নতুন পেয়েছি, তোলার কায়দা কানুন শিখিনি। আমি পত্রিকায় দেখেছি, লেখকদের মুখের ছবি ছাপা হয়, একপাশ কালো থাকে, আরেক পাশে আলো। আমি বেশ কায়দা করে তাঁকে জানালার পাশে বসিয়ে ক্যামেরাটা মুখের খুব কাছে নিয়ে ছবি তুলি। সেই ক্যামেরার লেন্স ফিক্সড্। ৩৫ মি.মি অয়াইড। ছবি তোলা শেষে নেগেটিভ করা হয়, ছবি প্রিন্ট করা হয়। কিন্তু কোনো ছবিতেই হুমায়ূন আহমেদের চেহারা চেনা যায় না। ছবি ঘোলা। তার কোনো পোর্টেট ব্যবহার করতে পারিনি।



তবে পত্রিকায় দেখতাম যে, লেখকের সঙ্গে সাংবাদিকদের একটা ছবিও ছাপা হয়। সেই ছবির জন্য সেদিন তরুণ-কার্টুনিস্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, লেখকের ছোটভাই আহসান হাবীব আমাদের দুজনের একটা ছবি তুলে দিয়েছিলেন সেই ক্যামেরায়। এটাই আমার ক্যামেরায় হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে প্রাচীনতম ছবি।


দুই ॥ অটোগ্রাফ শিকারীর কবলে হুমায়ূন
১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। বইমেলা চলছে। আমি তখন নানা রকমের পত্রিকায় লিখে বেড়াই। একটা পাক্ষিক পত্রিকায় বইমেলা নিয়ে প্রচ্ছদকাহিনী করছি। স্টলে স্টলে ঘুরে বইয়ের খবর নিই, লেখকদের সঙ্গে কথা বলি। বইমেলায় তখন ইমদাদুল হক মিলন আর হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে ভক্তকুলের ভিড় বেশি। তারা দুজন বিভিন্ন স্টলে বসছেন। হুমায়ূন আহমেদের নতুন বই বেরিয়েছে—এইসব দিনরাত্রি। আগে এটা হিট ধারাবাহিক ছিল—এখন উপন্যাস বেরিয়েছে। এটাও হিট। তরুণীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। লেখকের সামনে বই মেলে ধরছেন, লেখক সই করে দিচ্ছেন।



একদিন এই তরুণীদের সারিতে দেখি তরুণ কবি ও চিকিৎসক তসলিমা নাসরিনও দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে আগের বছরও দেখেছি এই মেলায়। তিনি এপ্রোন পরে মেলায় এসেছেন, সঙ্গে এপ্রোন পরা আরো দুই-তিন তরুণী। তসলিমা তখন কবিতার আসরে স্বরচিত কবিতা পড়েন। টিএসসি এলাকায় বেশ পরিচিত।

আমার অটোফোকাস ক্যামেরায় একটা ক্লিক করি। পরবর্তীতে এ ছবিটা যখন প্রকাশ হয়, ক্যাপশন ছিল ‘ভক্তদের মাঝে হুমায়ূন আহমেদ’। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তসলিমা নাসরিন অনেক বিখ্যাত হয়ে যান। এখন সম্ভবত: এ ছবি ছাপা হলে ভিন্ন ক্যাপশন হবে।


তিন ॥ আগুনের পরশমনির আলোচনা সভায়
১৯৮৯ সালের ১৭ এপ্রিল। পত্রিকায় দেখলাম ধানমন্ডির গণগ্রন্থাগার মিলনায়তনে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর নতুন প্রকাশিত উপন্যাস ‘আগুনের পরশমনি’ নিয়ে আলোচনা করবেন। অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা আহমদ ছফা। পত্রিকার খবর দেখে চলে যাই সাত মসজিদ রোডের সেই মিলনায়তনে। সেখানে দেখি লেখক তাঁর উপন্যাসের কাহিনী শোনাচ্ছেন আর তরুণ-তরুণীদের নানা রকম প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন।



সামনের সারিতে বসে আছেন আহমদ ছফা। হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত গুছিয়ে কথা বলছেন। প্রত্যেকটা জবাবের সঙ্গে হাস্যরস মাখাচ্ছেন। পাবলিক খুব মজা পাচ্ছে। সেই আসরে তার কাহিনী নিয়ে বানানো ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ছবিটির ব্যাপারে একটু নাখোশ মন্তব্য করেন। বলেন, লোকে বলে এটা বড় টেলিভিশন নাটক হয়েছে। ‘টেলিফিল্ম’ টার্মটা তখনও চালু হয়নি। হলে হয়ত সেটার কথাই বলতেন।

সেই আসরে তিনি বলেন, এই উপন্যাস নিয়ে একটা ছবি বানানোর ইচ্ছা তার। প্রডিউসার পাচ্ছেন না। পেলে বানাবেন। এ ঘটনার ৫ বছর পর তিনি উপন্যাসটি নিয়ে ছবি বানান এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পান।


চার ॥ নুহাশপল্লীতে নিষাদের সাথে
মাঝখানে অনেক বছর হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ থাকে না। যোগাযোগ পুনরুদ্ধার হয়ে যায় ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, আমার ‘ক্লাস সেভেন ১৯৭৮’ বইটি প্রকাশের পর। মার্চের শেষের দিকে তাঁর আমন্ত্রণে—আমার বাড়ির কাছে কুলাউড়ার একটি গেস্ট হাউজে আমাদের একরাত থাকা হয়। ‘আমার আছে জল’ ছবির শুটিং হচ্ছিল সেখানে। শুটিংয়ের বাকি কাজ করার জন্য তিনি সরাসরি চলে যান নুহাশপল্লী। সেখানেও যেদিন শুটিং শেষ হয়ে গেল, সেদিনই আবার আমার ডাক পড়ল, নুহাশপল্লীতে। সঙ্গী অন্যপ্রকাশ-এর মাজহারুল ইসলাম। এই প্রথম আমার নুহাশপল্লী দেখা।



৯ এপ্রিল ২০০৮। সকালবেলা নাস্তা খেয়ে আওয়াজ দিলাম ঢাকা যাব। হবে না। পুকুরে জাল ফেলা হয়েছে। বড়সড় একটা রুই মাছ ধরা হয়েছে। এই মাছ এখনো লেজ নাড়াচ্ছে। বারবার হয়ত বলছে—আমাকে আবার পুকুরে ফেলে আসো। কিন্তু কে শোনে তার কথা। এই মাছ আজ দুপুরে আমাদের উদরে যাবে। তার আগে একটু হাঁটাহাঁটি দরকার।

আমাকে নিয়ে বেরুলেন নুহাশপল্লীর বোটানিক্যাল গার্ডেনের গাইডেড ট্যুরে। আমরা নানা রকমের ঔষধী বৃক্ষ দেখলাম, ভাস্কর্য দেখলাম এবং পুরো পুকুরপাড় ঘুরে এসে যখন ঘরের ভেতর ঢুকব—নির্দেশনা এলো, সুইমিংপুলে নামতে হবে সবার।

নুহাশপল্লীতে একটা কৃত্রিম ডোবা আছে। এখানে মটর দিয়ে পানি ভরা হয়। তার তলায় নীল রঙের টাইল্‌স লাগানো। স্বচ্ছ পানির ভেতর দিয়ে দেখা যায় পুলের তলা বরাবর। সেখানে হুমায়ূন ও অন্যদিন পরিবারের সবার সঙ্গে আছেন নায়ক জাহিদ হাসানও। একসময় দেখি দেড় বছর বয়েসী পুত্র নিষাদকে তিনি পরম মমতায় ধরে ধরে পানিতে চুবাচ্ছেন আর মাঝে মাঝেই তাকে বেঞ্চের ওপর বসিয়ে একা একা কথা বলছেন।

আমি ডোবা থেকে উঠে গিয়ে ক্যামেরা ধরি। নুহাশপল্লীর সুইমিংপুলে পুত্র নিষাদকে নিয়ে তার একটা ছবি তুলি।


পাঁচ ॥ সুন্দরবনের জাহাজে একাকী হুমায়ূন
২০০৯ সালের ১১ জানুয়ারি। ৫ দিনের জন্য সুন্দরবন সফরে বেরিয়েছি আমরা। ২০০৮-এর এপ্রিল মাস থেকে তাঁর সঙ্গে আমার দহরম মহরম। সপ্তাহে ৩/৪ দিন দেখা হচ্ছেই। তিনি যেখানে যাচ্ছেন—অবশ্যসঙ্গী আমিও। ইমপেরিয়েল কলেজ তাদের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে কয়েক বছর ধরে এ ধরনের আয়োজন করছে। অন্যপ্রকাশ-এর মাজহারুল ইসলাম এই কলেজের গভনিং বডির সদস্য। সুতরাং তাঁর আমন্ত্রিত প্রধান অতিথি হুমায়ূন আহমেদ, আর অন্য অতিথিরা সব হুমায়ূনের সঙ্গী। আমিও সেই দলে একজন। চারতলা এই জাহাজের সবচেয়ে উপরের তলায় আমাদের কেবিন। আমার জন্য সিঙ্গেল কেবিন, তার পাশের ডাবল কেবিনটা হুমায়ূন আহমেদের।



পরদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই দেখি তিনি একা একা পায়চারি করছেন বারান্দায়। আমি ভেতর থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে আসি। পায়চারি থেমে যায়। দেখি বারান্দার রেলিং ধরে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের সামনে তখন নদী না সমুদ্র ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কারণ, ওপারে কিছুই দেখা যায় না। কিছু জেলে নৌকা, কিছু গাঙচিল। তিনি একা একা নিজের সঙ্গে যখন কথা বলছেন, আমার ডিএসএলআরে একটা চাপ দেই। এই সেই ছবি।


ছয় ॥ প্রিয় পোর্টেট
হুমায়ূন আহমেদ ক্যামেরাবান্ধব ছিলেন না। ক্যামেরা বাড়ালেই বলতেন—ধুর, রাখো এসব ছাতামাতা, বসো, গল্প করো। যখন আমার ভালো ক্যামেরা ছিল না তখন তাকে নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করেছিলাম, আমার দোষে ছবি হয়নি। পরে যখন আমার এসএলআর-ডিএসএলআর হলো, তখন ছবি তোলার জন্য আর তাঁকে বাগে পাই না।



সুন্দরবন সফরের সময় (২০০৯, জানুয়ারি) আমাদের সবারই অবসর। হুমায়ূন আহমেদ নিজেও তার নাইকন হাতে নিয়েছেন। আমরা নদী, গাছপালা, পাখি এসবের ছবি তুলি। একবার জাহাজের ডেকে উঠে আমরা দেখি, যতজন যাত্রী, ততটি ক্যামেরা। দামি দামি ক্যামেরার বাইরে মোবাইল ফোন তো আছেই। হুমায়ূন আহমেদ ঘোষণা করে বসেন—এখন থেকে একটা ফটো কনটেস্ট হবে। প্রত্যেকে ১০টি করে ছবি জমা দেবে নুহাশপল্লীতে গিয়ে। সেই ১০টা করে পাওয়া ছবি থেকে ফার্স্ট-সেকেন্ড পুরস্কার ঘোষণা করা হবে এবং প্রথম ১০টি ছবি বাঁধাই করে নুহাশপল্লীতে রাখা হবে।

ফটো প্রতিযোগিতার কথা শুনে উৎসাহ বেড়ে যায় সবার। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কারণ, একজনের তোলা একটা ছবি ক্যামেরার এলসিডিতে দেখেই তিনি রায় ঘোষণা করেন—এটাই ফার্স্ট। সেই যাত্রায় হুমায়ূনের একটা পোর্টেট তুলে খুব মজা পেয়েছিলাম।

আমরা একসময় বড় জাহাজ থেকে নেমে ছোট ইঞ্জিন নৌকায় উঠি। এই নৌকা আমাদের নিয়ে যাবে খালের মধ্য দিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে। আমার পাশেই হুমায়ূন আহমেদ। একসময় দেখি চিবুকে হাত দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে সুন্দরবন দেখছেন তিনি। তার মুখের একপাশে রোদ পড়েছে। অপর যে পাশটিতে ছায়া, সেখানে পাশের একটা ঘাটের বেড়া থেকে প্রতিফলিত আলো এসে ছায়াটাকে আলোকিত করে দিয়েছে। আমি পরপর দু’টো ছবি তুলি তাঁর। একটি ব্যবহার করি হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে লেখা আমার প্রথম স্মৃতিগ্রন্থ ‘যে ছিল মুগ্ধকর’(প্রথমা)-এর প্রচ্ছদে। প্রচ্ছদের জন্য এ ছবিটাই পছন্দ করেছিলেন বইটির ডিজাইনার—কাইয়ুম চৌধুরী। আমার তোলা হুমায়ূন আহমেদের সব ছবির মধ্যে এটাই আমার সবচেয়ে প্রিয়।


সাত ॥ সর্বোচ্চ সংখ্যক সাংবাদিকের মুখোমুখি
হুমায়ূন আহমেদ একসাথে সর্বোচ্চ সংখ্যক সাংবাদিকের মুখোমুখি হয়েছিলেন ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। একবার ১১ মে ২০১২, চিকিৎসা বিরতিতে তিনি দেশে আসেন। দ্বিতীয়বার ২২ জুলাই ২০১২-য় যখন তার লাশ আসে, সেই বিমানবন্দরের একই লাউঞ্জে এসে নামে।

দু’টো ঘটনার সময়ই আমি উপস্থিত ছিলাম। প্রথমবার কুয়েত এয়ারের বিমান থেকে নামার পর ভিআইপি এরাইভাল লাউঞ্জে আমরা বেশ কিছুক্ষণ কথা বলি আমার আইপ্যাড নিয়ে। ডিএসএলআর বাদ দিয়ে আইপ্যাডে ছবি তুলছি দেখে তিনি অনেক হাসাহাসি করলেন। বললেন, তোমার এই খেলনায় ছবি কেমন আসে? ডেপথ অব ফিল্ড কন্ট্রোল করো কী দিয়া?



আমিও হাসি। বলি, সাধারণ ছবির জন্য এটা খুবই আরামের। সাথে সাথে এডিট করা যায়, মেইল করা যায়, ফেসবুকে আপ দেয়া যায়, অনেক সুবিধা। তিনি নিজেও একটা কিনেছেন। আইপ্যাড ওয়ান। আমারটা পরের ভার্সন। এটাতে কী কী সুবিধা বেশি, সেগুলো দেখেন। দু’য়েকটা ছবি নিজেও তোলেন।

প্রায় আধাঘণ্টা পর আমরা ভিআইপি লাউঞ্জ থেকে একসঙ্গে বেরোই। গোটা বিশেক ক্যামেরা তাক করা আছে তাঁর দিকে। একসঙ্গে এত ফটোগ্রাফার তিনি এর আগে কখনো মোকাবেলা করেছেন বলে আমার জানা নেই। এত সাংবাদিককে একসাথে দেখে প্রথম তিনি যে কথাটি পুনরাবৃত্তি করে দুইবার বলেন—‘আমি অভিভূত’। এরপর রজনীকান্ত সেনের একটা গানের কথা বললেন, ‘আমি অকৃতি অধম বলেও তো কিছু কম করে মোরে দাও নি/ যা দিয়েছো তারই অযোগ্য ভাবিয়া কেড়েও তো কিছু নাও নি।’ ধন্যবাদ জানালেন সাংবাদিকদের। তাঁরা প্রশ্ন করলেন চিকিৎসা নিয়ে, ডাক্তার কী বলল—এসব নিয়ে। হুমায়ূন আহমেদ শাওনের দিকে ইঙ্গিত করেন। বলেন, এ বিষয়টা ও গুছিয়ে বলতে পারবে ভালো। শাওন কথা বলে। আমরা পাশে দাঁড়িয়ে শুনি।


আট ॥ ভোরের নরম আলোয়
২৫ মে ২০১২। নুহাশপল্লীতে আমি আর কমল ড্রইংরুমের মেঝের ওপর ঘুমিয়েছি। এ ঘরটি অনেক আরামের। কিন্তু আজ আরাম মনে হলো না। রাতে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল, ভোর পর্যন্ত এলো না। সে কারণে এ ঘরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্রটি কাজ করছে না। গরমের ঠেলায় বেশ ভোরে আমার ঘুম ভেঙে যায়।

একবার মনে হলো কেউ যেন দরোজা খুলল। আমি কমলকে পাশের বিছানায় ফেলে রেখে ধীরে ধীরে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ি। দেখি, থ্রি কোয়ার্টার একটা প্যান্ট আর স্ট্রাইপ করা, রাতে শোয়ার কারণে ভাঁজ খাওয়া একটা হাফশার্ট পরে হুমায়ূন আহমেদ গাছতলা দিয়ে একা একা হাঁটছেন।



ভোরের শিশির পড়েনি ঘাসের ডগায়। কিন্তু গতরাতের বৃষ্টির রেশ রয়ে গেছে নরম সবুজ ঘাসের ওপর। তার সঙ্গে ভোরের শীতল মিষ্টি হাওয়া। আমি জাপানী বটের নিচের বেঞ্চিতে বসে থাকি, হুমায়ূন হাত দু’টো পেছনে দিয়ে একা একা হাঁটছেন। কখনো বা কোনো গাছের পাশে গিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে দিচ্ছেন, আবার একটু হাঁটছেন। যেন সবগুলো গাছের সঙ্গে তাঁর এখন দেখা করার কথা, গল্প করার কথা, সবার খোঁজ-খবর নেওয়ার কথা। আমার কখনো দেখার সুযোগ হয়নি, তবে নুহাশপল্লীর লোকজনের কাছে শুনেছি, তিনি নাকি গাছগুলোর সঙ্গে কথা বলতেন। গাছের পাশে গিয়ে বলতেন, এই ব্যাটা, তোর হয়েছেটা কী, বাড়ছিস না কেন? ওরা কি তোর খাবারদাবার ঠিক মতো দেয় না?

নিজের হাতে চারা লাগানো, গাছ লাগানো, বীজ বোনা এবং সেখান থেকে ধীরে ধীরে একটা চারাকে বৃক্ষে রূপ নেওয়ার সবগুলো স্তর তার নিজের দেখা, সন্তানের মতো মমতা দিয়েই বৃক্ষপ্রেমী এই মানুষটা একটা জঙ্গলকে উদ্যানে পরিণত করেছেন। আর সেকারণেই নুহাশপল্লীতে বেড়াতে আসা যেকোন অতিথিকে নিয়ে প্রথমেই নিজের গাছপালার রাজ্য দেখানোতে তাঁর সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল।

এই গাছগুলোর নিচে এরপর আর কখনো তাঁর দাঁড়ানো হয়নি।


নয় ॥ বাপ-বেটার মধুর ছবি
নুহাশপল্লীতে সেদিন (২৫ মে ২০১২) একেবারেই অন্যরকম ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর চলাচল, কথাবার্তা, হাঁটাহাঁটি কোনো কিছু দেখে কোনোভাবেই আঁচ করার সুযোগ ছিল না যে, কঠিন একটা অসুখ শরীরের ভেতর নিয়ে তিনি আছেন। দু’সপ্তাহ পরেই তার অপারেশন। সেদিন আরেকটা বিষয় দেখেছি—সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন অনর্গল। একই প্রশ্ন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন সাংবাদিক করছেন। তাদের সবাইকে আবার একই উত্তর দিচ্ছেন না। ভিন্ন ভিন্ন জবাব দিচ্ছেন। নুহাশপল্লীতে তাঁর বড় ঘরটার পাশে রট-আয়রনের চেয়ারে বসে বেশিরভাগ কথা বলেছেন। একবার উঠে গেলেন। সঙ্গে শিশুপুত্র নিষাদ। নিষাদ তার হাত ছাড়ছে না। তিনি হাঁটছেন, সাংবাদিকরা দৌঁড়াচ্ছেন। কেউ আগে, কেউ পেছনে। বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখা শেষ করে ঢালু বেয়ে নামলেন নিচে। সেখানে একটা ডোবা আছে। তাঁর ওপর মৎসকন্যা, আর ডোবার পাড়ে এক দৈত্য মুখ বের করে শুয়ে আছে। যেন এই দৈত্যের সঙ্গে কথা বলার জন্য এইমাত্র পানির ভেতর থেকে উঠে এসেছে এক মৎসকন্যা।



এর পাড়টা সম্ভবত নিষাদের খুব পছন্দ হয়েছে। তাকে নিয়ে বসে পড়লেন এখানে। ডোবার জলে পড়েছে বাপ-বেটার ছায়া। নিষাদ কী যেন জিজ্ঞেস করল তাঁকে। তিনি মুখ ঘুরিয়ে জঙ্গলের দিকে তাকালেন, সঙ্গে নিষাদও। আর সেই মুহূর্তে আইপ্যাডের ক্যামেরার বোতামে চাপ দেই। বাপ-বেটার এমন মধুর ছবি আমি আগে তুলিনি।


দশ ॥ দখিন হাওয়ার বারান্দায়
হুমায়ূন আহমেদ খুব ধূমপান করতেন। কিন্তু ঘরের ভেতর এটা করার জন্য খুব সুবিধাজনক কোনো জায়গা ছিল না তাঁর। প্রায় সব জায়গায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, সুতরাং ধোঁয়া বেরোনোর জায়গা কোথায়?

এ কারণে ঘরের মধ্যে তাঁর এক চিলতে একটা বারান্দা ছিল। ফ্যামিলি লিভিং স্পেস-এর সঙ্গে যুক্ত এই বারান্দাটিতে থাকত একটা রকিং চেয়ার। পাশে একটা স্তম্ভের ওপর এশট্রে। এ জায়গাটি তাঁর খুব প্রিয় ছিল। দিনের বেলা এখানে বসে সিগারেট ফুকতে ফুকতে তিনি বই পড়তেন, চা-কফি খেতেন।



২০১১ সালের ২৮ মে, যেদিন বিকেলবেলা এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন গুলশানে, শ্বশুড়বাড়িতে—সেদিন দুপুরের খাবারে তাঁর সঙ্গী হবার জন্য ডাক পড়ল।

ভর দুপুরে তাঁর বাড়িতে আমার খুব কমই যাওয়া হতো। চিকিৎসা বিরতির এই সময়ে এটা হচ্ছে। এর আগেও আরো ২/৩ বার দুপুরবেলা খেয়ে গিয়েছি দখিন হাওয়ার এই বাড়ি থেকে।

ভেতরে ঢুকতেই দেখি হুমায়ূন আহমেদ পেছনের বারান্দার রকিং চেয়ারে বসে একটা বই পড়ছেন। ক্যান্সার ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সিগারেট ছেড়েছেন। এখন এই বারান্দায় এশট্রে নেই, শুধু চেয়ার, আর তাঁর পড়ার বই।

আমি কথা বলার আগেই আইপ্যাডের ফটো বোতামে চাপ দিয়ে ছবিটা তুলে রাখি। এটাই আমার তোলা জীবিত হুমায়ূন আহমেদের সর্বশেষ ছবি।

Post A Comment: