তার বাবা ছিলেন ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়। বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে স্কুল জীবনের পুরো সময়টাতে ব্যাডমিন্টনই ছিল দীপিকার ধ্যান-জ্ঞান। কিন্তু পরে চলে গেলেন ফ্যাশন মডেলিংয়ে, তারপর চলচ্চিত্রে। এখন ভারতের সবচেয়ে দামী অভিনেত্রী তিনি।
 
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
জন্ম ৫ জানুয়ারি, ১৯৮৬, ডেনকার্কের কোপেনহেগেনে, উচ্চতা ৫ ফুট সাড়ে আট ইঞ্চি। তার বাবা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়। বাবা-মা দুজনই কনকানিভাষী। মা ট্রাভেল এজেন্ট, ছোট বোন অনিশা গলফ খেলোয়াড়। দীর্ঘদিন কর্ণাটকের মাইশর ব্যাডমিন্টন এসোসিয়েশনের সেক্রেটারী ছিলেন তারা দাদা রমেশ।
 
কোপেনহেগেনে জন্ম হলেও বেড়ে উঠেছেন ব্যাঙ্গালোরে। দীপিকার বয়স যখন এক তখন তার বাবা-মা পরিবারের সবাইকে নিয়ে আসেন ব্যাঙ্গালোরে।
 
পড়াশোনা
ব্যাঙ্গালোরের সোফিয়া হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববর্তী শিক্ষা সম্পন্ন করেন মাউন্ট কার্মেল কলেজ থেকে। এরপর ইন্দিরা গান্ধী উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক কোর্সে ভর্তি হন। তবে মডেলিংয়ের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে পড়াশোনা আর হয় নি তার।
 
শৈশবের দিনগুলি
শৈশবে সামাজিকতায় খুব একটা পটু ছিলেন না, খুব বেশি বন্ধু ছিল না তার।  সমস্ত মনোযোগ ছিল ব্যাডমিন্টন খেলায়, অল্প বয়স থেকেই প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি হয়েছিল তার মধ্যে।
 
২০১২ সালে দেয়া এক সাক্ষাতকারে শৈশবের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে বের হতেন শরীরচর্চার প্রশিক্ষণ নিতে। এরপর যেতেন স্কুলে। স্কুল থেকে যেতেন ব্যাডমিন্টন খেলতে। সবশেষে স্কুলের হোমওয়ার্ক করে ঘুমোতে যেতেন।
 
স্কুল জীবনের পুরোটাতেই তার মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল ব্যাডমিন্টন খেলা। জাতীয় পর্যায়ের ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। রাজ্য পর্যায়ের বেসবল প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিয়েছেন।
 
শৈশবে পড়াশোনা এবং ব্যাডমিন্টন নিয়ে থাকলেও ক্ষুদে মডেল হিসেবেও কাজ করেছেন। আট বছর বয়সে দু’টি বিজ্ঞাপন চিত্রে কাজ করেন।
 
স্কুল জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে দীপিকা স্থির করেন খেলাধুলা নয়, তিনি বরং ফ্যাশন মডেল হবেন।
 
দীপিকা বলেন, তিনি ব্যাডমিন্টন খেলছিলেন কারণ ওরকম একটি পরিবারে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। তিনি যখন তার বাবাকে ব্যাডমিন্টন ছাড়ার কথা বলেন তার বাবা মোটেও কষ্ট পান নি।
ফ্যাশন মডেলিংয়ে পা রাখা
২০০৪ সালে পুরোদস্তুর ফ্যাশন মডেলে পরিণত হন তিনি। ভারতের ফ্যাশন গুরু এবং কোরিওগ্রাফার প্রসাদ বিদাপার তত্ত্বাবধানে শুরু হয় দীপিকার নতুন পথচলা।
 
ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে লিরিল সাবানের জন্য নির্মিত একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের মাধ্যমে সবার নজরে আসেন  তিনি। এরপর আরও ব্র্যান্ড এবং পণ্যের জন্য মডেলিং করেন।
 
ডিজাইনার সুনিম ভর্মার জন্য ল্যাকমে ফ্যাশন উইকে প্রথমবারের মত ক্যাটওয়াকে অংশ নেন দীপিকা। এটা ছিল ২০০৫ সাল, আর এজন্যই কিংফিশার ফ্যাশন এওয়ার্ড থেকে মডেল অব দি ইয়ার পদক জিতে নেন। দীপিকা পাডুকোনের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে যখন ২০০৬ সালে কিংফিশার ক্যালেন্ডারে তার ছবি ছাপা হয়।
 
ঐশ্বরিয়া রায়ের পর এমন সুন্দরী মডেল আর পাওয়া যায় নি বলে মন্তব্য করেন ডিজাইনার ওয়েনডেল রডরিকস। ২১ বছর বয়সে মুম্বাই চলে আসেন দীপিকা, ওঠেন খালার বাসায়।
 
মিউজিক ভিডিওতে কাজ করা এবং চলচ্চিত্রের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়া
হিমেশ রেশাম্মিয়ার গান ‘নাম হায় তেরার’ জন্য নির্মিত মিউজিক ভিডিওতে কাজ করে আরও পরিচিত হয়ে ওঠেন। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে। কিন্তু দীপিকা তখনই ওপথে পা বাড়ালেন না। অতটা অভিজ্ঞতা তখনো হয় নি মনে করে প্রস্তাবগুলো ফিরিয়ে দিলেন। ভর্তি হলেন অনুপম খেরের ফিল্ম একাডেমীতে।
 
মিউজিক ভিডিওতে কাজ করার সুবাদে পরিচালক ফারাহ খানের নজরে আসেন দীপিকা। ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ চলচ্চিত্রের একটি চরিত্রে দীপিকাকে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
চলচ্চিত্রে অভিষেক
২০০৬ সালে চলচ্চিত্রে নামার ঘোষণা দেন দীপিকা। কর্ণাটকের এই ছবির নাম ‘ঐশ্বরিয়া’ আর পরিচালক ছিলেন ইন্দ্রজিৎ লালকেশ। রোমান্টিক কমেডি ধাঁচের এই ছবিটি ছিল তেলেগু ছবি মনমধুর রিমেক। একটি ছোট চরিত্রে অভিনেতা উপেন্দ্রের বিপরীতে অভিনয় করেন দীপিকা। ব্যবসাফল এই ছবিতে দীপিকার অভিনয় প্রশংসিত হলেও আবেগঘন দৃশ্যে আরও কিছু করার আছে বলে মত দেন চলচ্চিত্রবোদ্ধারা।
ওম শান্তি ওম
২০০৬ সালের শেষ দিকে এসে পরিচালক ফারাহ খান ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ চলচ্চিত্রের উদ্যোগটি স্থগিত করেন। ২০০৭ সালে দীপিকাকে নেন মেলোড্রামা ‘ওম শান্তি ওম’ এর জন্য। কাহিনীটির প্রেক্ষাপট ১৯৭০ সাল। একজন অভিনেতা তার প্রিয়তমার হত্যাকান্ড দেখার পরই মারা যায়। কিন্তু প্রতিশোধ নেয়ার জন্য পুনর্জন্ম হয় তার। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন শাহরুখ খান। দীপিকা অভিনয় করেন দ্বৈত চরিত্রে; শান্তিপ্রিয়া খান যিনি ১৯৭০ সালের একজন তুমুল জনপ্রিয় অভিনেত্রী, আরেকটি চরিত্র হচ্ছে স্যান্ডি, যে একজন উচ্চাভিলাষী অভিনেত্রী।
 
দীপিকা বলেন আমি শাহরুখের দারুণ ভক্ত, তাকে দেখেই বড় হয়েছি। শাহরুখের সাথে কাজ করাটা একটা চমৎকার অভিজ্ঞতা। শাহরুখের বিপরীতে অভিনয় করার জন্য তার ওপর আস্থা রাখায় পরিচালক ফারাহ খানকে ধন্যবাদও জানান তিনি।
 
ছবিটিতে কাজ করার প্রস্তুতিপর্বে হেলেন এবং হেমা মালিনী অভিনীত কয়েকটি ছবি দেখেন। দীপিকার মতে তাদের শরীরী ভাষা বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল অনেক বেশি সাবলীল, যা এ সময়ের অভিনেত্রীদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
 
মোট ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে ছবিটি। বিনোদন ওয়েবসাইট বলিউড হাঙ্গামার সম্পাদক তরুণ আদর্শের মতে তারকা হতে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিত্ব, চাহনি সবকিছুই আছে দীপিকার মধ্যে। একই সাথে সাংঘাতিক প্রতিভাবানও বটে। একই ফ্রেমে শাহরুখের মত অভিনেতার সাথে ঠিকঠাকমত কাজ করে ফেলাটা চাট্টিখানি কথা নয়। বার্ষিক চলচ্চিত্র পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সেরা নবাগত অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। এবারই প্রথমবারের মত সেরা অভিনেত্রী পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পান। ওম শান্তি ওম ছবির সাফল্য দীপিকার ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করে।
 
ব্যর্থতার শুরু
২০০৯ সালে মুক্তি পায় নিখিল আদভানী পরিচালিত কুংফু কমেডি চাদনী চক টু চায়না। এখানে ভারতীয় এবং চীনা বংশদ্ভুত জমজ বোনের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন দীপিকা। ওয়ার্নার ব্রাদার্স প্রযোজিত এই চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রেকর্ড সৃষ্টি করে। ছবিটির জন্য জাপানী মার্শাল আর্ট শেখেন দীপিকা, স্টান্টও ব্যবহার করেন নি। অনেক আলোচনা সত্ত্বেও ব্যবসায়িক ব্যর্থতায় পর্যসিত হয় ছবিটি। ১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেটের এই ছবিটি আয় করে ৯.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলচ্চিত্র সমালোচকদেরও হতাশ করে দীপিকার অভিনয়। একই বছর বিল্লু ছবির আইটেম গানে কাজ করেন তিনি।
 
লাভ আজকাল
ইমতিয়াজ আলীর ‘লাভ আজকাল’ ছবিতে সাইফ আলীর বিপরীতে দেখা যায় তাকে। বর্তমান সময়ের তরুণদের মাঝে মূল্যবোধের পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরা হয় এ ছবিতে। দৃঢ়চেতা ক্যারিয়ার সচেতন নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ছবিটি বিশ্বজুড়ে ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসা করে। ২০০৯ সালে কোন ভারতীয় ছবির তৃতীয় সর্বোচ্চ আয় এটি। ভারতীয় দৈনিক নিউজ এন্ড এনালাইসিসের অনিরুদ্ধ গুহের মতে দীপিকার সেরা চারটি কাজের মধ্যে একটি এই ছবিটি। ৫৫তম ফিল্মফেয়ার এওয়ার্ডে সেরা অভিনেত্রী হিসেবে মনোনয়ন পান।
 
২০১০-২০১১ সালের লড়াই
এ সময় কিছুটা ভাটা আসে দীপিকার ক্যারিয়ারে। তার পাঁচটি ছবি মুক্তি পায় ২০১০ সালে। এ বছরের প্রথম ছবিটি ছিল বিজয় লালওয়ালীর ‘কার্তিক কলিং কার্তিক’। বিষন্নতায় আক্রান্ত এক ব্যক্তিকে সারিয়ে তুলতে নারীবন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ছবিটির কাহিনী খুব সাধারণ মানের বলে সমালোচিত হয়। তবে দীপিকার পাকা অভিনয়ে সে ঘাটতি অনেকটা কাটিয়ে ওঠে ছবিটি। এরপরও ছবিটি ব্যবসাসফল হতে পারে নি। এ বছর দীপিকা অভিনীতে সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি ছিল সাজিদ খান পরিচালিত কমেডি ফিল্ম হাউসফুল। ১৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসা করে ছবিটি। ছবিটি ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমী। দীপিকা ছাড়াও অক্ষয় কুমার, রিতেশ দেশমুখ, লারা দত্ত, অর্জুন রামপাল, জিয়া খান এবং বোমান ইরানীর মত খ্যাতনামা শিল্পীরা অভিনয় করেন। কোন চরিত্রকেই সেভাবে প্রাধান্য দেয়া হয় নি ছবিটিতে। কিন্তু তিনবার জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী পরিচালক রাজা সেন ছবিটিকে বাজে অভিনয়ের উৎসব বলে মন্তব্য করেন। দীপিকার অভিনয়ও কৃত্রিম বলে মন্তব্য করেন।
 
একই বছর রোমান্টিক ধাঁচের ছবি লাফাঙ্গে পারিন্দিতে অভিনয় করেন দীপিকা। নীল নীতিন মুকেশের বিপরীতে একটি অন্ধ মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন দীপিকা। স্কেটিং প্রতিযোগিতা জিততে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মেয়েটি। এ ছবির জন্য প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে অন্ধদের পর্যবেক্ষণ করেন। অন্ধদের মতই চোখ বেঁধে রিহার্সেল করেন।
 
দ্যা হিন্দু পত্রিকায় সুধীশ কামনাথ লেখেন, ছবিটিতে কাজ করতে গিয়ে যথেষ্ট ধৈর্য্য দেখিয়েছেন দীপিকা। বছরের পরের দিকে হিন্দুস্তান টাইমসে লেখে, আগে দীপিকার গ্ল্যামারের দিকেই মানুষের নজর ছিল। কিন্তু ছবিটিতে কাজ করার পর দীপিকার প্রতিভা আর অভিনয় দক্ষতা সম্পর্কে অন্যরকম একটি ধারণা পেয়েছে মানুষ।
 
এরপর দীপিকা কাজ করেন দানিশ আলম পরিচালিত রোমান্টিক কমেডি ‘ব্রেক কি বাদ’ ছবিতে। এখানে দীপিকার বিপরীতে ছিলেন ইমরান। তবে লাফাঙ্গি পারিন্দি এবং ব্রেক কি বাদ, দু’টি ছবিই ব্যর্থ হয় বক্স অফিসে।
 
২০১০ সালে দীপিকা পাডোকুনের শেষ ছবিটি ছিল আশুতোষ পরিচালিত কেহলিন হুম সে জান সে। এখানে অভিষেক বচ্চনের বিপরীতে অভিনয় করেন তিনি। ছবিটি নির্মিত হয় মান্নি চ্যাটার্জীর বই ‘ডু এন্ড ডাই’-এর ওপর ভিত্তি করে।
 
১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুটের প্রেক্ষাপটে এগিয়ে চলে ছবিটির কাহিনী। অভিষেক বচ্চন অভিনয় করেন সূয সেনের চরিত্রে। সূর্য সেনের বিশ্বস্ত অনুসারী কল্পনা দত্তের চরিত্রে অভিনয় দীপিকা।
 
দীপিকা বলেন, কল্পনার কর্মকান্ড নিয়ে বেশি কিছু তথ্য যোগাড় করা সম্ভব ছিল না। কয়েকটি আলোকচিত্র পাওয়া গেছে কেবল। এ ছবিটিও বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় নি। তবে কল্পনা দত্তের চরিত্রটি যথার্থভাবেই দীপিকা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন বলে মন্তব্য চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের।
২০১২ সাল এবং পরের ঘটনা
২০১২ সালে দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে দীপিকা বলেন হোমি আদজানিয়া পরিচালিত রোমান্টিক কমেডি ককটেল ছিল তার ক্যারিয়ারের জন্য একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। রেডিফ ডট কমের রাজা সেন মন্তব্য করেন, এ ছবির মাধ্যমে দীপিকা দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি কেবল বিমোহিতই করতে জানেন না, অভিনয়ও জানেন।
 
এ ছবিতে সাইফ আলী খান লন্ডন প্রবাসী এক সফওয়্যার প্রকৌশলীর চরিত্রে অভিনয় করেন। তার সাথে পরিচয় হয় ভিন্ন মেজাজের পার্টি গার্ল ভেরোনিকার। এই ভেরোনিকা চরিত্রেই অভিনয় করেন দীপিকা। ছবিটিতে আরেকটি নারী চরিত্র ছিল। প্রযোজক দীনেশ বীজন দীপিকাকে পছন্দের চরিত্রটি বেছে নেয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন।
 
দীপিকা ভোরোনিকা চরিত্রটিই বেছে নেন। তার মতে অভিনয়ের বেশি সুযোগ ছিল চরিত্রটিতে। চরিত্রটিতে অভিনয় করতে গিয়ে সৃজনশীলতার পাশাপাশি শারীরিক সামর্থ্যের প্রমাণও দিতে হয়েছে। প্রস্তুতিপর্বে শরীরচর্চার পাশাপাশি খাবারের কঠোর নিয়ম মেনে চলেন।
 
ছবিটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মত ছিল সমালোচকদের মাঝে। কিন্তু দীপিকার অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন তাদের সবাই। দেবেশ শর্মার মতে দীপিকা ছিলেন ছবিটির প্রাণ, যিনি প্রতিটি দৃশ্যে নিজেকে অতিক্রম করেছেন।
ঈর্ষাকাতর তরুণী সে; মাদক, রক এন্ড রোল বা কাম সবকিছুই সে উপভোগ করে। আবার নিজেকে ধ্বংসও করে দিতে চায়, এমন একটি চরিত্র সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন দীপিকা। বক্স অফিসে সাফল্যের পাশাপাশি একাধিক চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পান। যার মধ্যে আছে ফিল্মফেয়ার, স্ক্রীন, আইআইএফএ।
 
২০১৩ সালে ভারতের শীর্ষ চলচ্চিত্র অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সর্বোচ্চ আয় করা ছবিগুলোর চারটিতেই ছিলেন দীপিকা।  এ বছরই ২০০৮ সালের চলচ্চিত্র রেসের সিক্যুয়েল রেস ২ মুক্তি পায়। তারকাবহুল এ ছবিতে দীপিকা ছাড়াও ছিলেন সাইফ আলী খান, জন আব্রাহাম, জেক্যুলিন, ফার্নান্দেজ, আমিশা প্যাটেল এবং অনিল কাপূর। ছবিটি সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্যই বেশি ছিল। কিন্তু ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্যের মুখ দেখে, ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে। ২০১৩ সালেই ‘গলিওনকি রাস লীলা রাম লীলা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ‘ফিল্মফেয়ার এওয়ার্ড’ তাকে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার দেয়।
 
এরপর মুক্তি পায় ‘ইয়ে জাওয়ানী হায় দিওয়ানী’ ছবিটি। আয়ন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত এ ছবিতে দীপিকা ছাড়াও ছিলেন রণবীর কাপূর, কালকি কেয়েচলিন এবং অদিত্য রায়। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য প্রশংসা অর্জন করেন দীপিকা, যদিও ছবিটি সম্পর্কে মতামত ছিল মিশ্র। রাজা সেন মন্তব্য করেন, ছবিতে কাহিনী ছিল না ঠিকই কিন্তু দীপিকা তার চমৎকার অভিনয়ের ধারা বজায় রাখেন। এ ছবিতেই মোহনীয় মেয়ের চরিত্র থেকে বেরিয়ে সাধারণ মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। সাবেক ছেলেবন্ধু রণবীর কাপূরের সাথে অভিনয় করার কারণে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হয় ছবিটি নিয়ে। ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে এটি।
 
এরপর দীপিকা শাহরুখ খানের বিপরীতে অভিনয় করেন চেন্নাই এক্সপ্রেস ছবিতে। রোহিত শেঠী পরিচালিত এ ছবিটি ছিল অ্যাকশন কমেডি ধাঁচের। এক তামিল তরুণীর চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। তামিল উচ্চারণে কথা বলাটা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল দীপিকার জন্য। এ কাজে তিনি কতটা সফল তা নিয়ে মিশ্র মত তৈরি হয়। তবে তার অভিনয় এখানেও প্রশংসিত হয়। ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ আয় করে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
 
বলিউড ইতিহাসে সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ড সৃষ্টি করে ইয়ে জাওয়ানী হ্যায় দিওয়ানী এবং চেন্নাই এক্সপ্রেস ছবি দু’টি।
 
এরপর পাডুকোন অভিনয় করেন রণবীর সিং এর বিপরীতে গলিওন কি রাসলীলা রামলীলা ছবিতে। ছবির কাহিনীটি তৈরি হয়েছে শেক্সপিয়ারের ‘রোমিও জুলিয়েট’ অবলম্বনে। দীপিকা অভিনয় করেন গুজরাটী এক তরুণী লীলার চরিত্রে, যে চরিত্রটি জুলিয়েটের অনুকরণে নির্মিত হয়েছে। শুরুতে ছবিটির নাম ছিল রামলীলা, পরে আদালতের নির্দেশে নাম বদলাতে বাধ্য হন পরিচালক। হিন্দু সম্প্রদায়কে ক্ষুব্ধ করে ছবিটির কাহিনী। দেবতা রমা’র জীবন তুলে ধরতে গিয়ে যৌনতা ও সহিংসতা দেখানো হয়েছে, এ অভিযোগ ওঠে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভের মাঝেই ছবিটি মুক্তি পায়। তবে চলচ্চিত্র সমালোচকরা ভালোভাবেই গ্রহণ করে ছবিটিকে।  এ বছর দীপিকার জন্য চতুর্থ বক্স অফিস সাফল্য ছিল এটি।
 
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী ২০১৪ সালে দীপিকার তিনটি ছবি মুক্তি পাওয়ার কথা আছে।
ব্যক্তিগত জীবন
এত সাফল্য আর খ্যাতির মাঝেও পরিবারের সদস্যদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলেন দীপিকা। নিয়ম করে ব্যাঙ্গালোর যান, থাকেন মুম্বাইয়ের কাছাকাছি প্রভাদেবী এলাকায়। পরিবারের সঙ্গ না পাওয়াটা তাকে পীড়া দেয়। তবে দীপিকা বলেন, তার নিজের কাজের জগৎ গৃহকাতরতা থেকে দূরে রাখে।
 
দীপিকা বলেন, শুধু নিজের জন্য তাদের (পরিবারের সদস্যদের) ব্যাঙ্গালোরের জীবন ছেড়ে আসতে বলা যায় না।
 
হিন্দু ধর্মের অনুসারী দীপিকা নিয়ম করে মন্দির এবং বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে যান। তিনি একজন নারীবাদীও। তার মতে নারীবাদ মানে আক্রমণাত্নক মানসিকতা নয়। ধৈর্যের সাথে শীর্ষে ওঠার চেষ্টা করতে হবে। দৃঢ়তার পাশাপাশি ইচ্ছাশক্তিও থাকতে হবে নারীদের।
রণবীরের সাথে সম্পর্ক ও ভাঙন
২০০৮ সালে ‘বচনা আয় হাসিনু’ ছবিতে কাজ করার সময় রণবীরের সাথে রোমান্টিক সম্পর্কের সূচনা হয়। দীপিকা খোলাখুলিভাবেই তাদের সম্পর্কের কথা বলেন, ঘাড়ে রণবীরের সাক্ষরের উল্কি আঁকান।
 
দীপিকার মতে আরও আত্নবিশ্বাসী ও সামাজিক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে তাদের সম্পর্কটির প্রভাব যথেষ্ট। ভারতের গণমাধ্যমে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয় দীপিকা-রণবীর বিয়ে করতে চলেছেন। ২০০৮ সালের নভেম্বরে বিয়ে করেছেন বলেও খরব দেয় তারা। অন্যদিকে দীপিকা বলেন পাঁচ বছরের মধ্যে বিয়ের কোন পরিকল্পনা নেই তার। পরের বছরই তাদের সম্পর্কের ইতি ঘটে।
 
এক সাক্ষাৎকারে দীপিকা তার ক্ষোভের বিষয়টি প্রকাশ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রতারিত হয়েছেন বলে মন্তব্য করেন। ২০১০ সালে আরও খোলাখুলিভাবে কথা বলেন দীপিকা। তিনি বলেন, প্রথমে আমি ভেবেছিলাম সমস্যাটা আমার বা আমাদের সম্পর্কের। রণবীর ক্ষমা চেয়েছিল। তাকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেয়াটা ভুল ছিল। ওকে হাতেনাতে ধরার পর আমাকে আর নিবৃত্ত করা সম্ভব ছিল না।
 
শুরুতে রণবীর কাপূর অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে ২০১৩ সালে ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ জানায় বিশ্বাসভঙ্গের বিষটি স্বীকার করেছেন রণবীর। অবশ্য এখনো নিজেদের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে বলে জানান দীপিকা।
 
আরও সম্পর্কের খবর
২০১১ সালে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগের একটি ম্যাচ চলাকালীন সময়ে ক্রিকেট ম্যানেজার সিদ্ধার্থ মালয়ার সাথে দীপিকার চুম্বনরত বেশ কয়েকটি ছবি ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের সম্পর্কের ধরন নিয়েও জল্পনা-কলপনা শুরু হয়। কিন্তু কিছই বলতে রাজি হন নি দীপিকা। পরের বছর তাদের বিচ্ছেদের খবরও বেরোয়। দীপিকা বলেন, আমাদের আর একসাথে দেখা যাচ্ছে না, এর অর্থ এই নয় যে আমরা আর বন্ধু নই।
 
পরে আরও সম্পর্কের খবর বেরোয়, কিন্তু সেসব খবর উড়িয়ে দেন দীপিকা।
রুপালি জগতের বাইরে
পত্রিকায় কলাম লেখার পাশাপাশি মেয়েদের স্বাস্থ্য ও ফিটনেস বিষয়ক ম্যাগাজিনের সাথে কাজ করেছেন। দাতব্য সংস্থাকে সাহায্য করতে মঞ্চেও উঠেছেন তিনি। ২০০৯ সালে হিন্দুস্তান টাইমসের সাপ্তাহিক লাইফ স্টাইল কলাম লেখার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। এর মাধ্যমে ভক্তদের সাথে পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মত বিনিময়ের সুযোগ হয় তার। একই বছর ১০ কিলোমিটারের ব্যাঙ্গালোর ম্যারাথনে অংশ নিয়ে দুই লাখ বিশ হাজার মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেন। ৮১ টি এনজিওকে সাহায্য করতেই এ আয়োজন করা হয়েছিল।
 
ভারতের এনডিটিভি বিশেষ একটি রিয়েলিটি শো আয়োজন করে ভারতের স্বাধীনতা দিবসে। এর অংশ হিসেবে দীপিকা যান জম্মু কাশ্মীরে ভারতের সেনাক্যাম্পে। ডি ওয়াই পাবিল স্টেডিয়ামে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগের তৃতীয় আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তিন বছর পর ষষ্ঠ আইপিএলের উদ্বোধনী আসরেও যোগ দেন দীপিকা, যেখানে মঞ্চে তারা সাথে ছিলেন শাহরুখ খান, ক্যাটরিনা কাইফ ও পিউবুল।
 
২০১৩ সালের শুরুর দিকে ‘জি সিনে এওয়ার্ড’ আসরে যোগ দেন। একই বছর আরও পরের দিকে ম্যাকাও-এ ১৪তম ‘আইআইএফএ এওয়ার্ড’ আসরে দু’টি গানের সাথে নাচেন। 
 
২০১৩ সালে রিটেইল চেইন ভ্যান হিউসনের সাথে এক যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে মেয়েদের জন্য তার নিজস্ব ধারার পোশাক নিয়ে আসেন দীপিকা।
 
বিভিন্ন ব্র্যান্ড এবং পণ্যের প্রমোটার হিসেবেও কাজ করছেন দীপিকা। এসবের মধ্যে আছে সনি সাইবার শট, পেপসি ও নেসক্যাফে। ২০১২ সালে গার্ণিয়ারের সাথে এক মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি করেন, কোন ভারতীয় অভিনেত্রীর জন্য যা একটি রেকর্ড।
গণমাধ্যমের মূল্যায়ন
ভারতের আকর্ষণীয় সেলিব্রেটিদের নিয়ে বিভিন্ন তালিকার ওপরের দিকে আছেন তিনি। ২০০৮ সালে ম্যাক্সিম ম্যাগাজিনের ভারতীয় সংস্করণ ‘হট ১০০’ শিরোনামে একটি তালিকা করে যার শীর্ষে ছিলেন দীপিকা।
 
এফ এইচ এম ম্যাগাজিনের ভারতীয় সংস্করণ তাকে বিশ্বের সবচেয়ে আবেদনময়ী নারী হিসেবে মনোনয়ন দেয়।
 
২০১২ সালে ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত নারীর যে তালিকা করে তার শীর্ষে ছিলেন দীপিকা। এর আগের দু’বছর যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান পান তিনি। একই বছর পিপলস ম্যাগাজিনের ভারতীয় সংস্করণের বিবেচনায় ভারতের সবচেয়ে সুন্দরী নারী নির্বাচিত হন।
 
বৃটিশ ম্যাগাজিন ‘ইস্টার্ণ আই’ এর বিবেচনায় ২০০৯ থেকে ২০১২ সময়কালে এশিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় নারী ছিলেন দীপিকা।
 
‘ফিল্মফেয়ার’ ২০১৩ সালে তাকে ‘মোস্ট ফ্যাশনেবল তারকা’ পুরস্কার দেয়। ফিটনেস সংক্রান্ত বই ফোর উইক কাউন্টডাউন ডায়েটের নমিতা জেইন স্বাস্থ্যসম্মত এবং সক্রিয় জীবনযাপনের জন্য দীপিকাকে আদর্শ বলে মন্তব্য করেন।
 
অন্যান্য
অন্য সবকিছুর চেয়ে কাজই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় দীপিকার কাছে। পেশাদার এবং নিয়মানুবর্তী অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি তার। চলার পথের সমালোচনাকে গ্রহণ করেন, তিনি তার সীমাবদ্ধতা ভালোভাবে জানেন এবং আরও ভালো করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন। ২০০৯ সালে দীপিকা টুইটার একাউন্ট খোলেন আর ফেসবুক পেজ চালু করেন ২০১৩ সালে। বলিউড সেলিব্রেটিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফেসবুক লাইক পেয়েছেন তিনিই।
 
টুইটার একাউন্ট: https://twitter.com/deepikapadukone
ফেসবুক পেজ: https://www.facebook.com/DeepikaPadukone
 
এখন দীপিকার বার্ষিক আয় ৬.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফোর্বস ম্যাগাজিনের ভারতীয় সংস্করণ ২০১৩ সালে ১০০ জন ভারতীয় সেলিব্রেটির একটি তালিকা করে, যেখানে ১১ তম স্থানটি পান দীপিকা। আয় এবং জনপ্রিয়তা বিবেচনায় নিয়ে এ তালিকাটি করা হয়।

Post A Comment: