চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে দুই হাজার ৫৫৬ জন শিশু উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে ইতালির ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে এসেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। ছবি: রয়টার্সউত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে ইতালিতে যাওয়া অভিবাসী শিশুরা শোষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে সেদেশে অভিবাসী শিশুদের দুর্দশার এই চিত্র ফুটে উঠেছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে দুই হাজার ৫৫৬ জন শিশু ইতালির ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে এসেছে। এই শিশুদের বেশির ভাগ সঙ্গীহীন। তারা মিসরসহ উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে ইতালিতে এসেছে। কমবয়সী এই শিশুরা অনুমোদনহীনভাবে কুলির কাজ করে।
দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় এই শিশুরা জন্মভূমি ছেড়েছে। কিন্তু ইতালিতে এসে তাদের আশা ভঙ্গ হয়েছে। সেখানে তারা পড়েছে নতুন সংকটে। ইতালিতে নামমাত্র মজুরিতে তারা অবৈধভাবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এ ছাড়া যৌন নিপীড়নেরও শিকার হচ্ছে এসব শিশু।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ইতালির উপকূলে ৪৫ হাজার ৪০০ জন অভিবাসন-প্রত্যাশী এসেছে। এই একই সময়ে গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৪১ হাজার ২৪৩ জন। অর্থাৎ, এ বছর অভিবাসন-প্রত্যাশীদের আগমন বেড়েছে। এবার আসা অভিবাসন-প্রত্যাশীদের মধ্যে হাজারো শিশু রয়েছে।

গত মাসের শেষের দিকে রোমে ফল ও সবজির একটি পাইকারি বাজারে গিয়ে অন্তত ১০ জন মিসরীয় শিশুকে কাজ করতে দেখা যায়। তাদের বয়স ছিল খুব কম। এক ব্যবসায়ীর ভাষ্য, সেখানে শিশুদের সংখ্যা ইদানীং বাড়ছে।

উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসী শিশুদের ঢলে ইতালির কর্তৃপক্ষও দিশেহারা। দেশটির কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, সঙ্গীহীন অনেক শিশু ইতালিতে অবৈধভাবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এই শিশুরা নানাভাবে শোষিত হচ্ছে। তাদের রক্ষায় আইনে পরিবর্তন আনার দাবি উঠছে।

সরকারি তথ্য অনুসারে, ইতালিতে মিসরের অনেক শিশু আছে।

পরিবারই ওই শিশুদের ইতালিতে পাঠিয়েছে। লক্ষ্য একটাই—অর্থ উপার্জন, সেই অর্থে পরিবারের ঋণের বোঝা কমানো। কিন্তু সে প্রত্যাশা খুব কমই পূরণ হচ্ছে। কারণ শিশুরা খুব কম মজুরি পায়। উল্টো জোটে শোষণ।

ইতালিতে কুলি হিসেবে কাজ করছেন মিসরের ১৮ বছর বয়সী মাহমুদ। তাঁর ভাষ্য, তিনি দিনে ২০ ইউরো করে মজুরি পান। ১৬ বছর বয়স থেকে ইতালিতে কুলি হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি।

রোমে অন্য এক ব্যবসায়ী জানালেন, কাজ পেতে শিশুদের অনেকেই তাদের বয়স নিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সামনেই অভিবাসী শিশুদের কাজ করতে দেখা গেছে। কিন্তু তাঁরা ওই শিশুদের কিছুই বলছেন না। কাজ করতে গিয়ে অভিবাসী শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যেও পড়ছে।

সমস্যার কথা স্বীকার করে ইতালির শ্রম ও সামাজিকবিষয়াবলী মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, কোনো একক কর্তৃপক্ষ এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

সেভ দ্য চিলড্রেনের কর্মকর্তা ইলারিয়া ওলিভিরি বলেন, ‘পরিবারকে অর্থ পাঠাতে যথেষ্ট আয়ের আশায় শিশুরা আসে। কিন্তু আসার পর তারা বুঝতে পারে, ব্যাপারটা অত সহজ নয়।’

সেভ দ্য চিলড্রেনের এই কর্মকর্তার আরও বলেন, ‘অনেক শিশু মজুরি পাওয়ার আগেই চাকরি হারায়। এটা এক ধরনের শোষণ।’

উত্তর আফ্রিকার ওই অভিবাসী শিশুরা ইতালিতে কেবল শ্রমশোষণই নয়, যৌন নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছে। অনেক শিশু আবার অর্থের জন্য যৌন পেশায় জড়িত হচ্ছে। এতে ওই সব শিশুদের মধ্যে যৌনবাহিত রোগ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

এক চিকিৎসকের ভাষ্য, তাদের চিকিৎসা দলের কাছে আসা আফ্রিকান শিশুদের অর্ধেক যৌন নিপীড়নের শিকার।

ভাগ্য বদলের আশায় ইতালিতে এসে মোহভঙ্গ হয়েছে উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসী শিশুদের। এই শিশুদের এখনকার অনুভূতি প্রতিফলিত হয় ১৬ বছর বয়সী মিসরের এক শিশুর কণ্ঠে। তার ভাষ্য, ‘আমি যদি আবার ইতিহাসটা পাল্টে দিতে পারতাম, কখনোই মিসর ছাড়তাম না।’


Post A Comment: