হইচই হলেই নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা
অনেকের পাসপোর্ট আটকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে অর্থ
--------------------------
ঝালকাঠির সাইদুল ইসলাম (১৮)। নিম্নবিত্ত পরিবারের এই ছেলেটির আশা ছিল মালয়েশিয়া যাবেন। সাইদুলের দিনমজুর বাবার কাছ থেকে স্থানীয় এক দালাল ৩০ হাজার টাকাও নেয়। কথা ছিল বিদেশ গিয়ে বাকি টাকা শোধ করবেন। সেই আশায় ওই দালালের মাধ্যমেই সাইদুল তার পাসপোর্ট জমা দেন মালিবাগের মাহবুব ইন্টারন্যাশনাল ট্র্যাভেল এজেন্সিতে। দিনের পর দিন ঘুরেও বিদেশ যেতে পারেননি সাইদুল। উল্টো আরো ৩০ হাজার টাকার জন্য সাইদুলের পাসপোর্ট আটকে দেয় ওই এজেন্সি। এক পর্যায়ে দালাল তাকে জাহাজযোগে বিদেশ পাঠানোর কথা বলে। কিন্তু তাতে রাজি হননি সাইদুল। বিষয়টি তিনি পুলিশকেও জানান। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি। উদ্ধার করতে পারেননি পাসপোর্ট। সবশেষে কয়েকজন সাংবাদিকের মধ্যস্থতায় সাইদুল তার পাসপোর্ট ফেরত পান। এভাবেই জিম্মি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে মানবপাচারকারীরা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এভাবে বেশ কিছু ট্র্যাভেল এজেন্সির মাধ্যমে দালালচক্র খোদ রাজধানীতেই আস্তানা গেড়েছে। এরা কিছু এজেন্সিকে ব্যবহার করে মানবপাচার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় দীর্ঘ দিন ধরে সক্রিয় রয়েছে পাচারকারী সিন্ডিকেটের শত শত সদস্য। গতকালও রাজধানীর কাফরুল থেকে র‌্যাব সদস্যরা এমন একটি সিন্ডিকেটের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছেন। সূত্র জানায়, রাজধানীর ফকিরাপুল, পল্টন, মতিঝিল, বনানী, গুলশান, মগবাজার, উত্তরা, বাড্ডা ও মতিঝিল, দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকাসহ মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে মানবপাচারকারীদের আস্তানা। বিলাসবহুল অফিসে বসে মানবপাচারের গডফাদাররা সিন্ডিকেটগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। এরা দেশের সহজ সরল বিদেশ গমনেচ্ছুক মানুষের কাছ থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে। একই সাথে সামর্থ্য অনুযায়ী ওই সব লোকের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়। এরপর মানুষগুলোকে জিম্মি করে। অনেকের ইচ্ছে না থাকলেও ধারদেনা শোধের আশায় সাগরপথে পাড়ি জমায়। শুধু রাজধানীর ফকিরাপুল, পল্টন, নয়াপল্টন, মতিঝিল এলাকাতেই মানবপাচারকারী চক্রের হাতে এভাবে হাজার হাজার পাসপোর্ট পড়ে আছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। বৈধ-অবৈধ নকল ও ভুয়া পাসপোর্টেরও ছড়াছড়ি এসব অফিসে। র‌্যাব অভিযান চালিয়ে গত সপ্তাহে এক হাজারের বেশি পাসপোর্ট উদ্ধার করেছে খোদ রাজধানী থেকে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, র‌্যাব-সিআইডি ও ডিবি পুলিশ ইতোমধ্যে প্রভাবশালী ২০-২৫টি সিন্ডিকেট শনাক্ত করেছে রাজধানীতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারও পাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্যদের গ্রেফতারে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ থেকে মানবপাচার নিয়ে পৃথিবীজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। দেশ-বিদেশে মানবপাচার নিয়ে শীর্ষ মহলের বৈঠক হয়েছে। এমনকি জাতিসঙ্ঘ এই মানবপাচার নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। মানবপাচার নিয়ে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের পুলিশ ও প্রশাসনের সাথে আগামী ২ ও ৩ জুন ঢাকায় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও পাচারকারী চক্রের সদস্যদের গ্রেফতারে মাঠে নেমেছেন। গতকাল রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে গ্রেফতারকৃত তিন মানবপাচারকারীর হেফাজত থেকে উদ্ধার হয়েছে দুই ভিকটিম।

র‌্যাব জানায়, গতকাল সোমবার তারা সাতক্ষীরার আশাশুনি থানার বধূহাটা গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে মো: ওয়াসিম আকতার নয়ন (২৭), বি.বাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর থানার ফরদাবাদ গ্রামের মৃত আবদুল ওয়াদুদ সরকারের ছেলে মো: জামাল সরকার (২৬), এবং রাজধানীর দারুস সালাম থানার ১৬৭ বাগবাড়ী উত্তর পাড়ার মমতাজ মিয়ার ছেলে মো: সিউিকুর রহমান শিশিরকে (৩৯) মানবপাচারের অভিযোগে গ্রেফতার করে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৮ মার্চ রাকিব ও হাবিব খন্দকার নামে দুই যুবককে উন্নত বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভারতের চেন্নাইয়ে পাঠানোর কথা বলে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় নিয়ে যায়। পরে ভারত থেকে আসা মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য মো: মনিরুজ্জামান ডালিমের কাছে বিক্রি করে দিলে সে পাসপোর্ট এবং ভিসা ছাড়াই অবৈধপথে ভিকটিমদের ভারতে নিয়ে যায়। ভারতে যাওয়ার পর তাদেরকে তামিলনাড়ু প্রদেশের একটি স্থানে দুই-তিন মাস আটকে রাখে। ভিকটিমদেরকে দিয়ে পাচারকারীরা দাস রূপে বিনা মজুরিতে কাজ করায়। অপর দিকে ভিকটিমদের শারীরিক নির্যাতন করে তাদের পরিবারকে ফোনে বলতে বাধ্য করে যে, তারা সেখানে ভালোই আছে এবং ভালো বেতনের চাকরি করছে বিধায় তাদের ভারতে পাঠানো বাবদ অবশিষ্ট বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে হবে। এভাবে ভিকটিমরা দু-তিন মাস থাকার পর কিছু ভিকটিম কৌশলে কোনো এক বাঙালির সহায়তায় ভারত থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে ফেরত আসেন এবং র‌্যাব-৪-এর শরণাপন্ন হলে ওই চৌকস দলটি এই বিশেষ অভিযানটি পরিচালনা করে।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ গত রোববার দক্ষিণখানের একটি আবাসিক হোটেলে অভিযান চালিয়ে গোলাম রাব্বানী ও শাহাদাৎ হোসেন মাসুম নামে দু’জনকে গ্রেফতার করে। তাদের হেফাজত থেকে ১৮ ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত প্রত্যেকের কাছ থেকে সাত লাখ টাকা নেয় পাচারকারীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশীয় মানবপাচারকারীদের সাথে বিদেশের পাচারকারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মানবপাচার নিয়ে হইচই পড়ে গেলে অনেকেই দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে অবস্থান নেয়। বিভিন্ন দেশের প্রশাসনের সাথে বৈঠকে বিদেশে অবস্থানরত কয়েকটি সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের সম্পর্কে তথ্য আদানপ্রদানসহ পাচারকারীদের গ্রেফতারের সহযোগিতাও চাওয়া হবে বলে জানা গেছে। গোয়েন্দাদের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে মূলত আটটি দেশে মানবপাচার হয়ে থাকে। দেশগুলো হচ্ছেÑ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও মিয়ানমার। আবার অনেক সময় দেখা যায় ওই সব দেশের মধ্যে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাচার হয়ে থাকে। কয়েকটি সিন্ডিকেট প্রতিবেশী দেশ ভারতেও মানবপাচার করে থাকে। পরে সেখানকার সিন্ডিকেট পাচারকারী ওই সব আদমদের অন্য কোনো দেশে পাচার করে দেয়। কোনো কোনো দেশকে কোনো কোনো সিন্ডিকেট রুট বা আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এসব দেশের স্থানীয় গডফাদার ও এজেন্টদের সাথে যোগাযোগ রয়েছে বাংলাদেশী মানবপাচারকারী গডফাদারদের। এদের কোনো কোনো সিন্ডিকেট ওই সব দেশে তাদের অফিসও খুলে বসেছে। এ দিকে দেশে মানবপাচারের সাথে সরকারদলীয় এক সংসদ সদস্য, তার ভাই এবং কক্সবাজারের এক উপজেলা চেয়ারম্যানসহ অন্তত ৭৯ জনের নাম উল্লেখ করে প্রতিবেদন দাখিলের পরও তাদের কেউ এখনো গ্রেফতার হয়নি।

র‌্যাবের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইং প্রধান মুফতি মাহমুদ খান নয়া দিগন্তকে বলেন, মানবপাচার বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে। কোনোটি সমুদ্রপথে হয়, কোনোটি বিমানযোগে হয়, আবার দেখা যায় ভুয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে হচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় এক কাজ দেয়ার কথা বলে নিয়ে আরেক কাজে দেয়। এরা সবই পাচার হয়েছে। তিনি বলেন, বিমানের মাধ্যমে যেসব পাচার হয় তার সবই রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে থাকে।

Post A Comment: