সোমবার চীনের ইয়াংজি নদীতে একটি ভ্রমণ জাহাজ উল্টে যাওয়ার পর সেটার আরোহী ৩৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কারণ এখনো পরিষ্কার নয়। জাহাজটিতে ৪০৫ জন যাত্রী ছিলেন, যাদের বেশির ভাগই বৃদ্ধ। এ ছাড়াও ছিলেন পাঁচটি ভ্রমণসংস্থার কর্মী ও ৪৬ জন ক্রু
চীনের কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। জীবিত উদ্ধারকৃত ১৪ জনের মধ্যে কয়েকজনের কাছ থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়, কী কারণে ইস্টার্ন স্টার নামক জাহাজটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল।
জীবিত উদ্ধার হওয়া এক যাত্রী বলেছেন, আমরা জানি, দুর্ঘটনাটি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটেছিল। তিনি বলেন, জাহাজটি অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে উল্টে গিয়েছিল। অন্য আরেকজন বলেছেন, জাহাজটি মাত্র এক মিনিটের মধ্যে উল্টে গিয়েছিল।
জীবিত উদ্ধার হওয়া ১৪ জনের মধ্যে আছেন ঝাঙ শুনওয়েন ও চিফ ইঞ্জিনিয়ার ইয়াং ঝঙকুয়ান। শোনা গেছে যে, তারা উভয়েই বলেছেন, জাহাজটি একটি অস্বাভাবিক ঝড়ের কবলে পড়েছিল এবং একজন যাত্রী বর্ণনা করেছেন, জাহাজটি উল্টে যাওয়ার আগে ৪৫ ডিগ্রি কোণে কাত হয়ে গিয়েছিল।
ঝড়ের বিষয়টিকে চীনের আবহাওয়াবিদেরা সমর্থন করেছেন ও নিশ্চিত করে বলেছেন যে, একটি আকস্মিক, শক্তিশালী ও প্রবল ঝড় দুর্ঘটনার সময় ওই এলাকায় আঘাত করে।
নিকটেই অবস্থান করা এক জাহাজ থেকে ধারণ করা এক ভিডিওচিত্রে দেখা যায় ইস্টার্ন স্টার প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত ও বজ্রপাতের মধ্যে ভ্রমণ করছে।
ভারী বৃষ্টিপাত ও আলোস্বল্পতার কারণে উদ্ধারকর্মীদের কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
হঠাৎ ঝড় শুরু হওয়ার কারণেই জাহাজটি হয়তো কোনো জরুরি সঙ্কেত পাঠাতে পারেনি। কিন্তু পুলিশ ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষ না করা পর্যন্ত জাহাজটির গতি ও গতিপথের মতো বিষয়গুলোর বিবরণ সম্ভবত অজানা থেকে যাবে।
কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, জাহাজটিতে অতিরিক্ত কারণ যাত্রী ছিল না এবং এটাতে যথেষ্ট পরিমাণে লাইফজ্যাকেট ও লাইফবোট ছিল। কিন্তু এগুলোর সাহায্য নেয়ার মতো যথেষ্ট সময় যাত্রী ও ক্রুদের হাতে ছিল না।
স্থানীয় গণমাধ্যম তার পর থেকে বলছে যে, হুবেই ও জিংঝোউয়ের আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ ১ জুনের আগেই বিপজ্জনক সমুদ্র ভ্রমণের বিরুদ্ধে একাধিক আবহাওয়া সতর্কতা জারি করেছিল।
এখনো পরিষ্কার নয় যে, ক্যাপ্টেন কি এই সতর্ক বার্তাগুলো পেয়েছিলেন, অথবা তিনি যদি পেয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কি এগুলোকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করেছিলেন।
জাহাজের ক্যাপ্টেন ঝাংয়ের পারদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু বেইজিং ইয়ুথ ডেইলির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার (ক্যাপ্টেন ঝাং) কোম্পানি ইস্টার্ন শিপিংয়ের কর্মচারীরা ৫০ বছর বয়সী ক্যাপ্টেনকে টেকনিক্যালি দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করেছে।
যদি খারাপ আবহাওয়াকেই দোষ দিতে হয়, তাহলে এটা পরিষ্কার নয় যে, শুধু এই জাহাজটিই কেন ব্যস্ত নদীতে উল্টে যাওয়া একমাত্র জাহাজ হবে। ইস্টার্ন স্টার উল্টে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে এটিকে অতিক্রম করা একটি ফ্রাইটার টংগনঘুয়া ৬৬৬-এর ক্যাপ্টেন বলেন, তিনি সেখানে কুয়াশার মতো আবহাওয়া দেখেছেন এবং এই বৃষ্টিই তাদের রাডারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।
অবশেষে ঝড় অতিক্রম করার সময় তিনি জাহাজকে উপকূলে নোঙর করান। নিকটেই থাকা চ্যাংহাং জিনজিয়াং নামক অন্য একটি জাহাজকেও একইভাবে উপকূলে নোঙর করা হয়।
আরো একটি ধারণা করা হয় যে, এটি নোঙর করার চেষ্টা করার সময় উল্টে গিয়ে থাকতে পারে।
সাংহাই মর্নিং পোস্টের সাথে এক সাক্ষাৎকারে চ্যাংহাং জিনজিয়াংয়ের ক্যাপ্টেন বলেন, এটি উল্টে যাওয়ার ১০ মিনিট আগে প্রায় রাত ৯টা ২০ এর দিকে ইস্টার্ন স্টারের ক্রুরা তার সাথে রেডিওতে যোগাযোগ করে বলেন, ‘আমরা আপনার পেছনে নোঙর করার কথা চিন্তা করছি।’ ক্যাপ্টেন বলেন, তারপর তাকে নিজের জাহাজ নোঙর করার দিকে মনোযোগ দিতে হয়েছিল। এজন্য বাতাসের মুখে জাহাজের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে এটি ঘোরানোর প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, যখন আমার জাহাজটি নোঙর করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো তখন ইস্টার্ন স্টারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না এবং সেটা ছিল যোগাযোগের বাইরে।
একটি মানচিত্রে চূড়ান্ত মিনিটগুলোতে ইস্টার্ন স্টারের পথ দেখা গেছে যা স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা যায়, রাত ৯টা ২০-এর দিকে জাহাজটি সরাসরি ডান দিকে মোড় নেয় এবং দূরবর্তী উপকূলের দিকে যেতে থাকে।
৭৬ মিটার লম্বা ও দুই হাজার ২০০ টন ওজনসম্পন্ন জাহাজটির মালিক চংকিং ইস্টার্ন শিপিং করপোরেশন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এটি ১৯৯৪ সালে নির্মাণ করা হয় এবং এটি ৫৩৪ জন যাত্রী বহন করতে সক্ষম।
ইস্টার্ন স্টার তার সর্বশেষ যাত্রা শুরু করেছিল নানজিং থেকে। জনশ্রুতি আছে, ২০১৩ সালে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ অভিযান চলার সময় গুণগত মান অবক্ষয়ের কারণে নানজিং কর্তৃপক্ষ ইস্টার্ন স্টারসহ পাঁচটি সমুদ্র ভ্রমণ জাহাজকে আটক করেছিল।
নানজিং সামুদ্রিক নিরাপত্তা ওয়েবসাইটের রেকর্ডে দেখা যায়, এই জাহাজটিকে আটক করা হয়েছিল, কিন্তু কী কারণে আটক করা হয়েছিল তা পরিষ্কার নয়। চীনের সংবাদবিষয়ক ওয়েবসাইট কাইজান রিপোর্ট করেছে যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই জাহাজটির কয়েকবার মেরামত করা হয়েছে।
কিছু বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এই ধরনের একটি নদীভিত্তিক জাহাজ ঘণ্টায় ৮০ মাইল বা ১৩০ কিলোমিটারের বেশি গতির বাতাসের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম নয়।
চংকিং বোট ডিজাইন ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ঝং সৌদাউ বলেন, ‘মহাসাগরে চলাচলকারী জাহাজের তুলনায় নদীতে চলাচলকারী জাহাজগুলো বাতাস ও ঢেউ প্রতিরোধে নি¤œমানসম্পন্ন।’
যেহেতু চীনা কর্তৃপক্ষ এখন মুখ বন্ধ করে আছে, তাই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পেছনে আসল কারণটি জানতে একটু সময় লাগবে।
বিবিসি অবলম্বনে



Post A Comment: