মিথ্যা আর মিথ্যা। আজন্ম রাশি রাশি মিথ্যার সঙ্গে বসবাস করতে করতে জীবনটাই যেন মিথ্যা হয়ে উঠেছে ছিটমহলবাসীর। এই মিথ্যার জীবন তারা আর চায় না। ৬৮ বছর পর তৈরি হতে যাচ্ছে তাদের মিথ্যা থেকে মুক্তির পথ।
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি ইউনিয়নের শেষ প্রান্তে সেউতি কুর্শা ছিটমহলের আবদুল বারেক বলছিলেন ‘সোজা কথায় হামাকের সবকিছুই মিথ্যা। এইভাবে আর থাকবার চাই না।’ তিনি জানান, ছিটবাসী সবার মতো তাঁরও একটি মুঠোফোন আছে। সেটির সিমকার্ড কিনতে বাংলাদেশের যে জাতীয় সনদের প্রয়োজন হয়েছে, সেটি মিথ্যা। কারণ, সেখানে বাংলাদেশের মিথ্যা ঠিকানা দিতে হয়েছে। জাতীয় সনদটি পেতে বাংলাদেশ থেকে যে জন্মনিবন্ধন সনদ দিতে হয়েছে, তাতেও মিথ্যা তথ্য দিতে হয়েছে। জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলে বাংলাদেশের লোক বলে মিথ্যা পরিচয় দিতে হয়। মেয়েকে পাথরডুবি প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন অনেক চেষ্টায়। সেখানেও মেয়ের মিথ্যা জন্মসনদ দিতে হয়েছে।
একই রকম অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন দাশিয়ারছড়া ছিটমহলের সোহানুর রহমান। বাবার বদলি হজ করেছেন গত বছর। হজের মতো পুণ্য কাজেও পাসপোর্ট করতে গিয়ে মিথ্যা ঠিকানা দিতে হয়েছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করতে হয়েছে মিথ্যা ঠিকানায়। কারণ, তাঁদের যে কোনো নাগরিকত্বই নেই। না ভারতের, না বাংলাদেশের। প্রতি পদে পদে এই মিথ্যার চক্র থেকে এখন তাঁরা মুক্তির দিন গুনছেন।
কুড়িগ্রামে ভারতের ছিটমহল ১২টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দাশিয়ারছড়া ও দাকুলির কুটি ফুলবাড়ী উপজেলার অভ্যন্তরে। বাকি ১০টি ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি এবং শিলকুড়ি ইউনিয়নে। এগুলো হলো কালমাটি ছিটমহল, যার আয়তন ৬৫ বিঘা, লোকসংখ্যা ১৪০ জন। সেউতি কুর্শা ১৫০ বিঘা, ২৫০ জন। বড় গাউচুলকা ৩০০ বিঘা, ৯৫ জন। ছোট গাউচুলকা ৩ বিঘা, ১১ জন। গাউচুলকা (৩) ২৯ বিঘা, ৭০ জন। দীঘলটারি (১) ৫৬ বিঘা, ২০০ জন। দীঘলটারি (২) ৫২৭ বিঘা ২০০ জন। গরলঝরা (১) ১২০ বিঘা, ২০০ জন। গরলঝরা (২) ৫২ বিঘা, ১৪৯ জন এবং সাহেবগঞ্জ ছিটমহলের আয়তন ৯৫ বিঘা, লোকসংখ্যা ১৩৫ জন। এই লোকসংখ্যার হিসাব ২০১১ সালে বাড়িতে উপস্থিত মাথা গণনা অনুসারে। প্রকৃত জনসংখ্যা আরও অনেক বেশি।
অন্যদিকে এসব ছিটের জমিও পুরোটা ছিটের অধিবাসীদের নয়। বাংলাদেশের মানুষের জমি আছে প্রত্যেক ছিটেই। এমনকি কোনো কোনো ছিটে বাংলাদেশিদের জমিই বেশি।
কুড়িগ্রাম শহর থেকে ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় ছড়ানো-ছিটানো এসব ছিটমহলের দূরত্ব ৬৫ থেকে ৭০ কিলোমিটার। গত রোববার কুড়িগ্রাম শহর থেকে মাইক্রোবাসে ভূরুঙ্গামারী, সেখান থেকে মোটরসাইকেলে পাথরডুবি ইউনিয়ন এবং তারপর বৃষ্টিতে কর্দমাক্ত আলপথ ধরে হেঁটে ভারতীয় সীমান্ত-সংলগ্ন প্রত্যন্ত এলাকার বড় গাউচুলকা, কালামাটি, সেউতি কুর্শা, সাহেবগঞ্জ—এই চার ছিটমহলে গিয়ে কথা হয়েছে বাসিন্দাদের সঙ্গে।
‘ছিটের মানুষ’ বলে পরিচিত এই লোকেরা জানিয়েছেন যুগ যুগ ধরে তাঁদের বঞ্চনা আর নিগ্রহের কথা। বড় গাউচুলকার মহর আলী বলেন, বছর চারেক আগে তাঁর এক ভাতিজাকে কুকুর কামড়ায়। ভ্যাকসিন দিতে নিয়ে গিয়েছিলেন ভূরুঙ্গামারী সরকারি হাসপাতালে। ছিটের লোক বলে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়নি। চেয়ারম্যানের কাছ থেকে সনদ আনতে বলা হয়েছে। সনদ কোথায় পাবেন। অগত্যা দালালের মাধ্যমে ভাতিজাকে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। আক্ষেপ ভরা তাঁর ভাষায়, ‘হাসপাতলোত গেইলে হামাক জ্বরের বড়িটা পর্যন্ত দেয় না বাহে।’
ছিটের মানুষদের আশপাশের বাংলাদেশি গ্রামের সবাই চেনে। সে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্যই হোক, আর ডিলারের কাছে সার-বীজ, দোকানে সেচের তেল কিনতেই হোক তাদের পড়তে হয় দালালের খপ্পরে। দালালেরাও তক্কে তক্কে থাকে। কালমাটির শাজাহান আলী বলছিলেন, ‘সার কিনবার গেইলে ডিলার কয়—তোরা ছিটের লোক পরে আসিস। দ্যাশের মানুষোক সার দিবার পারি না।’ মনে বল নিয়ে জোরে কোনো কথাও বলা যায় না। বিনা পাসপোর্টে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের ভয়ে সব সময় কুঁকড়ে থাকেন তাঁরা। অনেক সময় পাতি মাস্তানেরা তাঁদের মালামাল কেড়ে নিয়ে বলে ‘ভারতে পাচার করছ?’
নিজের জীবনের এক দুঃখের কথা বলছিলেন সেউতি কুর্শার আসর উদ্দিন। চার শতাংশ জায়গায় দুটি ঘর ছাড়া তাঁর কোনো জমি নেই। একবার গরুকে ঘাস খাওয়াতে পাশের মাঠে নিয়ে গিয়েছিলেন। মাঠটি বাংলাদেশের অংশে (ছিটমহলগুলোর আপাতদৃষ্টে কোনো সীমান্ত চিহ্ন নেই)। প্রৌঢ় আসরকে রূঢ় ভাষায় তীব্র ভর্ৎসনা করে এক কিশোর বলেছিল, ‘এ পারে গরুক ঘাস খাওয়াবার আনছিস ক্যা? তোমার ছিটত ঘাস নাই?’ মাথা নিচু করে গরুর দড়ি ধরে ফিরে আসতে হয়েছিল তাঁকে। কথা বলতে বলতেই চোখে পড়ল সেউতি কুর্শার বাসিন্দা নাসিমা খাতুন বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে তাঁর গরুর জন্য ঘাস কেটে নিয়ে আসছিলেন বস্তায় ভরে।
অবশ্য এমন অপ্রিয় ঘটনা যে সব সময়ই ঘটে তা নয়। এসব ছোট ছোট ছিটমহলে কোনো পঞ্চায়েত না থাকায় বাসিন্দাদের কোনো দালিলিক পরিচিতিও নেই। অনেকের কাছে জমির দলিলও নেই। ফলে তাদের পক্ষে ভারতে যাওয়া কখনোই সহজ হয়নি। বাঁচার তাগিদে বাংলাদেশের সঙ্গেই তারা যোগাযোগ, আদান-প্রদান চালু রেখেছে। প্রতিবেশীরা তাদের সাহায্যও করেছে। সাহেবগঞ্জের মো. কলিম উদ্দিন মুনশি বলছিলেন, ‘ভারত সরকার হামাক একনা সুতাও দেয় নাই। বাংলার মানুষের সাহায্য-সহযোগিতাতেই বাঁচি আছি।’ কিন্তু মনের দুঃখ তো যায় না। অনেক কষ্ট করে মেয়ে মেরিনা খাতুনকে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে এমএ পাস করিয়েছেন। কিন্তু কোনো চাকরি হয়নি। ছিটের মানুষের চাকরি নেই।
এখন ছিটমহল হস্তান্তর সম্পন্ন হলে মেরিনা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাবেন। পাবেন সত্যিকারের সনদ। চাকরির আবেদন করতে পারবেন। তাঁর কেমন লাগছে, জানাতে চাইলে বাবার পাশে দাঁড়ানো মেরিনা খাতুন বালিকার মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, ‘এ আল্লা জানেন, আমারা যে কত্ত খুশি হইছি! এই উঠানে বিজয় উৎসব করছি।’ টিনের লম্বা চৌচালা ঘরের সামনে অনেক বড় খোলা উঠান। তার কিনার দিয়ে মৌসুমি ফুল আর পাতাবাহারের সারি। বিকেলের রোদ এসে পড়েছিল তাতে। ঝলমলে রঙিন সেই পাতার রাশি যেন ছিটের মানুষদের গ্লাণির জীবন থেকে মুক্তির বারতা দিয়ে যাচ্ছিল নীরবে।

Post A Comment: