মুখ ফুটে কেউ কথাটা বলছেন না। তবে মনের ভেতর রুদ্ধশ্বাস রোমাঞ্চ। আশার উথালপাথাল ঢেউ। স্বপ্নের ঝিকিমিকি আলো। এই কি সেই ম্যাচ, যাতে লেখা হবে আরেকটি ইতিহাস? বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আরেক ধাপ ওপরে নিয়ে যাওয়ার সিঁড়িটা কি আজই খুঁজে পাওয়া যাবে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে?
বাংলাদেশ ১: ভারত ০—প্রথম ম্যাচের পর এখানে দাঁড়িয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। আজ বাংলাদেশ জিতে গেলে ২-০ হয়ে যাবে, মানে এক ম্যাচ আগেই সিরিজ জয়ের উৎসবে ভাসবে দেশ। আর ভারত জিতলেও শেষ ম্যাচে আরও একটা সম্ভাবনা থেকে যাবে বাংলাদেশের। কিন্তু এমন মাহেন্দ্রক্ষণে অপেক্ষার যন্ত্রণা কে বাড়াতে চায়! যা করার দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই করে ফেলতে হবে, এই হলো বাংলাদেশ শিবিরের পণ।
কাল মিরপুরের অনুশীলন শেষে দলের প্রতিনিধি হয়ে সংবাদ সম্মেলনে এলেন কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। সিরিজ জয় নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে যা বললেন, তাতেও এই আকাঙ্ক্ষাটাই স্পষ্ট। কোচের চোখে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরের (আজকের) ম্যাচটাতে মনোযোগী হওয়া এবং সেটা জেতার চেষ্টা করা। সিরিজের ফলাফল তখন আপন গতিতেই এগিয়ে যাবে। হাথুরুসিংহের কথাগুলোর সারমর্ম করলে একটা অর্থই তো দাঁড়ায়—সিরিজের মীমাংসাটা আজই করে ফেলতে চায় বাংলাদেশ। অবশ্য দলের জন্য সতর্কবাণী হিসেবে বলে রেখেছেন, ‘বিশ্ব র্যা ঙ্কিংয়ে ভারত দ্বিতীয় স্থানে আছে। তাদের বিপক্ষে জিততে হলে অনেক ভালো খেলতে হবে। আমাদের জন্য এটা অনেক কঠিন সিরিজ।’
কঠিন, তবে সিরিজ জয়টা একেবারে অসম্ভব নয়। ওয়ানডেতে বাংলাদেশ দলের সাম্প্রতিক ফর্মই এমন স্বপ্ন দেখার সাহস বাড়িয়েই দিচ্ছে। সর্বশেষ ১৫ ওয়ানডের ১২টিতেই জয়। এই সময়ে ওয়ানডে সিরিজে প্রতিপক্ষকে ‘বাংলাওয়াশ’ করার স্বাদও পাওয়া গেছে দুবার। ভারত সিরিজ দুরন্ত এক জয়ে শুরু করার পর বড় কিছু চাওয়াই তাই স্বাভাবিক মাশরাফি বিন মুর্তজার দলের জন্য। পরশুর টিম মিটিংয়ে খেলোয়াড়দের কানে কোচ এই মন্ত্রটাই পড়ে দিয়েছেন বলে খবর। ভারতের বিপক্ষে গর্জে ওঠার সামর্থ্য প্রথম ওয়ানডেতে প্রমাণিত। সেই গর্জনটাকে এবার আরও বড় হুংকারে পরিণত করার পালা। সে জন্য প্রথম ওয়ানডের দলটাই রেখে দেওয়া হচ্ছে আজও। যার অর্থ, আজও চার পেসার নিয়েই মাঠে নামবে বাংলাদেশ।
বড় দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ সিরিজ জিতেছে এর আগেও। সর্বশেষ সিরিজেই যেমন হোয়াইটওয়াশ করল পাকিস্তানকে। নিউজিল্যান্ডকেও হোয়াইটওয়াশ করেছে দু-দুবার। তারপরও ভারতের বিপক্ষে জেতা গেলে সেটার আনন্দ হবে আগের যেকোনো সিরিজ জয়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। ক্রিকেটে ভারত নামটাই এমন যে, তাদের বিপক্ষে যেকোনো সাফল্য বাংলাদেশের মতো দলকে নিয়ে যায় নতুন উচ্চতায়। এবারের সিরিজের আগে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কথায় তাই ফুটে উঠেছিল একটাই লক্ষ্য—ভারতের বিপক্ষে ভালো খেলতে হবে। কারণ ভারতের বিপক্ষে ভালো খেললে তা ক্রিকেট বিশ্বের আলাদা মনোযোগ পায়।
কিন্তু সদ্য সাতে উত্তীর্ণ বাংলাদেশ দল এ রকম জয়ের সব পরিকল্পনা করে ফেলবে আর র্যা ঙ্কিংয়ের দুই নম্বর দল চুপচাপ বসে তা দেখবে, সেটা তো আর হয় না। কাল বরং রোহিত শর্মার কথায় ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিজ্ঞাই খুঁজে পাওয়া গেল। দলের প্রতিনিধি হয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে বললেন, ‘গেমপ্ল্যান অনুযায়ী খেলা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ম্যাচের ভুলগুলো আমরা জানি। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে তাই অন্য এক ভারতকেই দেখবে সবাই।’ সংবাদ সম্মেলনে আসার আগে মাঠে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ উইকেট দেখলেন রোহিত। কথা বললেন কিউরেটর গামিনি ডি সিলভার সঙ্গে। রোহিতের কাছে আজকের ম্যাচের উইকেট নাকি অনেকটা প্রথম ম্যাচের উইকেটের মতোই মনে হয়েছে। অবশ্য উপমহাদেশের উইকেটগুলো সাধারণত একই রকম হয় বলে এ নিয়ে বেশি চিন্তা নেই তাঁর। ভারতীয় ওপেনারের চিন্তা বরং অন্য ‘উইকেট’ নিয়ে, ‘শুরুতে উইকেট নেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ম্যাচে আমরা এটা পারিনি। আমাদের বোলাররা কেবল রানই দিয়ে গেছে। পরের ম্যাচে শুরুতেই উইকেট নিতে হবে।’
মুস্তাফিজুর রহমানকে ধাক্কা দিয়ে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো প্রশ্নবিদ্ধ মহেন্দ্র সিং ধোনির খেলোয়াড়ি চেতনা। শুধু ম্যাচ ফির ৭৫ শতাংশ জরিমানা দিয়েই রেহাই মিলছে না। খোদ ভারতীয় মিডিয়ায় এ নিয়ে চলছে সমালোচনার ঝড়। ভারত অধিনায়ককে যখন মাঠ আর মাঠের বাইরের এত চাপ সামলাতে হচ্ছে, তখন বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা ভাসছেন প্রশংসার বসন্ত হাওয়ায়। ওয়ানডেতে বাংলাদেশ দলের চেহারা যে এতটা বদলে গেল, পরশু তার প্রায় পুরো কৃতিত্বই অধিনায়ক মাশরাফিকে দিয়েছেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান। কাল কোচ হাথুরুসিংহেও বললেন, ‘দলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ও। সবার খেয়াল রাখে, ড্রেসিংরুমে তার কথাকে সবাই সম্মান দেখায়। আর মাঠে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যাপার তো আছেই।’
ওয়ানডের বাংলাদেশ দল তাই এখন ‘মাশরাফির বাংলাদেশ’। আজ মাশরাফির হাত দিয়েই খুলে যাক ওপরে ওঠার আরেকটি সিঁড়ির দরজা।

Post A Comment: