সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে সরকারবিরোধী আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে মনে করা হলেও সংগঠন গোছানোর কাজে হাত দিতেই পারছেন না বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কারণ তিনি যাঁদের নিয়ে দল গোছাবেন সেই নেতাদের বেশির ভাগই কারাগারে। কেউ বা আত্মগোপনে। অনেকে বারবার চেষ্টা করেও জামিন পাচ্ছেন না। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কাউন্সিল করা যাবে কি না তা নিয়ে যেমন সন্দেহ রয়েছে, তেমনি সংশয় রয়েছে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রশ্নেও।
যদিও ঘনিষ্ঠজনদের খালেদা জিয়া বলছেন, তিনি সংগঠন গোছাচ্ছেন। কিন্তু সিটি করপোরেশেন নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এক মাস পার হলেও আজ পর্যন্ত পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে তাঁর উপস্থিতিতে দলীয় ফোরামের একটি বৈঠকও ডাকা হয়নি। এ নিয়ে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে খবর নিয়ে জানা গেছে, দলের আপাতত লক্ষ্য হচ্ছে : এক. কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের জামিনের মাধ্যমে মুক্ত করা। দুই. আত্মগোপনে থাকা নেতাদের জামিন করানো। বিএনপি নেতাদের মতে, এ দুটি কাজ সম্পন্ন হলেই কেবল সংগঠন পুনর্গঠনের কাজে হাত দেওয়া যাবে, তার আগে নয়।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, পুনর্গঠনের ব্যাপারে দলের ভেতর থেকে চাপ আছে, কিন্তু দল কারা গোছাবেন? সবাই তো হয় কারাগারে, নয় আত্মগোপনে, যে কারণে এ পর্যন্ত দলীয় ফোরামের কোনো বৈঠক পর্যন্ত ডাকা যায়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দল পুনর্গঠন করতে হলে কাউন্সিল করা প্রয়োজন। সেটা করতেও সাংগঠনিক দক্ষতাসম্পন্ন নেতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এ মুহূর্তে নেতাদের কারামুক্তিই দলের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ঢাকা মহানগর বিএনপির এক নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বিএনপি সংগঠন গোছাচ্ছে না, এ কথা সবাই বলছে, কিন্তু একবারও তারা খতিয়ে দেখছে না যে কী কারণে দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দেরি হচ্ছে! তিনি আরো বলেন, সরকার বিএনপিকে মাঠে-ঘাটে কোথাও দাঁড়াতে দিচ্ছে না। শীর্ষ পর্যায়ের বড় বড় নেতাকে কারাগারে ভরে রেখেছে। যাঁরা বাইরে আছেন তাঁরাও প্রকাশ্যে দলের জন্য কাজ করতে পারছেন না। তাহলে দল গোছাবেন কারা? তা সত্ত্বেও দল গোছানোর বিষয়টি সবার বিবেচনায় আছে। সময় এলেই এ কাজ শুরু হবে।  
দলের যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান বলেন, দল পুনর্গঠনের চিন্তাভাবনা ও তাগিদ বিএনপির মধ্যে আছে। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় কিছু সময় লাগবে। কারণ ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ বেশির ভাগ সিনিয়র নেতা এখন কারাগারে। তাই নেতাকর্মীদের মুক্তির পর দল গোছানোর কাজে হাত দেওয়া হবে। তবে এ ব্যাপারে প্রাথমিক কাজকর্ম শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
মূল সমস্যা ঢাকা মহানগর পুনর্গঠনে : বিএনপি পুনর্গঠনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকা মহানগর কমিটি। জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকলেও সমর্থক ৬২ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলর থাকায় বিএনপি সাংগঠনিক কোনো অভাব অনুভব করেনি। কারণ স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি জনসভায় লোক আনা এবং মিছিল-মিটিংয়ের কাজ সবই কেন্দ্রের নির্দেশে কাউন্সিলররা এত দিন সম্পন্ন করেছেন। থানা ও ওয়ার্ড সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ তৃণমূল নেতাদের আগে কখনো খুব একটা প্রয়োজন হয়নি। ফলে মহানগরীর শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তৃণমূলের এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, ২০১৩ সাল পর্যন্ত মহানগর বিএনপি অনেকটাই কাউন্সিলরনির্ভর হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু ২০১৩ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করা হলে সাদেক হোসেন খোকার মেয়র পদ চলে যায়। পাশাপাশি আপনা-আপনি শূন্য হয়ে যায় ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের পদ অর্থাৎ বিএনপির কাউন্সিলররাও এ প্রক্রিয়ায় তাঁদের পদ হারান। ফলে নতুন করে মহানগরীর থানা ও ওয়ার্ডগুলোকে এখন ঢেলে সাজাতে বেগ পেতে হচ্ছে।
জানা গেছে, পুলিশি বাধার কারণে মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বাধীন কমিটি আজ পর্যন্ত কোথাও উন্মুক্ত বা প্রকাশ্যে একটি বৈঠকও ডাকতে পারেনি। বৈঠকের জন্য কমিউনিটি সেন্টার, হোটেল প্রাঙ্গণ বা মাঠ; যেখানেই ভাড়া নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হোক না কেন পুলিশ তাতে বাধা দিচ্ছে। আবার কোনো কোনো এলাকায় স্থান ভাড়া পাওয়া গেলেও সংশ্লিষ্ট থানা ও ওয়ার্ড বিএনপির নেতাদের নামে ১৫-২০টি করে মামলা থাকায় তাঁরা জড়ো হতে পারছেন না। বৈঠকের খবর পেলে পুলিশ আগেভাগেই জানিয়ে দিচ্ছে আসামি পাওয়া গেলে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
মহানগর বিএনপির একজন যুগ্ম আহ্বায়ক জানান, এসব সমস্যার বাইরে দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় আগ্রহী নেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থেকে এক ধরনের গ্রুপিং তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন করতে আগ্রহী মহানগরীর সম্ভাব্য এমন এমপি প্রার্থীদের কেন্দ্র করেও তৈরি হয়েছে আরেকটি গ্রুপ। তাঁর মতে, সৃষ্ট এ সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি গঠন, যা পুলিশের ভয় ও স্থান ভাড়া না পাওয়ায় সম্ভব হচ্ছে না। ওই নেতা দাবি করেন, ঢাকায় আব্বাস-খোকার দ্বন্দ্ব এখন আর কোনো সমস্যা নয়। কারণ আব্বাসের নেতৃত্বে কমিটি করা হলেও খোকা সমর্থকদের সেখানে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
সাংগঠনিক নেতারা নিষ্ক্রিয়: নানা মত ও পথের নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত বিএনপিতে বর্তমানে সাংগঠনিক দক্ষতাসম্পন্ন ও ‘রাজনীতিক’ বলে পরিচিত নেতা কমই আছে। পুনর্গঠনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেন একটি দলের মহাসচিব। কিন্তু বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে তিনজন কারাগারে, একজন বিদেশে ও তিনজন আত্মগোপনে রয়েছেন। মির্জা ফখরুল ছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে খালেদা জিয়ার পরামর্শ মতো দলটির সাংগঠনিক বিষয়ে আরো যাঁরা কাজ করেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ। চিকিৎসা শেষে নজরুল ইসলাম খান বুধবার দেশে ফিরেছেন। আর রিজভী আহমেদ কারাগারে রয়েছেন। ফলে পরামর্শ শুনে কাজ করার মতো নেতা এ মুহূর্তে খালেদা জিয়ার পাশে খুব বেশি নেই। পাশাপাশি জাতীয় কাউন্সিল করার জন্যও রাজনৈতিক দক্ষতাসম্পন্ন নেতা প্রয়োজন, যা এ মুহূর্তে দলে নেই। তবে নজরুল ইসলাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপির মতো বড় দল নির্বিঘ্নে কাউন্সিল করতে পারলে আগের মতোই লোকসমাগম হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, দল গোছানোর কাজ শুরু হয়েছে।
এদিকে রাজনৈতিক নেতা তথা সাংগঠনিক দক্ষতা আছে এমন নেতাদের মধ্যে বর্তমানে কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান ও মো. শাহজাহান কারাগারের বাইরে আছেন। আর ‘রাজনীতিক’ বলে পরিচিত স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম আত্মগোপনে এবং ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। তাঁদের বাইরে পুরনো নেতাদের মধ্যে একমাত্র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও মির্জা আব্বাসের সাংগঠনিক দক্ষতা রয়েছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু আব্বাস এখনো আত্মগোপনে, আর ড. মোশাররফ প্রায় এক বছর ধরে কারাগারে। তাঁদের বাইরে সভা-সেমিনারে বক্তৃতা ও দেশ-বিদেশে লবিং করার মতো উপযুক্ত বেশ কিছু নেতা বিএনপিতে আছেন। কিন্তু তাঁরা আবার দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে খুব একটা যুক্ত নন।
দলটির সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় ছিলেন সিলেট বিভাগের ইলিয়াস আলী, যিনি বেশ কয়েক বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। বাকিদের মধ্যে বরিশাল বিভাগে মুজিবুর রহমান সারোয়ার ও রংপুরে আসাদুল হাবিব দুলু স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও সরকারের রোষানল থেকে রক্ষা পেতে অনেকেই ‘গা বাঁচিয়ে’ চলছেন বলে দলের মধ্যে আলোচনা আছে।  
বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে দলটির অনেক নেতা পলাতক থাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলটির অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ কমে গেছে। ফলে মূল দলের কর্মীদের সঙ্গে নেতার, আবার অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে মূল দলের যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় কেন্দ্রীয়ভাবেও এক ধরনের সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। তাই সব কিছু সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে।

Post A Comment: