‘রোবট শুঁড়’হচ্ছে অস্ত্রোপচারে
‘রোবট শুঁড়’হচ্ছে অস্ত্রোপচারে

অস্ত্রোপচারের কাজ সহজ করতে রোবটযন্ত্র তৈরি করেছেন প্রকৌশলীরা। সামুদ্রিক প্রাণী অক্টোপাসের বৈশিষ্ট্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরা এমন যন্ত্র তৈরি করেছেন।
যন্ত্রটিতে রয়েছে অক্টোপাসের মতো ‘রোবট শুঁড়’। এতে নেই কোনো অনমনীয় কঙ্কাল। এটাকে যেমন বাঁকানো যাবে, তেমনি প্রয়োজন অনুসারে লম্বাও করা যাবে; কাজ করতে পারবে নমনীয়-অনমনীয় উভয় অবস্থার মধ্যেই।

যন্ত্রের ফোলানো কামরাগুলোর মাধ্যমে চলাফেরা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। যন্ত্রটির এ নকশা প্রকাশ করা হয়েছে বায়োইনস্পিরেশন অ্যান্ড বায়োমেট্রিকস সাময়িকীতে। এটি তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানের নাম স্টিফ-ফ্লপ। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) বিভিন্ন দেশের বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি যৌথ প্রকল্প। এ প্রকল্পের আওতায় অস্ত্রোপচারের মতো চিকিৎসাকাজে উন্নতি ঘটানোর লক্ষ্যে অমনীয় যন্ত্র আবিষ্কারের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করে আসছে।
সর্বশেষ এ যন্ত্রটি তৈরি করেছেন প্রকল্পভুক্ত ইতালির প্রকৌশলীদের একটি দল। ইতালীয় ওই প্রকৌশলী দলটি স্টিফ-ফ্লপ প্রকল্পের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের যে ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গবেষক দল সম্পৃক্ত রয়েছে, তার মধ্যে একটি। ১২টি দলের মধ্যে যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের দলটি প্রকল্পের সমন্বয় করার দায়িত্বে রয়েছে।
চূড়ান্ত পর্যায়ে গবেষকেরা যন্ত্রটির আরও উন্নয়ন ঘটানোর আশা করছেন। সেটা করা সম্ভব হলে এটিকে ‘ন্যূনতম ক্ষতি করে অস্ত্রোপচার’ কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। ছিদ্র করে অস্ত্রোপচার করা হয়, এমন কাজে যন্ত্রটি ব্যবহৃত হবে।
বায়োইনস্পিরেশন অ্যান্ড বায়োমেট্রিকস সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধটির প্রধান লেখক ও ইতালির সেইন্ট আনা স্কুল অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজের গবেষক তোমাসো রানজানি জানান, মানবদেহে জটিল কাঠামোগত পরিবেশে অক্টোপাসের মতো কোনো যন্ত্র বেশ কিছু সুবিধা এনে দিতে পারে।
গবেষক রানজানি ও তাঁর সহযোগীদের কয়েকজন এমন একটি ‘শুঁড়’ তৈরি করছেন, যেটি কাজ করতে পারবে ওই পরিবেশের মধ্যেও। উদাহরণস্বরূপ, এটি ছিদ্রের ভেতর দিয়ে তার লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যাবে। এরপর যন্ত্রটি প্রসারিত হয়ে নিজের পথ থেকে কোমল উপাদানগুলোকে সরিয়ে দেবে। একই সময় যন্ত্রটির অন্য অংশ লক্ষ্য অনুযায়ী অন্যান্য কাজ করে যাবে।
গবেষক রানজানি বলেন, ‘প্রথাগত অস্ত্রোপচারের কাজগুলোতে প্রায়ই বহুমাত্রিক দক্ষতাসম্পন্ন যন্ত্রপাতি যেমন আঁকড়ে ধরা, গুটিয়ে নেওয়া, দেখার পদ্ধতি ও কর্তন করা ইত্যাদি কাজ করতে পারে, এমন যন্ত্রপাতির দরকার হয়। একটিমাত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেই এতগুলো কাজ করতে পারা যন্ত্রপাতির দরকার পড়ে।’ রানজানির বিশ্বাস, তাঁদের রোবট শুঁড় এসব যন্ত্রপাতির সংখ্যা কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে। এতে করে অস্ত্রোপচারের কাজটা সহজসাধ্য হয়ে উঠবে।
বর্তমানের নমুনা যন্ত্রটির দৈর্ঘ্য ১৩ সেন্টিমিটার ও চওড়া তিন সেন্টিমিটার। এটা দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রতিটি ভাগের পুরো অংশে রয়েছে তিনটি সিলিন্ডার আকৃতির প্রকোষ্ঠ। এসব প্রকোষ্ঠ বাতাসে পরিপূর্ণ করে বিভিন্ন আকৃতিতে লম্বা করা ও বাঁকানো যায়। যন্ত্রটির কেন্দ্রীয় ভাগে রয়েছে আরেকটি প্রকোষ্ঠ, যেটি মোটা দানার কফিতে ভরা থাকে। এই প্রকোষ্ঠের বাতাস যখন শুষে নেওয়া হয়, তখন ওই কফির দানাগুলো এক জাগায় জড়ো হয়। এতে করে যন্ত্রটি অধিকতর অনমনীয় হয়ে ওঠে।
অন্য রোবট প্রকৌশলীরা রানজানির এই রোবট শুঁড়ের দক্ষতায় মুগ্ধ হয়েছেন। তবে তাঁরা বলছেন, অস্ত্রোপচারের কাজে এটার ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠা এখনো অনেক দেরি। বিশেষ ধরনের অস্ত্রোপচার রোবট তৈরির জন্য বিভিন্ন গবেষণাগার ও কোম্পানি কাজ করে যাচ্ছে। তবে সবার প্রচেষ্টাই এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের প্রাণরসায়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক রবি বিদ্যানাথন বলেন, এ ধারণার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এটার বাস্তবায়ন বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যে ফল পাওয়া গেছে, তা চমৎকার। তবে অস্ত্রোপচার কক্ষে এটা ব্যবহারের জন্য উপযোগী করে তুলতে এখনো অনেক পথ হাঁটতে হবে।

Post A Comment: