যা কিছু ছাত্রলীগ করবে, তা-ই লিগ্যাল? সেসবের প্রতিবাদই শুধু ইললিগ্যাল?
ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে ছাত্রলীগের দশা হয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের মতো। সেবনে উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব ছাত্রলীগ হলো বর্তমান ছাত্রলীগের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের মাছে ফরমালিন থাকে না, বাস্তবে থাকে। অপকর্মে অপকর্মে সংগঠনটি এতই ভারাক্রান্ত যে এর শক্তিমত্তাকে গোদা পায়ের সঙ্গে তুলনা দেওয়া চলে। গোদা পায়ে লাথি দেওয়া যায় না যেমন, তেমনি ছাত্রলীগকে দিয়ে তারুণ্যকে আন্দোলিত করা যাচ্ছে না। এদের পক্ষে সম্ভব কেবল সাধারণ নিরীহ মানুষকে দেখে নেওয়া। শিক্ষামুখী অথবা গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে না থাকতে থাকতে এই সংগঠনটিও এখন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মতোই মরা নদী হয়ে যাচ্ছে। এতে স্রোত নেই, পচন ও কচুরি জমা আছে।
যে সংগঠনের জনবল ও ক্ষমতা জনগণের কাজে লাগে না, তা কার কাজে লাগে? ক্ষমতার কাজে লাগে। সাম্প্রতিক কয়েকটি খবর থেকে ক্ষমতার ব্যবহারগুলো আসুন দেখি: জগন্নাথে প্রতিবাদকারীদের মারধর ছাত্রলীগের, সিলেটে ব্যবসায়ীকে গলা কেটে হত্যা: সিসি ক্যামেরায় শনাক্ত ‘খুনিরা’ ছাত্রলীগের। সরকারি চাকরি করেও তাঁরা ছাত্রলীগে! । জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাক্রমে শিক্ষিকা ও ছাত্রীদের যৌন হয়রানি ইত্যাদি। এভাবে তার আগের দিন, তার আগের দিন করতে করতে আর কত উদাহরণ খুঁজব? বলা হয়, পুলিশের যে সদস্যরা নানা অপকর্ম ও নির্যাতনে জড়িত বলে দেখা যাচ্ছে, তাঁরা সবেমাত্র ছাত্রলীগ থেকে পুলিশে যোগদান করা নেতা। উল্টো ঘটনাও আছে। পুলিশের কোনো কোনো কর্মকর্তা এখনো ছাত্রলীগের বড় পদে শোভা পাচ্ছেন। পুলিশের ভেতর ছাত্রলীগ এবং ছাত্রলীগের ভেতর পুলিশ—যেভাবেই দেখুন, দুজনে দুজনার। ফলে ছাত্রলীগ পুলিশের মতো হয়ে উঠছে, আর পুলিশ হয়ে উঠছে ছাত্রলীগের মতো।
কিন্তু এটা কি কেবল ছাত্রলীগের দোষ? ছাত্রলীগকে নষ্ট করেছে কারা? কারা সন্ত্রাসীদের বিচার না করে নেতা হওয়ার সুযোগ দিয়েছে? ষাট থেকে নব্বই পর্যন্ত যখনই গণ-আন্দোলন হয়েছে, তখনই ছাত্রলীগ উজ্জ্বল হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার আন্দোলন শুরুর আগে ছাত্রলীগে মেধাবী ও তীক্ষ্ণ ছেলেমেয়েদের কম দেখা যেত। ভালো ছাত্ররা তখন করত ছাত্র ইউনিয়ন। যেই ছয় দফার জোয়ার এল, তরুণেরা ছাত্রলীগে নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পেলেন। তরুণদের আগুয়ান অংশ ছাত্রলীগে আসতে শুরু করে। একেবারে ধোয়া তুলসীপাতা না হলেও, ছাত্রলীগ তখন গণসংগঠনের চরিত্রই অর্জন করেছিল।
নেতা হতে গেলে ছাত্রলীগের সমর্থন দরকার হতো। লেজুড়বৃত্তির রেওয়াজ তখনো দেখা যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ যখন দ্বিধান্বিত বা আপসপন্থী হয়েছিল, ছাত্রলীগ তখন দলের থেকে এগিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিত। স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির মতো অনেক ঘটনা এর প্রমাণ দেবে। এমনকি এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও অন্যদের সঙ্গে ছাত্রলীগই ছিল সামনের সারিতে। সে সময় কোনো কোনো কঠিন মুহূর্তে ছাত্রলীগই মূল দলের চেয়ে এগিয়ে থেকে পথ দেখিয়েছে।
কিন্তু নব্বইয়ের পর থেকে যখন বড় দলগুলো ক্ষমতা অর্জন করে ধনসম্পদ বর্ধনকেই রাজনীতির লক্ষ্য করে তুলল, ছাত্রলীগের নেতৃত্বেও বদল আসতে শুরু করল। লেজুড়বৃত্তির সূচনাও তখন থেকেই। প্রতিবাদের সংগঠন থেকে ছাত্রলীগ পরিণত হলো কায়েমি স্বার্থের হাতিয়ারে।
বড় দলগুলো যে হারে দুর্বৃত্ত ধনীদের হাতিয়ার হয়ে উঠল, সেই হারে তাদের দরকার পড়ল মাঠপর্যায়ের লেঠেলদের। ছাত্রাবাস, এলাকা, ব্যবসা দখলে রাখায় এদের ব্যবহার শুরু হলো। অন্য শ্রেণি-পেশার মানুষ এসব দলে আর সক্রিয় থাকা শুরু করলেন না যখন, তখন তো ছাত্রলীগই মিছিল-মিটিংয়ে লোক জমানো, প্রতিপক্ষকে ধাওয়ানোর প্রধান ভরসা হলো। গণ-আন্দোলন ও গণমুখী কর্মসূচিতে সমাজের সবচেয়ে ভালো অংশটাই সামনে চলে আসে। নইলে আন্দোলন হয় না, কর্মসূচি হালে পানি পায় না। কিন্তু যখন স্বৈরাচারী কাজকারবার চলে, রাজনীতির অপরাধীকরণ চলে, সমাজ ও রাষ্ট্রে অবক্ষয় থাবা গেড়ে বসে, তখন সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট অংশ সামনে চলে আসে। ঘোলা পানিতে ভেদা মাছই ভেসে ওঠে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের এখন হয়েছে এই অবস্থা।
কেবল এদের ক্যাডাররাই নয়, অনলাইন-ফেসবুকেও লীগপন্থীদের ভাষাসন্ত্রাসে টেকা দায়। বঙ্গবন্ধুর ছবি ও মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ঝুলিয়ে জঘন্য ভাষায় গালিগালাজ করার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকেই অপমান করা হয়। এভাবে আদর্শ জেতে হিংসাশী অসূয়া। মুক্তিযুদ্ধের নায়কদের সংগঠনের এমন অধঃপতন বিরল ঘটনা নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের যুবকর্মীরা আজ সে দেশের ত্রাস। চেতনাকেও নবায়ন করতে হয়, দলকেও নতুন বাস্তবতার উপযোগী করতে হয়। কোনো এককালে কেউ একটা সাঁকো দিয়ে পার হয়েছিল বলে, চিরকাল সেই সাঁকো মানুষ পারাপার করবে এমন বিশ্বাস অলীক। সাঁকো মেরামত করতে হয়, কিংবা আরও ভালো করে বানাতে হয়। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সংগ্রামে ত্যাগ ও নিষ্ঠার দরকার। আর ক্ষমতাসীন থাকার তরিকায় এখন দরকার হয় ত্রাস ও গ্রাসের কারবার।
ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা জওহরলাল নেহরু একবার ছাত্রদের বলেছিলেন, স্বাধীন দেশে মারমুখো ছাত্র-আন্দোলনের দরকার আছে কি না? দরকার তখনই, যখন নাগরিকের স্বাধীনতা খর্ব হয়। স্বাধীন দেশে ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষের ছাত্রকর্মীদের ক্ষমতার রস থেকে দূরে থাকাই ভালো। মাছির ওড়াউড়ি শেষ হয় রসে নিমজ্জিত হয়ে। ছাত্রলীগ এখন ক্ষমতার রসে ততটাই নিমজ্জিত।
ছাত্রলীগ এখন আর নেতা জোগান দিতে পারছে না। এটা বোঝা যায় মন্ত্রিসভার দিকে তাকালে। মন্ত্রীদের কতজন ছাত্রলীগ থেকে এসেছেন? ছাত্রলীগে যদি মেধাবীরা থাকতেনই, তাহলে আওয়ামী লীগকে বামদের থেকে লোক নিয়ে এসে মিন্ত্রসভা গঠন করতে হতো না। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন যিনি, তিনিও দলের বাইরে থেকেই এসেছেন।
ছাত্রলীগ থেকে ভবিষ্যতের সৎ নেতৃত্ব না এলেও একে ছাড়া নেতাদের চলবে না। রাজনীতির পিরামিডে ছাত্রলীগ হলো তলার ভিত। কৃষক-শ্রমিক-মধ্যবিত্তরা এই রাজনীতিতে লেগে থেকে কাজ করে না। দলের শক্তি সমাবেশ ও প্রাধান্য বিস্তারের কাজটা করে ছাত্র-তরুণেরা। যে নেতা যত বেশি এদের চালাতে পারেন, দলে তাঁর দাপট তত বাড়ে। আপত্তিকর ব্যবসা-বাণিজ্যের রেষারেষি সামলাতে, টেন্ডারবাজি, ভূমি-নদী-বস্তির দখলের জন্য, চাঁদা ও টোল আদায়ের জন্য ছাত্রলীগকে লাগবেই। বিরোধীদের দৌড়ের ওপর রাখার চিরাচরিত চাহিদা তো আছেই।
সুতরাং, ছাত্রলীগের যে সমস্যা, তার জন্য তারা যতটা-না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী ওপরের নেতারা। এঁরাই পদের টোপ, চাকরির লোভ, টাকার মোহ দিয়ে এদের ব্যবহার করেন। বিচার হলে, পদচ্যুত হলে, খুন হতে হলে ছাত্রলীগের কর্মীদেরই হতে হয়। টিকে গেলে এঁদেরই কেউ কেউ ধনকুবের হন, বাকিদের ভাগ্যে জোটে সরকারি-বেসরকারি কিছু চাকরি, ব্যবসা, পুলিশের পোশাক। যেগুলো তাঁদের নিয়মতান্ত্রিকভাবেই পাওনা, সেগুলোর জন্য তাঁদের দুই নম্বরি রাস্তা ধরতে হয়। ছাত্রলীগ না করলে যদি সুবিধা না মেলে, তাহলে তো সুবিধাবাদীরাই ছাত্রলীগ করবে। এতে দল গোদা পায়ের মতো ভারী ও মোটা দেখাবে, কিন্তু সত্যিকার জনস্রোতের সামনে তা অকেজো।
আওয়ামী লীগের উচিত এখন ছাত্রলীগকে ভেঙে দিয়ে একেবারে নতুনদের নিয়ে নতুন যুব-ছাত্র সংগঠন সৃষ্টি করা। কিন্তু মুশকিল হলো, লেজ গরুকে নাড়ায় না, গরুই লেজ নাড়ায়। আওয়ামী লীগ না বদলালে ছাত্রলীগের বদলের আশার গুড়ে তাই কাঁকরই মিলবে।
একবার এক বুড়ির সন্তান যুদ্ধে যাচ্ছে। তো মা তার ব্যাগে খাবারদাবার ইত্যাদি গুছিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বাবা, একটা করে শত্রু মারবি আর জিরিয়ে নিবি, শরীরটাকে কষ্ট দিবি না।’ তখন ছেলেটি বলল, ‘মা, কিন্তু ওরা যদি আমাকে মারে?’ বোকা মা মুখে হাত দিয়ে বলে, ‘সাট সাট! ওরা তোকে মারবে কেন? তুই ওদের কী ক্ষতি করেছিস?’ ছাত্রলীগকে যাঁরা ভালোবাসেন, তাঁরা সোনার ছেলেদের কুকীর্তিকে সুকীর্তির তকমা পরিয়ে ক্ষতি ছাড়া আর কিছু করছেন না।

Post A Comment: