মওলানা আবুল কালাম আজাদ দেশভাগের আগে আলীগড়ে ছাত্রদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। ছাত্ররা তাঁকে ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে খুঁজে পেয়েছিল। তিনি ট্রেনে দিল্লি থেকে কলকাতা যাচ্ছিলেন। ছাত্ররা পরনের জামা খুলে তাঁকে উদ্দেশ করে নানা অবজ্ঞাসূচক কথা বলেছিল, যত রকমভাবে তাঁকে অপমান করা যায়, তারা তা করেছিল।
তাঁর দোষ ছিল, তিনি মুসলিম লীগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দেশভাগের দাবি তোলা হয়েছিল ভুল ধারণার ভিত্তিতে, মানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দেশভাগ ছাড়া আর কোনো উপায় যে নেই, এ ধারণা ভুল। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পরও ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা কমতে পারে। তার ওপরে হিন্দুরা বলতে পারে, তোমরা তো নিজেদের ভাগ বুঝে নিয়েছ, এখন তোমরা পাকিস্তানে চলে যাও। ঠিক সেটাই তখন হয়েছিল।
আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি হতাশ হয়ে ফিরেছি, খুবই বিচলিত হয়েছি। কারণ, সেখানকার ছাত্ররা এখনো সমাজের মূলধারার সঙ্গে মেশেনি। আর বিচলিত হয়েছি, তারা এখনো ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কথা বলে।
সম্ভবত আলীগড়কে আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করা হলে মুসলমানরা এ ভেবে যারপরনাই আনন্দিত হবে যে তাদের নিজস্ব পরিচয় আছে। উর্দুসহ মাঠের সব লড়াইয়ে পরাজিত হয়ে মুসলমানদের জীবন নিরানন্দ হয়ে পড়েছে। মুসলমানরা যদি মনে করে, তাদের আলাদা পরিচয় আছে, তাহলে সমস্যা নেই। কিন্তু ভারতে বসবাসকারী সব নাগরিকের প্রধান পরিচয় হচ্ছে, তারা ভারতীয়।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু কনাহাট সার্কাসে গিয়ে নিজেই কয়েকজন লুটপাটকারীকে পিটিয়েছিলেন। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সম্ভবত বুঝতে পারেনি, ধর্মভিত্তিক পরিচয়ই ভারত ভাগের কারণ। দেশভাগের পর সেই রাজনীতির পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। মুসলমানরা বিভাজনের রেখা টেনেছিল, তাদের এর জন্য ভুগতে হবে হয়তো। ভারতের ৮০ ভাগ হিন্দু জনগণ সেই পুরোনো রাজনীতির কাসুন্দি ঘাঁটবে না।
আমার মনে হয়, মুসলমানরা সামগ্রিকভাবে জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, তারা মূলধারার অংশ হতে চায়। সাম্প্রদায়িকতা কর্ষণ করার বিপদ তারা টের পেয়েছে। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার দাঙ্গা শেষমেশ পুলিশ ও মুসলমানদের মধ্যকার দাঙ্গায় পরিণত হয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাপারটা তা-ই হয়েছে।
যদিও মূলধারাই তাদের অতটা বাড়তে দেয়নি। এদিকে দেশে নরমপন্থী হিন্দুত্ববাদ সৃষ্টি হয়েছে। এটা মুসলমানদের আরও ভীত করে তুলছে। দিল্লি জামিয়া মিলিয়া ইনস্টিটিউশনে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখলাম, তারা হিন্দুত্ববাদের জাগরণে ভীত। যারা তাদের অধিকার নিয়ে মোটেই চিন্তিত নয়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন কংগ্রেস প্যানেলের প্রতিবেদনটি আমার কাছে প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। কিছুটা সাধারণীকরণের ফলে এর কার্যকারিতা কমে গেছে। সেটা ছাড়া ইউএস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডমের এই পর্যবেক্ষণ ঠিক যে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আরএসএসের ‘সহিংস আক্রমণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর’ এবং ‘ঘর ওয়াপসি’ আন্দোলনের সম্মুখীন হয়েছে।
এটা দুর্ভাগ্যজনক যে এই প্রতিবেদনটি দাপ্তরিকভাবে বর্জন করা হয়েছে। দেশটিকে এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করা উচিত ছিল। এই ধারণায় সত্যতার কিছুটা উপাদান আছে যে গত কয়েক বছরে আমরা যে ভারসাম্য অর্জন করেছিলাম, মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তা কিছুটা এলোমেলো হয়ে গেছে। হিন্দুদের মধ্যে উন্নাসিকতা সৃষ্টি হয়েছে, আর মুসলমানদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।
হ্যাঁ, এটা সত্য যে বন্ধনটা আলগা হলেও সেটা একবারে ভেঙে যায়নি। হয়তো দুই সম্প্রদায়কেই বাস্তবতার সঙ্গে আপস করতে হবে। তাদের মধ্যে একরকম বোঝাপড়া সৃষ্টি হয়েছে, ফলে সংকটের সময় সেটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে, সময় সময় যখন সেই সংকট মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আরএসএস–এর সঙ্গে সহিংসতা যুক্ত করেছে বা তার হুমকি যোগ করেছে। ফলে সেটা এই গল্পকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। মহাত্মা গান্ধীকে হত্যার পর এই সংগঠনটি বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। সংগঠনটি এখন নতুন করে আবার তাদের নোংরা মাথা তুলেছে। এমনকি তারা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের ভাস্কর্যও স্থাপন করতে চায়। আবার এটাও ঠিক যে কংগ্রেস দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ করতে পারেনি। কিন্তু দলটির আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষ, আর ধর্মীয় শক্তিগুলো যখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখনো তারা প্রতিবাদ করে। আরেকটি ধারণা হচ্ছে, মোদির আমলে প্রশাসনের মধ্যেও সাম্প্রদায়িক ভাবধারা জেঁকে বসেছে।
মুসলমানদের মধ্যে এ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সঙ্গে থাকতে হবে, তা যতই অসম্ভব হোক না কেন। সম্ভবত উভয় সম্প্রদায়ই নিজেদের জগতে বাস করে। উভয়ের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে উত্তেজনা থিতিয়ে এসেছে বা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছে বলা যায়।
এমনকি পাকিস্তানের প্রতি যে শত্রুতার মনোভাব ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ, সেটার মাত্রাও কমে এসেছে। ভারতের আমজনতা পাকিস্তানের আমজনতার প্রতি তাদের শুভকামনা কখনোই পরিত্যাগ করেনি। এমনকি সরকারও এই বিভাজনের অসাড়তা বুঝতে পেরেছে। ফলে তারা এক টেবিলে বসে আলোচনা করতে পারে।
ভারত ও পাকিস্তানের পাঞ্জাবিরা খুবই সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন। তারা এটা বোঝে না যে সুফি মতবাদ তাদের উভয়ের ধর্মেরই নির্যাস। পাকিস্তানের অভিযোগ হচ্ছে, ভারত জম্মু ও কাশ্মীরের জনসংখ্যার অনুপাত বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে, বোধগম্যভাবেই তা ভুল।
কাশ্মীরে পণ্ডিতদের প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারটিকে স্বাগত জানানো উচিত। তারা যে মুসলমানদের সঙ্গে মিশে গেছে, তাতে বোঝা যায় সেখানে কাশ্মীরি জাতিসত্তার বিকাশ হয়েছে। সেই জাতিসত্তায় দুই সম্প্রদায়েরই প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এমনকি মৌলবাদী সৈয়দ আলী শাহ গিলানি ছাড়া বিছিন্নতাবাদীরাও পণ্ডিতদের প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন এই যুক্তিতে যে তারাও সেই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বস্তুত, কাশ্মীরি জনগণের শক্তি হচ্ছে তাদের ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ। আলীগড়ের ছাত্রদের উচিত হবে, কাশ্মীরের বই থেকে একটি পাতা উল্টিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে নিজেদের পরিচয় নির্ধারণ করার প্রলোভনে পা দেওয়া থেকে বিরত থাকা।

Post A Comment: