ফাহাদ রাজিব  : ব্লগার হত্যাকা-ের প্রতিবাদে মানববন্ধন, সভা-সেমিনার চলছে। যে কোনো হত্যাকা- নিন্দনীয় এবং হত্যাকারীদের বিচার হওয়া উচিত। নাগরিক হিসেবে কোনো হত্যাকা- মেনে নেয়া যায় না। তাই ব্লগার অভিজিৎ রায় বা অনন্ত বিজয় দাশসহ যেসব ব্লগার হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন সব হত্যাকা-ের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় তোলা উচিত। কিন্তু দেশের এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাজীবী ও উচ্চশিক্ষিত বিবেকবান(!) মানুষ শুধু ব্লগার হত্যাকা-ের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হন। আবার সিন্ডিকেট করে কিছু ব্লগারের ‘ইসলামবিদ্বেষী এবং মহানবী (সা.) কটূক্তি’ করে লেখালেখি এবং ওইসব বিশিষ্টজনের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কারণে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাস জন্মেছে ব্লগার মানেই যেন ইসলামীবিদ্বেষী এবং নাস্তিক। ব্লগারদের কেউ কেউ নিজেকে নাস্তিক ঘোষণা দেয়ায় এবং ইসলামকে কটাক্ষ করে অব্যাহতভাবে ব্লগে লেখালেখি করায় জঙ্গি বা মৌলবাদী-উগ্রপন্থীদের টার্গেট হয়েছেন। মূলত মুক্তমত প্রকাশের নামে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া যেমন অন্যায় তেমনি বিক্ষুব্ধ হয়ে কাউকে হত্যা করাও অপরাধ। প্রশ্ন হলো ব্লগার আসলে কী? ব্লগাররা কী শুধু নাস্তিক হয়? দেশের শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের মুখে এ প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়। ব্লগার অর্থ কী? আর কেনই বা কিছু তথাকথিত প্রগতিশীল শিক্ষিত মানুষ শুধু ব্লগার হত্যাকা-ের বিচারের দাবিতে তোলপাড় করেন; অথচ অন্যান্য হত্যাকা-ের ব্যাপারে নীরব। মানব পাচার তথা সাগরে হাজার হাজার মানুষ ভাসছে, দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে, লাশ ফেলে দেয়া হচ্ছে সাগরে। মানবিক এ ঘটনাগুলো নিয়ে সারাবিশ্বে তোলপাড় হলেও ওইসব বুদ্ধিজীবীর বিবেককে নাড়া দিচ্ছে না। কেউ মানবপাচারের ঘটনায় প্রতিবাদ করেননি এবং এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের ওপর চাপ দিতে দেখা যায়নি। পত্রিকায় খবর বের হয়েছে আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে দেশে গড়ে প্রতিদিন ১১টি হত্যাকা- ঘটছে। ওইসব হত্যাকা- নিয়ে মাথাব্যথা নেই বুদ্ধিজীবী-শিক্ষাজীবীদের অথচ তারা শুধু ব্লগার হত্যাকা- নিয়ে সরকারকে ‘বিব্রতকর’ পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।মূলত, ব্লগ ইংরেজি শব্দ। যার শাব্দিক অর্থ অনলাইনে ব্যক্তিগত দিনলিপি প্রকাশ বা ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ইংরেজি ব্লগ শব্দ আবার উইব্লগ এর সংক্ষিপ্ত রূপ। যে ব্যক্তি মতামত লিখে ব্লগে পোস্ট করেন তাকে ব্লগার বলে। কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক যেমন পরিচিতি তেমনি ব্লগারও পরিচিতি। বিজ্ঞান বিশ্বকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। আগে ডাকঘরের মাধ্যমে চিঠি আদান-প্রদানে দীর্ঘ সময় লেগে যেত। এখন ইন্টারনেটে ইমেইলসহ সহজে অন্যভাবেও যোগাযোগ মাধ্যমে তা করা যায়। ইন্টারনেট যোগাযোগ মাধ্যমে বিপ্লব ঘটিয়েছে। আর এই ইন্টারনেট জগতে মাত্র ১৫ বছর আগে ব্লগ এসেছে। ব্লগের জন্মের পর ব্লগারের জন্ম। অর্থাৎ কবি-সাহিত্যিক বা সাংবাদিক পরিচিতির জন্ম শত শত বছর আগে হলেও ব্লগার শব্দের জন্য ১৫ বছরের কম। ব্লগ শব্দটি এসেছে ওয়েবলগ থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক জন বার্জার ১৯৯৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর ইন্টারনেটে ব্লগের প্রথম ব্যবহার করেন। আর ১৯৯৯ সালে পিটার মহোলজ এই ব্লগ শব্দ ভেঙে উইব্লগ করেন।কোনো একটি নির্দিষ্ট ওয়েব সাইটে কোনো বিষয়কে পাঠকের মতামত প্রদানের জন্য তুলে ধরাকে ব্লগিং বলা হয়। ব্লগিং মূলত তিন প্রকার। ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক বা কোম্পানি। যে ব্লগ ব্যবহার করেন তিনিই ব্লগার। ব্লগার মানেই ইসলামবিদ্বেষী বা ধর্মদ্রোহী হবেন এমন কোনো কথা নেই। যে কেউ ব্লগার হতে পারেন এবং তার মতামত তুলে ধরতে পারেন নিজস্ব ব্লগে। স্টিফেন হকিং এর মতামত যেমন তার মেয়ে ব্লগের মাধ্যমে প্রকাশ করেন; তেমনি দেশের এবং বিশ্বের অনেক আলেম-ওলামা, ইসলামী চিন্তাবিদ ব্লগের মাধ্যমে তাদের চিন্তাশীল লেখা প্রকাশ করেন। ইন্টারনেটের সুবিধা নিয়ে যে কেউ ব্লগ ব্যবহার করে ব্লগার হতে পারেন। অথচ কিছু শিক্ষিত বিবেকবান মানুষের কর্ম তৎপরতা, কথাবার্তা এবং আচরণে প্রকাশ পাচ্ছে ব্লগার যেন অন্য জগতের কোনো গুণী সৃষ্টিশীল চিড়িয়া। যেন ব্লগাররাই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মেধাবী, সৃষ্টিশীল, আধুনিক, বিজ্ঞান মনস্ক এবং কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করা মানুষ। ব্লগাররা যেন ধর্মের বাইরের কিছু ব্যক্তি। আসলে কী তাই? প্রচার করা হয় মুক্তমত ও মুক্তচিন্তার বন্ধ করতে ব্লগারদের হত্যা করা হচ্ছে। আসলে কী তাই? মুক্তমত বা চিন্তা কী শুধু ব্লগেই প্রকাশ করা যায়? আর ব্লগার হলেই ইসলামবিদ্বেষী হতে হবে?ব্লগার হতে হলে বিশেষ মেধাবী-সৃষ্টিশীল এবং মুক্তমতের ইসলামবিদ্বেষী মানেই মুক্তমত (!) হতে হবে এমন নয়। ব্লগাররাই শুধু মুক্তচিন্তা ও সৃষ্টিশীল মানুষ সেটাও সঠিক নয়। ব্লগ হলো মতপ্রকাশের অনলাইন মাধ্যম। যারা কবিতা লেখেন তারা কবি। যারা উপন্যাস লেখেন তারা সাহিত্যিক। তারা বইয়ের মাধ্যমে নিজেদের সৃষ্টি তুলে ধরেন। যারা রিপোর্ট লেখেন তারা সাংবাদিক বা রিপোর্টার। যারা কলাম লেখেন তারা কলামিস্ট। এদের লেখা পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করা হয়, পাঠক তা পড়ে জানতে পারেন। যারা ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেন এবং লেখেন তারা ইতিহাসবিদ। কবি, সাহিত্যিক যেমন মনের ভাব প্রকাশ করে সৃষ্টিশীল লেখা লেখেন, তেমনি কলামিস্ট তার মনের ভাব প্রকাশ করেন কলাম লিখে। পত্রিকায় যেমন লেখালেখির মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করা যায় এবং কোনো বিষয়ে অন্যের মতামত জানা যায়; তেমনি ব্লগ, ফেসবুক, টুইটারে মতামত আদান-প্রদান করা যায়। দেশের অসংখ্য ছেলেমেয়ে ফেসবুক ব্লগ ব্যবহার করে মতামত প্রদান করেন। কাজেই ব্লাগরাই শুধু মুক্তমনা এবং সৃষ্টিশীল চিড়িয়া এমন নয়। আবার ব্লগার মানেই ইসলামবিদ্বেষী বা নাস্তিক নয়। দেশের কিছু ব্লগার সিন্ডিকেট করে ইসলামবিদ্বেষী লেখালেখি করে তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক যুগে অনলাইনের সুবিধাজনক যোগাযোগ মাধ্যম ব্লগার শব্দটিকে কলঙ্কিত করে ফেলেছেন। আর কিছু উচ্চশিক্ষিত মানুষ সাধারণ মানুষকে মুর্খ ভেবে ব্লগার মানেই সৃষ্টিশীল এবং মুক্তমনা প্রচার করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্লগার শব্দটি ইসলামবিরোধী খাতায় নিয়ে যাচ্ছেন।

Post A Comment: